মাফলারটিকে গলার চারপাশে এমনভাবে জড়িয়ে রাখা হয়েছে, যাতে করে তার বুকও ঢেকে গিয়েছে মাফলারে। শরীরে সর্বত্র পুরু হয়ে ময়লা জমে রয়েছে, তীব্র দুর্গন্ধ ভেসে আসছে শরীর থেকে। দু-মাস ধরে সম্ভবত গোসল করেনি সে। অবিশ্যি ঘাড়টুকু এর ব্যতিক্রম– ইতস্তত পাউডার ছড়ানো রয়েছে ঘাড়ে।
সোয়েটার আর গেঞ্জির পরে প্যান্টের পালা আসতেই শাহ্নাজ আর গিল আরেকবার পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল।
বেল্টের বদলে প্যান্টটা ছেঁড়া একটা নেক্টাই দিয়ে শক্ত করে বাঁধা রয়েছে কোমরে। বোতাম কিংবা বলেসের কোনো বালাই নেই! দুই হাঁটুর উপর অনেকখানি করে জায়গা জুড়ে কাপড়ই অনুপস্থিত। তাছাড়া, আরো কয়েক জায়গায় ছেঁড়া। প্রায় সম্পূর্ণ প্যান্টটিই ওভারকোটের নিচে ঢাকা ছিল বলে এগুলো কারো চোখে পড়েনি।
বুট আর মোজা খোলার পালা আসতেই আরো একবার মিস শাহ্নাজ আর মিস গিল একজন আরেকজনের দিকে তাকাল।
বুট দুটি অত্যন্ত পুরনো হওয়া সত্ত্বেও পালিশ লাগিয়ে বেশ চকচকে করে রাখা হয়েছে। কিন্তু এক পায়ের মোজার সাথে অন্য পায়ের মোজার কোনো মিল নেই। তাছাড়া, মোজা দুটি এত বেশি ছেঁড়া যে, যুবকের ময়লা গোড়ালি তার থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে পড়েছে।
.
নিঃসন্দেহে ততক্ষণে মৃত্যু হয়েছে তার। নির্জীব দেহখানা পাথরের টেবিলের উপর পড়ে রয়েছে। টেবিলে শোয়ানোর পর মুখখানা ছাদের দিকে ছিল, কাপড়-চোপড় খুলতে গিয়ে সে-মুখ এখন ঘুরে গেছে দেয়ালের দিকে। দৃশ্যটি দেখে মনে হচ্ছে, যেন দেহের নোংরামির সাথে সাথে আত্মার নোংরামির জন্যেও সে খুব লজ্জিত। তাই সবার কাছ থেকে মুখ লুকিয়ে রাখতে চায় সে।
যুবকটির ওভারকোটের বিভিন্ন পকেট থেকে যেসব জিনিস পাওয়া গেছে, তার তালিকা নিম্নরূপ :
একটি ছোট্ট কালো চিরুনি, একটি রুমাল, সাড়ে ছয় আনা পয়সা, আধপোড়া একটি গোল্ডফ্লেক সিগারেট, কয়েকজনের নাম-ঠিকানা লেখা একটি ছোট্ট নোট-বই, নতুন গ্রামোফোন রেকর্ডের একটি মাসিক তালিকা, আর কতকগুলো বিজ্ঞাপনের কাগজ।
দুঃখের বিষয়, বেতের ছড়িটি এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত হয়নি। সম্ভবত দুর্ঘটনার সময় সেটা কোথাও হারিয়ে গেছে।
অনুবাদ : নেয়ামাল বাসির
এক মগ চাল – খাজা আহমদ আব্বাস
সাপের মতো এঁকেবেঁকে, পিঁপড়ের মতো বিড়বিড় করে গুঁড়ি মেরে মেরে, মৌমাছির ঝাঁকের মতো ভনভন করতে করতে দুটি লম্বা লাইন সরকারি রেশনের দোকানের দিকে এগিয়ে চলে। একটি পুরুষের, একটি স্ত্রীলোকের। স্ত্রীলোকের লাইনটা পুরুষের লাইনের চেয়েও লম্বা, প্রায় এক ফার্লং। তার শেষ প্রান্ত রাস্তার মোড় দিয়ে ঘুরে একটি সরু মতো গলিতে গিয়ে ঢুকেছে। যেসব স্ত্রীলোকের আসতে দেরি হচ্ছে, তারা একে অন্যের পেছনে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। রেশনের দোকানটা যে দূর থেকে এক ঝলক দেখে নেবে তারা, তা-ও পারছে না। চোখে পড়ছে শুধু যারা সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তাদের মাথা।
