আমাদের বাড়ির গা-লাগা কয়েকটা ঘরের বস্তি ভিখিরিদের। এক ভিখিরির একটি মেয়ে ছিল। বেশ সুন্দরী মেয়েটি। একজনের সাথে প্রেম করত সে। পাড়ার আরো কয়েকজন লোক তার কাছে ভিড়বার চেষ্টা করত। এদেরই একজন হল গুণ্ডা পালোয়ান শরফু। শরফুকে সবাই ভয় করে চলত তার গুণ্ডামির জন্যে। কিন্তু মেয়েটি মোটেই আমল দিত না তাকে। আর, গোপনে গোপনে প্রণয়ীটির সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করত। একদিন প্রণয়ী বিদেশে চলে গেল। যাবার বেলায় প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেল, অনেক টাকা-কড়ি কামাই করে খুব শিগগিরই ফিরে আসবে সে। কিন্তু যাবার আগে জেনে গেল না, মেয়েটি মা হতে চলেছে।
কিছুদিন পরেই সবাই জেনে ফেলল ব্যাপারটা। এত বড় কথা কি কখনো লুকোনো থাকে, না থাকা সম্ভব? তার পরে যা টিটকারি-গালমন্দের পালা শুরু হল, তা আর নাই-বা বললাম।
বেশ মনে আছে, সেদিন সকাল হতে না-হতেই আমাদের বাড়িতে বিচারের আয়োজন হল। জমিদারবাড়ি বলে সবাই ঝগড়া-বিবাদের ফয়সালা সাধারণত করতে আসত এ বাড়িতেই।
সবাই ততক্ষণে এ সিদ্ধান্তেই উপনীত হতে পেরেছেন, মেয়েটি নাক কেটে না-দিলেও নিদেনপক্ষে যেন তার মাথা মুড়িয়ে দেয়া হয় এবং সেই সঙ্গে একঘরেও করা হয়। তাছাড়া, পাড়ার মধ্যে সে আর থাকতেও পারবে না, নইলে অন্য লোকের মেয়েও নষ্ট হতে পারে।
এ ধরনের প্রস্তাবে শরফু পালোয়ান সবার আগে সম্মতি জানিয়ে বসল। বাইরে পুরুষ লোক গিজগিজ করছে, ভেতরে মেয়ে। একজন আরেকজনের চেয়ে বেশি জোরে কথা বলার জন্যে যেন প্রতিযোগিতায় নেমেছে। কেবল একজনকেই দেখা গেল মৌন। সম্পূর্ণ বোবা বনে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই অপরাধী মেয়েটি। বেশ মনে পড়ছে, মেয়েটির করুণ নীরবতা আমার কচি মনেও অদ্ভুত অনুভূতি জাগিয়ে দিয়েছিল। আখ চিবাতে চিবোতে একটু একটু করে তার আরো কাছ ঘেঁষতে লাগলাম আমি। মা অমনি বেজায় ধমক দিয়ে উঠলেন, ভাগ এখান থেকে! ওদিকে কোথায় যাচ্ছিস?
কী আর করা যায়! শেষমেশ ঘড়াঞ্চির আড়ালে গিয়ে লুকিয়ে পড়লাম। হঠাৎ বাইরে থেকে কাহারের ডাক শোনা গেল, সওয়ারি নাবিয়ে নাও!
নেংড়ি মামি মোটা মার্কিনের চাদরে পবিত্র পাতলা দেহটা ঢেকে ডুলি থেকে নেমে পড়লেন। গেট পার হয়ে বাড়ির মধ্যে ঢুকে একনজর তাকিয়ে নিলেন মেয়েটির দিকে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সে থরথর করে কাঁপছে। তাকে দেখে মামি বললেন, আহা বেচারা, বাছাধন!
