চারদিকে হাজার হাজার লোক জমা হয়ে যায়। দুর্গার এই অবস্থা দেখে তারা হাসতে থাকে। একজন বলে, হিন্দুস্তান, হিন্দুস্তান।
এ কথায় ধুমসো গুজরাটি স্ত্রীলোকটি বলে, গান্ধীজিকে কেন দোষ দাও। স্বয়ং ইংরেজরাই তো এদের ক্ষিধেয় মারছে।…
সব লোক অদৃশ্য হয়ে যায়। এবার দুর্গা দেখে, সে মোটা হয়ে গেছে। ওই দোকানদারটার চেয়েও মোটা। আর, একটা হাঁড়ির সমান ভুঁড়ি বেরিয়েছে তার। কে যেন ভুঁড়ির মধ্যে একটা কাঠি ঢুকিয়ে দিয়েছে। পেট থেকে এবার রক্ত বেরোতে থাকে। এত রক্ত বের হয় যে, তার সমস্ত কাপড় ও শরীর রক্তে ভেসে যায়, আর পেটটা সঙ্কুচিত হয়ে কোমরের সঙ্গে লেগে যায়। দুর্গা আবছা চেতনার দুয়ারে কে যেন নাড়া দিতে থাকে। কয়েকজন লোক গল্প-গুজব করছে। দোকানটা ঘুরতে ঘুরতে সংজ্ঞাহীনতার মেঘলোক থেকে বেরিয়ে আসছে। ঘুরতে ঘুরতে আস্তে আস্তে দোকানটা স্থির হয়ে দাঁড়ায়। সামনে হনুমানজির ছবি টাঙানো।
দুর্বলতার জন্য দুর্গা ঘাড়টাও ফেরাতে পারে না। তার মনে হয় দোকানটা যেন মানুষে ভর্তি। তাদের কথার আওয়াজ বেশ শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কোনো কোনো শব্দ বোঝা যাচ্ছে না।
: বেচারি… বোধহয়, এই-ই প্রথম…
: কোন মজদুরের… জানিনে, কোথায়…
: যাও, সরো… মুক্তি… বেরিয়ে যাও…
দুর্গার পেট ভীষণ খালি বোধহয়। হাত নাড়বার চেষ্টা করে দেখে, যেন সমস্ত কাপড় জলে না, রক্তে ভিজে সপসপ করছে। হঠাৎ তার মনের মধ্যে একটি ভয়ঙ্কর কথা বিদ্যুতের মতো ঝিলিক দিয়ে ওঠে– আমি এখানে– সারা দুনিয়ার সামনে ছেলের জন্ম দিলাম? হায় ভগবান, এই বেশরমের কাণ্ডটা কি আমারই কপালে লিখে রেখেছিলে? সাধ্যে কুলোলে সে এখানেই মাটিতে মিশে যেত। এমন অপমানের চেয়ে যে মরণই ভালো ছিল। দুর্বলতার একটি ধাক্কায় চোখ দুটি বন্ধ করে ফেলে সে। মনে মনে বলে, এখান থেকে যাব কী করে এখন? লোকের কাছে মুখ দেখাব কেমন করে? সারা দুনিয়া যে আমার দিকে ইশারা করতে থাকবে!…
কয়েক মিনিট এমনি লজ্জার সমুদ্রে ডুবে থাকে দুর্গা। আবার দুর্বলতা আর সংজ্ঞাহীনতার ধাক্কা আসছিল। ইতোমধ্যে শোনা যায়, ট্যা-অ্যা-অ্যা-
একটি শিশুর কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। একটি শিশু। দুর্গার– নন্দ’র। ছোট্ট আওয়াজটি সমাজের বানানো লজ্জার মধ্যে পবিত্রতার দোলা জাগিয়ে দেয়। দুর্গার মন থেকে দুর্বলতা আর চেতনাহীনতার মেঘ কেটে যায়। কষ্টের ভয় না-করে সে ঘাড় ফিরিয়ে দেখে, খানকয়েক ময়লা ন্যাকড়ার মধ্যে লাল চাদরের মতো একটি শিশু ছোট্ট মুখটি হাঁ করে কাঁদছে। শিশুটির ক্ষিধে পেয়েছে ভেবে, তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বডিসের ফিতে খুলতে থাকে দুর্গা।
