যুবকের ওভারকোটটি যথেষ্ট পুরনো হলেও এর কাপড় কিন্তু বেশ দামি। তাছাড়া, এটা সেলাই করাও হয়েছে কোনো দক্ষ দর্জির কাছ থেকেই। কোটটি দেখলে সহজেই বোঝা যায়, মালিক এর বেশ যত্ন নেয় এখনো। কড়া ইস্তিরি করা শক্ত কলার। রঙের জৌলুস সর্বত্র স্পষ্ট। কোথাও ভাঁজের চিহ্ন নেই। শিঙের বড় বড় বোতাম চক্চক্ করছে। ওভারকোটটির জন্যে সে যেন খুব গর্বিত বলেও মনে হয়।
পান-বিড়ি-সিগারেটের ডালা গলায় ঝুলিয়ে একটি ছেলে সামনে দিয়ে এগিয়ে গেল।
সে ডাক দিল, ‘ওই পানঅলা!’
‘জি হুজুর?’
‘দশ টাকার চেঞ্জ হবে?’
‘না হুজুর। ভাঙিয়ে আনতে পারি। কী নেবেন?’
‘নোট নিয়ে যদি পালিয়ে যাস?’
‘বা সাহেব! চোর নাকি যে পালিয়ে যাব? বিশ্বাস না-হলে আমার সঙ্গে চলেন। নেবেন কী আপনি?’
‘না, না, আমি নিজেই ভাঙিয়ে আনতে পারব। এই যে এক আনা পয়সা পাওয়া গেছে। একটা গোল্ডফ্লেক দিয়ে যা!’
ছেলেটা চলে যাওয়ার পর আরাম করে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে লাগল সে। এমনিতেই তাকে বেশ খুশি দেখাচ্ছিল। কিন্তু গোল্ডফ্লেকের স্বচ্ছ ধোঁয়ার আমেজে সে-খুশি আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেল যেন।
একটি ছোট্ট সাদা বেড়াল ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে বেঞ্চের নিচে তার পায়ের কাছে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে ম্যাও-ম্যাও করতে লাগল। বেড়ালটির গায়ে হাত বুলোতেই লাফিয়ে সে বেঞ্চের উপর উঠে পড়ল। আদর করে তার পিঠের উপর হাত বুলোতে বুলোতে সে বলল, ‘পুওর সোল!’
বেঞ্চ থেকে উঠে রাস্তা পেরিয়ে রঙিন আলোয় উজ্জ্বল সিনেমাহাউসের দিকে সে এগিয়ে গেল। শো তখন শুরু হয়ে গেছে। সিনেমার বারান্দায় ভিড় নেই। দু-চারজন লোক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আসছে-হপ্তার ছবিগুলো দেখে নিচ্ছে। ছোট-বড় বোর্ডের গায়ে সেগুলো লাগানো রয়েছে। সিনেমার বিশেষ বিশেষ দৃশ্যের ছবিই কেবল স্থান পেয়েছে তাতে।
তিনটি অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান তরুণী গভীর মনোযোগ দিয়ে ছবি দেখছিল। সে-ও নিরাপদ দূরত্বের মধ্যে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত সমঝদার দর্শকের মতো ছবি দেখতে লাগল। মেয়েগুলো নিজেদের মধ্যে হাসিঠাট্টায় মত্ত। ফিল্মের ওপরে মন্তব্যও করেছিল কেউ কেউ।
হঠাৎ ওদের মধ্যে থেকে একটি সুন্দরী এবং মুখরা মেয়ে বিকট অট্টহাসি জুড়ে দিল। তারপর, তিনজনেই হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেল সেখান থেকে। যুবকটির ওপর এর কোনো প্রভাব পড়ল বলে মনে হয় না। সে-ও একটু পরেই বেরিয়ে এল সিনেমা হাউস ছেড়ে।
