চলতে চলতে এখন সে হাইকোর্টের সামনে এসে পড়েছে। এত হাঁটার পরেও তার মুখের মধ্যে কোনো ক্লান্তির ছাপ নেই। এক অপরিবর্তনীয় উদ্যম নিয়ে সে হেঁটেই চলেছে। এখন পায়ে-হাঁটা লোকের ভিড় অনেক কমে এসেছে। অনেকক্ষণ পরে পরে দু-একজন লোক ফুটপাতের উপর দিয়ে আসছে-যাচ্ছে। বেতের ছড়িটাকে এক আঙুলে নিয়ে ঘোরাবার চেষ্টা করল সে। পারল না। ঘোরাতে গিয়ে ছড়িটা নিচে পড়ে গেল। ‘ওহ্ সরি’ বলে ছড়িটা উঠিয়ে নিল হাত বাড়িয়ে।
ইতোমধ্যে একজোড়া তরুণ-তরুণী পেছন পেছন আসছিল। পাশ দিয়েই তারা এগিয়ে গেল সামনের দিকে। ছেলেটা লম্বা স্বাস্থ্যবান। কালো কর্ডের প্যান্ট পরনে। গায়ে চামড়ার জ্যাকেট। মেয়েটির পরনে সার্টিনের ছক-কাটা শালওয়ার আর সবুজ রঙের কোট। তার চলনভঙ্গি বেশকিছুটা গম্ভীর। একটিমাত্র চুলের বেণি পিঠের উপর দিয়ে কোমর পর্যন্ত গড়িয়ে পড়েছে। চলার তালে তালে বেণিটিও সুপুষ্ট দেহের উপর দাপাদাপি করছে।
পেছন থেকে এই দৃশ্যটি যুবকটির কেন জানি উপভোগ্য বলে মনে হল। কিছুদূর নীরবে চলার পর তরুণ-তরুণীর মধ্যে শুরু হল বাক্যালাপ।
ছেলেটির কী কথার জবাবে মেয়েটি হঠাৎ চমকে উঠে বলল, ‘না। না। না। কক্ষনো না। কক্ষনো না।’
‘আমার কথা শোনো লক্ষ্মীটি!’ উপদেশের ভঙ্গিতে ছেলেটি বলল, ‘ডাক্তার আমার বন্ধু লোক। কেউ জানতে পারবে না।’
‘না। না। না।’
‘আমি বলছি, তোমার একটুও কষ্ট হবে না।’
মেয়েটি নিরুত্তর।
‘তোমার বাবা-মা কত দুঃখ পাবেন। তাঁদের মান-ইজ্জতের কথাটাও কি ভাববে না?’
‘চুপ কর, চুপ কর, বলছি! নইলে আমি পাগল হয়ে যাব।’
এতখানি পথ সন্ধের পর থেকে চক্কর দিতে দিতে যত মুখ সে দেখেছে, যত মানুষের কথা শুনেছে– কারুর দিকেই সে আকৃষ্ট হয়নি। হয়নি হয়তো আসলে নিজের ধ্যানেই আগাগোড়া মগ্ন ছিল বলে; না-হয়, তাদের মধ্যে আকর্ষণীয় তেমন কিছু আদৌ পায়নি বলে। কিন্তু উপন্যাসের চরিত্রের মতো অভিব্যক্তিময় তরুণ-তরুণী দুটি তাকে যেন মোহাচ্ছন্ন করে ফেলল। আকর্ষণ অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ার ফলে তাদের আরো কথা শোনার, এমনকি সম্ভব হলে কাছে থেকে তাদের মুখ দুটি দেখে নেয়ারও প্রবল ইচ্ছে হতে লাগল তার।
ততক্ষণে জি.পি.ও.-র চৌরাস্তার কাছে পৌঁছে গেছে ছেলে-মেয়ে দুটি। দুজনেই এক মুহূর্তের জন্যে থেমে আবার মেলোড রোডের উপর দিয়ে চলতে লাগল। যুবকটি দাঁড়িয়ে রইল মল রোডের উপরেই। হয়তো সে ভাবল, সঙ্গে সঙ্গে পেছনে গেলে তারা যদি কোনোরকম সন্দেহই করে বসে, তাই কিছুক্ষণ দেরি করে যাওয়াই ভালো।
