নেংড়ি মামি আগে আগে, পেছনে মেয়েটি। মেয়েটির পেছন দিকে জামাটার এক জায়গায় ছেঁড়া। তারই ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে ফর্সা পিঠের ওপর সাপের মতো এঁকে বেঁকে পড়ে রয়েছে বেণি-গাঁথা চুলের রাশ। দুজনে ডুলিতে উঠেই সেই মুহূর্তে রওয়ানা হয়ে গেল। এ-ওর মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। কারো মুখে কোনো কথা ফুটল না।
অবশেষে মামির বাড়িতেই একটি মেয়ে জন্মাল তার। পাড়ার সবাই ঘটা করে দেখতে এল। কারো সাহসই হল না নেংড়ি মামির বাড়িতে এমন দিনে অনুপস্থিত থাকার। ঢোল বাজল। খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা হল। এমনকি, কিছুদিন পরে মেয়েটির প্রণয়ীও ফিরে এল। যথারীতি বিয়েও হয়ে গেল তাদের। আমরাও তাদের বিয়ের ফুর্তিতে যোগ দিলাম। এককথায়, সবকিছুরই শুভ পরিণতি স্বচক্ষে দেখতে পেলাম আমরা।
.
নেংড়ি মামি যখন মারা গেলেন, আমার বয়েস তখন সতেরো কি আঠারো। মৃত্যুর খবর নিয়ে চিঠি আসার পর বারবার শুধু একথাই ভেবেছি, গ্রামে এখন না-জানি কী ভীষণ নীরবতা নেমে এসেছে। কারণ, আজকে সেখান থেকে একজন সংবেদনশীল এবং হিতৈষী বন্ধু চলে গেছেন। চলে গেছেন একজন পূর্ণবিকশিত মানুষ।
অনুবাদ : নেয়ামাল বাসির
ওভারকোট – গোলাম আব্বাস
জানুয়ারির কোনো এক শনিবারের সন্ধেয় সুন্দর পোশাক পরা একটি যুবক ডেভিস রোড থেকে বেরিয়ে মল রোডে এসে নামল। তারপর, ফুটপাত ধরে আস্তে আস্তে চেয়ারিং ক্রসের দিকে চলতে লাগল। হাবভাব দেখে তাকে বেশ রুচিশীল ভদ্রলোক বলেই মনে হচ্ছে। লম্বা লম্বা জুল্ফি। ঝক্ঝকে চুল। পাতলা একজোড়া গোঁফ (যেন সুর্মার শলা দিয়ে আঁকা)। গায়ে বাদামি রঙের গরম ওভারকোট (হালকা রঙের দু-একটি ফুটন্ত গোলাপফুলের কাজ করা)। একপাশে বিশেষ কায়দায় কাত করা মাথার ওপর একটি ফেল্ট হ্যাট। সিল্কের সাদা মাফলার গলায় জড়ানো এক হাত ওভারকোটের পকেটে, অন্য হাতে বেতের একটি ছড়ি। মাঝে মাঝে ছড়িটাকে সে ঘুরিয়ে চলেছে।
তীব্র শীতের মরশুম তখন। জোর ঠাণ্ডা হাওয়া গায়ে এসে সুচের মতো বিঁধছে। কিন্তু যুবকটির এসবে বিশেষ কিছু এসে-যাচ্ছে বলে মনে হয় না। আর-সব পথচারী জোরে জোরে পা চালিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল– শরীর কিছুটা গরম হবে এই ভরসায়। কিন্তু যুবকটির এসবের যেন কোনো প্রয়োজনই নেই। এই কন্কনে শীতে পায়চারি করে বেড়িয়েই যেন তার তৃপ্তি
দূর থেকে তার চলন দেখেই টাঙাঅলা ভুল করে ঘোড়া ছুটিয়ে কাছে এল। কিন্তু ছড়ির ইশারায় অসম্মতি জানাল সে। একটি খালি ট্যাক্সিও একসময় কাছে এসে থামল। কিন্তু সে শুধু ‘নো, থ্যাংক্স্’ বলেই এগিয়ে গেল সেখান থেকে।
মলের সুসজ্জিত এলাকার দিকে যতই সে এগিয়ে চলল, চলার কায়দা তার ততই ভদ্রোচিত হতে লাগল। শিস কেটে, চলনের মধ্যে একটা ইংরেজি নাচের ঢং ফুটিয়ে তুলল মাঝে মাঝে। দেহের সাথে সাথে পা দুটিও নাচতে লাগল। আশপাশে তাকিয়ে নিয়ে মিছিমিছি বল ছোঁড়ার কায়দার একবার সে ছুটে গেল। সত্যি-সত্যিই ক্রিকেট ম্যাচ হচ্ছে যেন।