তারপর, নানির পালঙের উপর গিয়ে বসলেন তিনি। অনেকক্ষণ ধরে হাসতে হাসতে এদিক-সেদিকের নানান কথা পাড়তে থাকলেন– যেন গুরুত্বপূর্ণ তেমন কিছুই হয়নি। পাঠান বউ এগিয়ে এসে সবকিছু খুলে বলতে চাইল তাঁকে। আমাদের বাড়িতে রান্নার কাজ করে সে। প্রথম স্বামীর মৃত্যুর পরে দ্বিতীয় স্বামীকে তালাক দিয়ে এখন তৃতীয় জনের ফিকিরে ঘোরে। নেংড়ি মামি হাতের ইশারায় বাধা দিলেন তাকে। বললেন, থাক, থাক, জানি বাছা, সব জানি।
ব্যস্, এক মিনিটে তার সব উত্তেজনা ঠাণ্ডা। বার থেকে শরফুর গলার আওয়াজ পেয়ে মামি বড় খালাকে জিজ্ঞেস করলেন, কাজু, বাইরে কথা বলছে, ওটা কে? শরফু না?
খালা বেশ আদবের সাথে জবাব দিলেন, জি হ্যাঁ।
তারপর, শরফুর মাথা মুড়িয়ে দেয়ার প্রস্তাবটি তিনি নেংড়ি মামিকে বুঝিয়ে বললেন, আর নিজের সম্মতির কথাটাও সেই সঙ্গে জুড়ে দিলেন।
সবকিছু শোনার পর মামি কোমরবন্ধ থেকে কৌটো খুললেন, একটুখানি দোক্তা বের করে তিনি মুখে পুরে দিলেন। আস্তে করে একবার শুধু বললেন, হুঁ―। তারপর, কৌটো যথাস্থানে বন্ধ করে রাখলেন তিনি। পালঙ থেকে নেমে লাঠিটা নিয়ে চলতে লাগলেন গেটের দিকে। ঘড়াঞ্চির পেছন থেকে সবকিছুই দেখতে পাচ্ছি আমি। মামির প্রতিটি পদক্ষেপে অপরাধী মেয়েটির মুখখানা আরো যেন ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে। সবাই নীরব। প্রত্যেকের দেহমনে শুধু প্রতীক্ষার উমেদারি। প্রতীক্ষা ফলাফলের। নেংড়ি মামি সদর দরজার আড়ালে গিয়ে ডাক দিলেন, শরফু!
শরফু গেটের বাইরেই দাঁড়িয়েছিল। সাড়া দিল, জি।
মামি একটু কেশে গলাটা পরিষ্কার করে নিলেন, দেখ, শরফু, মরণকালে তোর সাথে ইমান ছাড়া আর কিছুই যাবে না, মনে রাখিস। সত্যি কথাটা ইমানদারের মতোই বলবি– তুই কেন বেচারি অভাগিনীর এত শত্রুতা করছিস? ও তোকে পাত্তা দেয়নি বলেই নয় কি? সবকিছুই আমি জানি কিন্তু বলে দিচ্ছি, শরফু; সেসব কথা বলার জন্যে যেন আমায় আবার মুখ খুলতে না হয়। হুঁ। আর আমি যদি মিথ্যে বলে থাকি, তাহলে হজরত আব্বাসের কসম, তুই বলে দে, কোনটা মিথ্যে বলছি। আমার পাকা চুলের এতটুকুও তোকে খাতির করতে হবে না। হুঁ, বল্!
বাড়ির ভেতরে, বাড়ির বাইরে সবার মুখে যেন তালা-চাবি লেগে গেল। নেংড়ি মামি প্রত্যেকের ওপরে একবার করে নজর বুলিয়ে নিলেন। সবাই চুপ। সত্যি কথাটা কেই-বা অস্বীকার করতে পারে! শরফুর কীর্তির কথা কারো তো আর অজানা নয়। তাই তার সপক্ষেই-বা কার কী বলার থাকবে!
নেংড়ি মামি ঘুরে দাঁড়ালেন। চলতে চলতে বললেন, তুই একবার নিজের দিকে তাকিয়ে দেখ! এই হতচ্ছাড়াটা তবু একজনের জন্যে মরতে পারল। আর তুই! তোর জন্যে কিই-বা আর বলব, বল। যা, এখন আর বেশি বাড়াবাড়ি করিনে, বলে দিচ্ছি! ডুলিটা ডেকে দিয়ে যা!
শরফু মাথা হেঁট করে সরে পড়ল। যেন দাবার ছক থেকে আস্ত মন্ত্রীটাই সরে গেল, মাত হয়ে গেল পুরো জনতাই। তারপর মেয়েটিকে ডাক দিলেন তিনি, চল্ পোড়ারমুখী আমার সাথে! নিজেও ডুবলি, কপালটাকেও ভাঙলি