ছেলে-মেয়ে দুটি একশো গজের মতো আগে চলে যেতেই একলাফে তাড়াতাড়ি গিয়ে সে তাদের ধরতে চাইল। কিন্তু অর্ধেক পথ পেরোতে না-পেরোতেই একটা লরি পেছন থেকে এসে তাকে চাপা দিয়ে মেলোড রোড দিয়ে বেরিয়ে গেল। আহতের চিৎকার শুনে এক নিমেষে ড্রাইভার গতি ঢিমে করল। সহজেই সে আন্দাজ করতে পারল, গাড়ির তলায় কেউ চাপা পড়েছে। রাত্রির অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি নিয়ে ছুটে পালাল সে। দু-তিনজন পথচারী দুর্ঘটনা হতে দেখেই গাড়ির নম্বর দেখার জন্যে চ্যাঁচাতে লাগল। কিন্তু গাড়ি তখন হাওয়ার সঙ্গে মিশে গেছে।
ইতোমধ্যে আরো জনকয়েক লোক ছুটল সেখানে। একজন ট্রাফিক-ইন্সপেক্টর মোটর-সাইকেল চালিয়ে সেদিক দিয়েই যাচ্ছিলেন, তিনিও থামলেন। যুবকের দুটি পা-ই গাড়ির চাকায় পিষে গেছে। অনেক রক্ত বেরিয়েছে, এখনো বেরুচ্ছে।
সঙ্গে সঙ্গে চলন্ত একটা গাড়ি ধরে নিয়ে তাতে যেমন-তেমন করে আহতকে চাপিয়ে দিয়ে বড় হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়া হল। হাসপাতালে পৌঁছানোর পরেও ধিক্ ধিক্ করে প্রাণস্পন্দন দেখা যাচ্ছিল যুবকটির বুকে।
এমারজেন্সিতে তখন ডিউটিতে ছিলেন অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন মিস্টার খান এবং দুটি তরুণী নার্স মিস শাহ্নাজ আর মিস গিল।
স্ট্রেচারে করে তাকে অপারেশন-রুমের দিকে নিয়ে যাওয়ার সময় নার্স দুটির দৃষ্টি পড়ল তার ওপর। বাদামি রঙের ওভারকোটটি এখনো গায়েই রয়েছে। সাদা সিল্কের মাফলারটিও গলায় জড়ানো। ওভারকোট ও মাফলারের জায়গায় জায়গায় রক্তের দাগ। দয়া করে ফেল্ট হ্যাটখানা তার বুকের উপর আলতো করে রেখে দিয়েছে কেউ।
শাহ্নাজ মিস গিলকে বলল, ‘কোনো ভদ্রঘরের ছেলে বলে মনে হচ্ছে বেচারাকে।’ ফিফিস্ করে গিল বলল, ‘শনিবারে ছুটির সন্ধ্যায় বেশ সেজেগুজেই বেচারা বেরিয়েছিল।
‘ড্রাইভার ধরা পড়েছে কিনা, জানো?’
‘না, পালিয়ে গেছে।’
‘ভারি দুঃখের ব্যাপার।’
অপারেশন-রুমে অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন আর নার্স দুটি নাকের উপর সাদা পটি লাগিয়ে আহতের পরিচর্যায় ব্যস্ত। পাথরের টেবিলের উপর শুইয়ে দেয়া হয়েছে তাকে। মাথা থেকে তীব্রগন্ধী তেলের ঘ্রাণ একটু একটু ভেসে আসছে। দুর্ঘটনায় তার দুটি পা পিষে গিয়ে থাকলেও মাথার টেরিটা তখনো অটুট রয়েছে। এখন তার সমস্ত কাপড়-চোপড় খোলা হচ্ছে। সবার আগে গলা থেকে সিল্কের সাদা মাফলারটি খোলা হল। সঙ্গে সঙ্গে নার্স দুটি চমকে উঠে একজন আরেকজনের দিকে তাকাল। তাদের এই আঁতকে ওঠা বিস্ময়কর নয়। মাফলারের নিচে যুবকের গলায় নেক্টাই বা কলার তো নেই-ই, এমনকি শার্ট পর্যন্ত নেই।
ওভারকোট খোলার পর দেখা গেল, ওভারকোটের নিচে রয়েছে পুরনো ছেঁড়া একটা সোয়েটার। সোয়েটারের অজস্র ছিদ্রের ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে সোয়েটারটির চেয়েও বেশি পচা আর জীর্ণ একটি গেঞ্জি।