সাতটা বেজে গেছে। মলের ফুটপাতের উপর দিয়ে সে আবার পায়চারি করতে লাগল। একটি রেস্তোরাঁয় অর্কেস্ট্রা বাজছে। ভেতরের চাইতে বাইরেই বেশ ভিড়। বাইরের শ্রোতাদের মধ্যে মোটরের ড্রাইভার আর গাড়ির কোচওয়ানেরা দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর রয়েছে ফল বিক্রি করে টুরি হাতে বাড়ি-ফেরতা কিছু পথিক, ফেরিঅলা, কিছু ভিখিরি। এরা সব সংগীতের সমঝদার শ্রোতা বলেই কোনোরকম গণ্ডগোল না-করে, চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অর্কেস্ট্রা শুনছে– যদিও সুর সম্পূর্ণ বিদেশি। কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে আবার এগিয়ে গেল যুবকটি।
কিছুদূর যেতেই ইংরেজি বাদ্যযন্ত্রের একটি বড়মতো দোকান চোখে পড়ল। বিনাদ্বিধায় ভেতরে ঢুকল সে। চারদিকে কাঁচের আলমারিতে রকমারি ইংরেজি বাজনার সরঞ্জাম সাজানো। একটি লম্বা টেবিলের উপর পশ্চিমা সংগীতের দুই পৃষ্ঠার কয়েকটি পুস্তিকা রাখা। নতুন গানের স্বরলিপি রয়েছে তাতে। পুস্তিকাগুলোর প্রচ্ছদপট সুন্দর রংচঙে, কিন্তু ভেতরের গানগুলো নিম্নস্তরের। উড়ো উড়ো একনজর সে দেখে নিল সেগুলো। সেখান থেকে সরে এসে যন্ত্রগুলোর ওপর নজর বুলোতে লাগল। খুঁটির সাথে ঝোলানো একটি স্পেনীয় গিটারের দিকে সমালোচকের দৃষ্টিতে তাকাল। গিটারের সাথে লাগানো প্রাইস-টিকেটটা পড়ল। সেখান থেকে সরে গিয়ে একটি জার্মান পিয়ানো আঙুল দিয়ে নেড়ে চেড়ে, বাজিয়ে দেখে নিয়ে, বন্ধ করে রাখল!
দোকানের একজন কর্মচারী তার দিকে এগিয়ে এসে বলল, ‘গুড ইভ্নিং স্যার। বলুন, আপনার কী চাই?’
‘না, ধন্যবাদ। হ্যাঁ, এ মাসের নতুন গ্রামোফোন রেকর্ডের একটা লিস্ট আমাকে দিতে পারেন
লিস্টখানা ওভারকোটের পকেটে ফেলে রাস্তায় নেমে পড়ল সে। তারপর, আবার চলতে লাগল। রাস্তার ধারে একটি ছোট্ট বুক-স্টলে গিয়ে সে দাঁড়াল। কয়েকটি নতুন পত্রিকার পাতা উল্টে, নেড়েচেড়ে দেখে, আবার যত্ন করে সাজিয়ে রেখে দিল। সেখান থেকে আরো কিছুদূর এগিয়ে যেতেই কার্পেটের একটা দোকান চোখে পড়ল তার। লম্বা চোগা আর মাথায় লম্বা তুর্কি টুপি পরা দোকানের মালিক তাকে বেশ সাদর সম্ভাষণ জানালেন।
‘ইরানি কর্পেটটা দেখার ইচ্ছে ছিল।… ঠিক আছে, নামাতে হবে না। আমি এমনিই দেখে নেব। এটার দাম কত পড়বে?’
‘চোদ্দ শো বত্রিশ টাকা।’
যুবকটি ভ্রু কুঁচকাল– ভাবখানা এই, এত দাম?
‘আপনি আগে পছন্দ করে নিন, তারপর যতটুকু সম্ভব, আপনার কাছ থেকে কম নেবার চেষ্টা করব।’
‘ধন্যবাদ। আমি এখন শুধু একনজর দেখতে এসেছিলাম।
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই, দেখবেন বইকি। আপনার নিজের জিনিস মনে করে দেখুন, স্যার।’
দু-তিন মিনিট পরে কার্পেটের দোকান থেকেও বেরিয়ে এল সে। ওভারকোটের জায়গায় জায়গায় ফুটন্ত গোলাপফুলের যে কাজ করা রয়েছে, কোথাও কোথাও তার সুতো খুলে গেছে দেখে সেগুলো ঠিক করে দিতে দিতে তার ঠোঁটের কোণায় মৃদু, অথচ অর্থপূর্ণ হাসি ফুটে উঠল। তারপর, আবার ফুটপাতের উপর দিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটতে লাগল।