মমতার মান মানুষের কৌতূহলকে ছাপিয়ে ওঠে। সমস্ত লোক মুচকি হাসি হেসে দোকান থেকে বেরিয়ে আসে।
কিছুক্ষণ পর দুর্গা দেওয়াল ধরে ওঠে দাঁড়ায়। তারপর টলতে টলতে কিন্তু বিজয়িনীর ভঙ্গিতে বাইরে চলে আসে। এক হাতে সে নিজের ছেলেকে কোলে করেছে। আর এক হাতে থলে। থলের মধ্যে এক মগ চাল।
অনুবাদ : মিলি হোসেন
বিভ্রান্ত-বৈভব – ইব্রাহিম জলিস
অনেকক্ষণ হল সূর্য অস্ত গেছে। অন্ধকার গম্ভীর হতে গভীরতর হচ্ছে। কিন্তু এ যে শুধু অন্ধকার; রাত কোথায়? করাচি থেকে হাজার মাইল দূরে হংকং-এর রাস্তায় মজিদ খান রাতই খুঁজছে। পুরুষের জীবনে সূর্যাস্তের পর যদি কোনো নারী না থাকে, বা নারীর জীবনে পুরুষ না থাকে তবে সূর্যোদয় পর্যন্ত শুধু অন্ধকারই প্রতীয়মান হয়। তাই তো অন্ধকারে নারী-পুরুষের প্রথম মিলনকে ‘প্রথম রাত’ বলে অভিহিত করা হয়।
প্রথম রাত। ইতোপূর্বে জীবনটা গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল।
নারী হলে অন্ধকার রাত, নারী ছাড়া রাত শুধুই অন্ধকার।
যৌবন-সীমায় পা দেবার পর থেকে আজ পর্যন্ত মজিদ খানের জীবনে এই প্ৰথম সূর্যাস্তের পর রাতের বদলে নিকষ কালো অন্ধকার প্রতীয়মান হয়। কারণ, তার মনোরম রাত– কুলসুম করাচিতে অথচ সে এখানে।
মজিদ খান যতদিন করাচি ছিল ততদিন তার জীবনে কুলসুম ছাড়া আর একটি রাতও উদয় হয়নি। আর তাই মেয়েদের সাথে ব্যবহারে মজিদ খান বেশ ধৈর্য, পারদর্শিতা আর সংযমের পরিচয় দিত, যাতে করে এক কুলসুম ছাড়া শহরের যে-কোনো মহিলা নিৰ্ভয়ে তার সাথে মেলামেশা করতে পারত। কিন্তু একান্ত নীরবে-নিভৃতে মজিদ খানের অন্তরাত্মা বারবার তাকে একটিমাত্র প্রশ্নে জর্জরিত করে তুলছে– সত্যি কি মেয়েদের ব্যাপারে খুব বেশি নির্লিপ্ত ছিল? আদমের নির্লিপ্ততার পেছনেও একটা বড় কারণ তখন হাওয়া ছাড়া অন্য কোনো নারীই পৃথিবীতে ছিল না। কিন্তু যেই পৃথিবীতে একাধিক নারীর আবির্ভাব ঘটেছে, অমনি মানুষের ভেতরকার বহুদিনের সুপ্ত পাশবিক প্রবৃত্তি আত্মপ্রকাশ করেছে। তাই তো পৃথিবীতে নারীর জন্যেই প্রথম রক্তের বন্যা প্রবাহিত হয়েছিল।
তাহলে আর নির্লিপ্ততা কী? নির্লিপ্ত মনোভাব বা আভিজাত্যের নিজস্ব কোনো অস্তিত্ব নেই। এটা শুধুমাত্র দৈনন্দিন জীবনের পরিচিতির বন্ধন যা মানুষকে অক্টোপাশের মতো বেঁধে রাখে। যেহেতু পরিচিতির বন্ধন সাধারণ দৃষ্টিসীমার ঊর্ধ্বে সেহেতু মানুষকে ‘কয়েদি’ আখ্যা না-দিয়ে অভিজাত আর নির্লিপ্ত বলা হয়। অতএব মানুষের মধ্যে যদি পরিচিতির বন্ধন না-থাকে তো তারা একে অপরের জন্য পশু ছাড়া আর কিছু নয়।