কয়েকশো স্ত্রীলোক হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, পারসি এবং ইহুদি; মুসলমান মেয়েরা কেউ বোরকা পরে এসেছে, কেউ-বা বোরকা ছাড়াই। চিকন কালো মেছুনিরা এসেছে চুলে ফুল গুঁজে। তাদের কাপড়ের আঁশ-গন্ধের সঙ্গে মিশে সেই ফুলের সুগন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। এসেছে ফ্রক-পরা, হাঁটু-আলগা, চটি পায়ে গরিব দেশের খ্রিস্টান গোয়ানিজ মেয়েরা। এসেছে সস্তা পেন্ট, পাউডার ও সেন্টে চুবড়ানো আর নকল সিল্কের মোজা এবং উঁচু হিলওয়ালা জুতো পরা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান মেয়ে। ফুল-কাটা রেশমি শাল কাঁধে ফেলে এসেছে গৌরাঙ্গি, কৃষ্ণকেশী ইহুদি মেয়েরা। আরো এসেছে সুডোল-দেহ মারাঠি এবং অত্যন্ত কৃশাঙ্গি বা ধুমসো গুজরাটি মেয়ের দল, আর কেরানি, মজুর, সাধারণ শ্রেণির দোকানদার এবং ট্যাকসি-ড্রাইভারের বউয়েরা। কেউ বিয়ে করা বউ। কেউ-বা অবিবাহিত বউ। চারদিকে মোতিয়ার কলি আর আঁউরানো ফুল, পেন্ট আর ঘাম এবং মাছ আর নারকেল তেলের গন্ধ। দুপুরের রোদে এই রকমারি সুগন্ধ আর দুর্গন্ধ মিলে ওপর দিকে বাষ্প ঠেলে উঠছে। মারাঠি, গুজরাটি, হিন্দুস্তানি এবং ইংরেজি ভাষার কথাবার্তার একটা অবোধ্য কোলাহল শোনা যাচ্ছে। যেন লাখখানেক মৌমাছি গুঞ্জন করছে। এদিকে চলে অপেক্ষা। ষাট সেকেন্ডে এক মিনিট…ষাট মিনিটে এক ঘণ্টা… এক ঘণ্টা… দু’ ঘণ্টা… তিন ঘণ্টা… সাপের মতো আঁকাবাঁকা, পিঁপড়ের মতো মন্থরগতি মেয়েদের লম্বা লাইনটা ক্রমে আরো বেড়ে চলে। একজন যতক্ষণে লাইনের মাথা থেকে রেশন নিয়ে বিদায় নেয়, ততক্ষণে আরো দুজন পেছনে এসে দাঁড়িয়ে যায়। দুশো আড়াইশো, তিনশো, সাড়ে তিনশো– ক্রমে আরো স্ত্রীলোক এসে দাঁড়ায়। ধৈর্য, সাধুতা আর বিশ্বাসের অদ্ভুত দৃশ্য। যেন পূজার্থিনীর দল মন্দিরের দরজা খোলার প্রতীক্ষায় রয়েছে। এ এক নতুন মন্দির, যেখানে হিন্দু, মুসলমান, পারসি, ইহুদি– সব একসাথে পূজা দিতে এসেছে। প্রত্যেকের একই চিন্তা, একই কামনা, একই সাধ– এক মগ চাল।
দুর্গা এসে মেয়েদের লাইনের একেবারে পেছনে দাঁড়িয়ে যায়। সকাল থেকে মাথা, গা এবং পেটে অসহ্য বেদনা হওয়ায় এখানে আসতে তার দেরি হয়ে গেছে। আজ তার শরীরের অবস্থা এমন নয় যে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা এখানে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু কী করবে! না-এসেও উপায় নেই। ঘরে যে কটি চাল ছিল, সবই শেষ হয়ে গেছে। দুই বেলা বাজার থেকে খাবার কিনে খেয়েছে। কয়েকদিন পর দোকান খুলেছে আজ। চাল যদি সে না নিতে পারে, তাহলে কবে যে বাড়ির খাবার ভাগ্যে জুটবে, কে জানে। আর, এই সময়ের মধ্যে যদি দিন পূর্ণ হয়ে যায় এবং সেই প্রতীক্ষিত লগ্নটি এসে পড়ে, তাহলে তো আরোই মুশকিলে পড়তে হবে।
