দুর্গার স্বামী এক কারখানায় কাজ করে। ভোরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়, ফিরে আসে সাঁঝ দেওয়ার পর একসময়। তা-ও আবার সমস্ত দিন মেশিনের মতো হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে শ্রান্ত-ক্লান্ত হয়ে। বাজার থেকে সওদা-পত্তর সব দুর্গাকে আনতে হয়। সে মজুর মেয়ে। কাজ করতে তার না আছে কোনো আপত্তি, না আছে সময়-অসময়ের প্রশ্ন। যদ্দিন গাঁয়ে বাপ-মায়ের কাছে ছিল, চাষের কাজে সাহায্য করত, চরকা কাটত, চাকি চালাত, বাপ-ভাইয়ের জন্য রুটি তৈরি করে মাঠে নিয়ে যেত, গরু-বলদের জন্য বিচালি কাটাত, দুধ দু’তো, রাতে শোওয়ার আগে গরুগুলো ডেকে-ডুকে এনে বেঁধে রাখত, এমনি কত কী করেছে। বিয়ের পর শহরে এসে তার নন্দ’র মতো সে-ও কারখানায় কাজ করত। প্রতিদিন দশ ঘণ্টা কাজ করতে হত কারখানায়। তারপর বাড়ি ফিরে আবার চুলোয় ফুঁ পাড়ত। কিন্তু কখনো তার একথা মনে হয়নি যে, সে খুব পরিশ্রম করছে। তার নন্দ’র জন্য সে সবকিছু করতে প্রস্তুত। নন্দ কত ভালো মানুষ। দুর্গাকে বোম্বাই নিয়ে এসে সে কত বেড়িয়ে এনেছে চিড়িয়াখানা, চৌপাটি আর অ্যাপোলো বন্দর থেকে। কয়েকবার সিনেমায়ও নিয়ে গেছে। এমন সব জিনিস দুর্গা গ্রামে দেখতে পেত কী করে? নন্দ তার দিকে খুব খেয়াল রাখে। অন্যান্য শ্রমিকের মতো সে মদ খেয়ে বাড়ি ফেরে না বা বউকে মারধোর করে না। এদিকে, ছয় মাসও যখন পূর্ণ হয়নি, তখন দুর্গার কারখানায় যাওয়া সে বন্ধ করে দিয়েছে।
: তোর এখন বাড়িতে বিশ্রাম করা দরকার। তুই এবার আমার ছেলের মা হতে চলেছিস না?– নন্দ হেসে বলেছিল, দেখ, ছেলে চাই, মেয়ের দরকার নেই আমার।
সাপের মতো এঁকেবেঁকে, পিঁপড়ের গতিতে বিড়বিড় করে মেয়েদের দীর্ঘ লাইনটা রেশনের দোকানের দিকে এগিয়ে চলেছে। এখন দুর্গার পেছনেও আট-দশজন স্ত্রীলোক এসে দাঁড়িয়েছে লাইনে। কোথাও কোথাও পরস্পরের মধ্যে আলোচনা চলছে। একটি পারসি স্ত্রীলোক বাজারে দর বেড়ে যাওয়ার বিশদ বর্ণনা দিচ্ছে। একটা খোঁজা মেয়েছেলে চালের ঘাটতির জন্য কংগ্রেসের ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছে। একজন খ্রিস্টান স্ত্রীলোকের ধারণা এসব মহাত্মা গান্ধীর দোষ। তিনি যদি সরকারের সঙ্গে যেচে হাঙ্গামা না-বাধাতেন, তাহলে সরকারও ভারতীয়দের শাস্তি দেওয়ার জন্য চালের ওপর কন্ট্রোল বসাত না।
একটি গুজরাটি স্ত্রীলোক বলে, কংগ্রেস আর মহাত্মা গান্ধীর দোষ দিচ্ছ কেন? জান না, গরমেন্ট লাখো লাখো মণ গম ইরান, ইরাক আর মিশরে রপ্তানি করেছে!
: অ্যাঁ, গরমেন্ট খাবার বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে?– একজন মারাঠি স্ত্রীলোক বিস্মিত হয়ে বলে, কিন্তু আমরা হিন্দুস্তানিরাই-বা কবে নির্দোষ হলাম। ব্যবসায়ী আর আড়তদাররাই কি বাড়িতে কিছু কম চাল ভরে রেখেছে!
: তা নয় তো কী! আমরা এক মগ চালের জন্য পাঁচ-ছয় ঘণ্টা রোদ্দুরের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকি, আর ওদিকে ব্যবসায়ীরা হাজার হাজার মণ চাল লুকিয়ে রেখে দুই গুণ তিন গুণ দামে বিক্রি করছে!