চলতে চলতে লরেন্স গার্ডেনসের দিকে যাবার পথ দেখা গেল। কিন্তু সন্ধের অন্ধকার, ঠাণ্ডা বাতাস আর অবিরাম শিশির পড়ার জন্যে বাগান জনশূন্য, তাই সেদিক পানে সে আর এগুলো না। সোজা চেয়ারিং ক্রসের দিকেই চলতে থাকল সে।
রানির মূর্তির কাছে গিয়ে তার গতি কিছুটা শ্লথ হয়ে এল। পকেটের বদলে আস্তিনের ভাঁজের ভেতর থেকে একখানা রুমাল বের করে আলতোভাবে মুখের ওপর বুলিয়ে নিল একবার। ধুলো জমে থাকলে পরিষ্কার হয়ে যাবে– এই উদ্দেশ্যে।
পাশেই ঘাসের একটি চত্বরে কয়েকটি ইংরেজ-শিশু বল নিয়ে খেলা করছে। খুব মনোযোগ দিয়ে খেলা দেখতে লাগল তাদের। তার এই উপস্থিতিকে আমল না-দিয়ে ছেলেরা আগের মতোই খেলে যেতে লাগল। কিন্তু লোকটাকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে ক্রমেই তারা লজ্জা পেতে লাগল। তারপর, হঠাৎ বলটা উঠিয়ে নিয়ে হাসতে হাসতে সেখান থেকে তারা সরেই পড়ল অবশেষে
সিমেন্টের একটি খালি বেঞ্চের উপরে গিয়ে যুবকটি বসে পড়ল। সন্ধের অন্ধকার বাড়বার সাথে সাথে ঠাণ্ডাও বেড়ে চলেছে খুব। শীত বেশ তীব্র বটে, কিন্তু লোকে আরাম-প্রীতির তীব্রতা তীব্র শীতেই বেশি করে অনুভব করে। বিশেষ করে একথা সত্যি শহরের যারা আয়েসি, তাদের কাছে। তারা এমন ঠাণ্ডায় কখনো চুপচাপ বসে থাকতে পারে না। যারা নিতান্তই একা থাকতে ভালোবাসে, তারাও এমন সময় সঙ্গ খোঁজে। ঘরের কোণ থেকে বেরিয়ে, সভা-বৈঠকে গিয়ে গা গরম করার কথা চিন্তা করে। সঙ্গী পাওয়ার আনন্দ তাদের বাইরে বের করে আনে। সাধ্যমতো কেউ রেস্তোরাঁ-কফিখানায়, কেউ নাচশালা-প্রেক্ষালয়ে কিংবা অন্য কোনো আড্ডায় মজলিশে গিয়ে নিরাপদ হতে চায় শীতের হাত থেকে।
মল রোডে মোটর-ট্যাক্সি, টাঙা আর বাই-সাইকেল তো হরদম চলছেই, ফুটপাতের উপর দিয়ে পায়ে-হাঁটা লোকের যাতায়াতেরও কমতি নেই। তাছাড়া, রাস্তার দু-পাশের সারিবদ্ধ দোকানগুলোয় কেনাবেচাও পুরোদমে চলছে। যেসব হতভাগার পয়সা খরচ করে আড্ডা জমানোর বা বাজার-সওদা করে সময় কাটানোর ক্ষমতা নেই, দূর থেকেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অন্যদের আড্ডা দেয়া আর দোকানের রং-বেরঙের আলো দেখে নিচ্ছে তারা।
যুবকটি পাকা বেঞ্চের উপর বসে সামনের রাস্তা দিয়ে চলমান মেয়ে-পুরুষের ভিড়ের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে। তাদের মুখের চাইতে পোশাকের দিকেই তার বেশি নজর। হরেক শ্রেণির লোক রয়েছে পথচারীদের মধ্যে– বড় বড় ব্যবসায়ী, সরকারি অফিসার, লিডার, শিল্পী, কলেজের ছাত্র, বেকার কর্মপ্রার্থী, নার্স, খবরের কাগজের রিপোর্টার, অফিসের কেরানি। তাদের বেশিরভাগই ওভারকোট পরা। নানান ধরনের রং-বেরঙের ওভারকোট। অতি মূল্যবান রংচঙে থেকে শুরু করে নিলামে কেনা ছাই-রঙের পুরনো মিলিটারি ওভারকোট পর্যন্ত– সবরকমেরই চোখে পড়ছে।