: এরকম লোকদের ফাঁসি দেওয়া উচিত।
: সে অন্য দেশে হয়। আমাদের দেশে তো এদের রায় বাহাদুর, খান বাহাদুর খেতাব দেওয়া হয়, যুদ্ধের কাজের কনট্রাকটরি দেওয়া হয়। এটা হল হিন্দুস্তান।
আর একদিকে যুদ্ধের খবরের ব্যাখ্যা চলছে।
: আরে, তুমি জানো না, জার্মান আর জাপান একই কম্বলের লোম– জাপান সুযোগ পেলে রাশিয়ার ওপর হামলা না-করে ছাড়বে না।
: তাহলে, বাবা, ধরে নাও, তার বিপদই ঘনিয়ে এসেছে। এ বার্মা আর ফিলিপাইন নয় যে, গিলে ফেললে ঢেকুরটাও উঠবে না। এ হল গিয়ে রাশিয়া।— এটি কোনো সাংবাদিকের বউ, যার স্বামী হয়তো স্বপ্নেও খবরের কাগজের হেডিং পড়ে।
রুশ! রৌদ্রে দুর্গার মাথা ঘুরছিল। কিন্তু তার মনে হল, এই ‘রুশ’ শব্দটি সে কোথায় যেন শুনেছে। হ্যাঁ, তার মনে পড়েছে। নন্দ একবার তাকে সঙ্গে করে একটা সভায় নিয়ে গিয়েছিল। শ্রমিকদের সেই সভায় প্রায় পঁচিশ-তিরিশ হাজার শ্রমিক উপস্থিত ছিল। মেয়েছেলেই তো ছিল কয়েক হাজার। চারদিকে লাল লাল ঝাণ্ডা। মাঝখানে একটি উঁচু জায়গা। সেখানে দাঁড়িয়ে লোকে বক্তৃতা দিচ্ছিল। দুর্গা দেখে আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল– বক্তৃতা হচ্ছে অত দূরে উঁচু জায়গাটায়, কিন্তু আওয়াজ আসছে কাছেরই একটা থামে বাঁধা একটি কালো চোঙা থেকে। অদ্ভুত আওয়াজ। যেন কেউ কুয়োর মধ্যে মুখ বাড়িয়ে কথা বলছে। এই আওয়াজটায় শোনা গেল, ভাই সব, হিটলারের খুনি নেকড়েরা রুশিয়ার ওপর হামলা করেছে। রুশিয়া শ্রমিকদের নিজের দেশ। রুশিয়া শ্রমিকদের নিজেদের সরকার।… পৃথিবীর সমস্ত শ্রমিকের কর্তব্য রুশিয়ার সাহায্যের জন্য তৈরি থাকা।… তারপর, হাজার হাজার গলা থেকে এমনভাবে ধ্বনি বেরুল যে, মনে হল, বুঝি-বা আকাশ ফেটে পড়বে।
কতক্ষণ হয়ে গেল দুর্গার দাঁড়িয়ে থাকা! পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখে, ষোল-সতেরো জনের মতো স্ত্রীলোক রয়েছে তার পেছনে। লাইনের সঙ্গে এগোতে এগোতে এবার সে রাস্তার মোড়ে এসে পৌঁছেছে। ঘাড় বার করলে রেশনের দোকানের লাল লাল লেখাওয়ালা সাইনবোর্ডটাও দেখতে পাচ্ছে সে। কিন্তু এখনো কমপক্ষে শ’খানেক স্ত্রীলোক পার হলে তবে সে এক মগ চাল পাবে। একটি ক্লান্ত পা থেকে অন্য ক্লান্ত পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে দুর্গা মনে মনে বলে, দোকানদারটা এত দেরি করছে কেন, বুঝতে পারছিনে তো।– অন্য স্ত্রীলোকরাও কথা বলতে বলতে হাঁপিয়ে পড়েছে। গরম আর নীরবতায় গোটা লাইনটি কাবু হয়ে পড়েছে এখন। নীল উর্দি পরা একটা সেপাই সামনের গাছতলায় ঝিমোচ্ছিল। তাকে ঝিমোতে দেখে দুর্গার সমস্ত ক্লান্তি, পায়ের ব্যথা, পেটের বেদনা– সব তার চোখে এসে জড় হয়। রাস্তার ট্রাম-লাইনে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করে তার। পা দুখানা টলে উঠতেই সামনের স্ত্রীলোকটিকে ধরে দাঁড়ায় সে। বুড়ি মতো লোকটি বলে, ও বোন, একটু নিজের পায়েই দাঁড়াও!– বুড়ির কথায় রাগ বা জ্বালা নেই। কিন্তু দুর্গা লজ্জিত হয়ে একটু যেন বিমূঢ় হয়ে পড়ে। অন্যমনস্কভাবে পিছু হটতে গিয়ে এবারে প্রচণ্ড ধমক খায়, কানী, আমার পা-খানা মাড়িয়ে দিল!– এই স্ত্রীলোকটি দুর্গার হাত থেকে নিজেকে বাঁচাবার জন্য যন্ত্র-চালিতের মতো পিছু হটতেই লাইনের শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন ভাষায় গালাগালি আর অভিশাপের উচ্চ রোল ওঠে।
