পরেরদিন ইমামবাড়ার পেছনে লোকটির মৃতদেহ পাওয়া গেল। হাত দুটো আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলেছিল সে। হাতে রুমাল জড়ানো। পরে জানা গেল, লোকটি আত্মহত্যা করেছে বিষ খেয়ে। মরার আগে মামির নামে দু-লাইনের একটা চিঠিও লিখে রেখে গেছে। তাতে করজোড়ে ক্ষমা চেয়েছে সে। আর, লিখেছে, কেয়ামতের দিন যেন তার বিরুদ্ধে আল্লার কাছে তিনি কোনো অভিযোগ না-আনেন।
নেংড়ি মামিকে এ ঘটনার কখনো কোনো উল্লেখ করতে শুনিনি। তবু কোনোক্রমে এ প্রসঙ্গ উঠলেই তিনি কেঁদে ফেলেন। ঠাণ্ডা একটা নিশ্বাস ফেলে শুধু বলেন, সে চলে গেছে ভালো জায়গায়, আর আমি এখানে পড়ে আছি। আল্লা তাকে নিশ্চয় মাফ করবেন। আমি কক্ষনো প্রতিশোধ নিতে চাইব না।
গ্রাম, তা-ও আবার সেকালের অজপাড়া-গাঁ। ভাঙা-পা জোড়া দেয়া তাই আর সম্ভব হয়নি। ফলে আজীবন খোঁড়াই রয়ে গেলেন তিনি। এ ঘটনার পর তাঁর দিকে আর চোখ তুলে চাইবার সাহসটুকুও কারো হতো না।
সারাটা জীবন আশাহত আর নিঃসঙ্গভাবে কাটিয়ে দেয়ার পরেও নেংড়ি মামির চরিত্রে কোমলতা আর রসিকতার ভাবটুকু পুরোপুরিই অটুট রয়েছে। তাঁর প্রতিটি অঙ্গ যেন প্রীতি আর সহানুভূতি দিয়ে গড়া। তারই মিশ্র অভিব্যক্তি তাঁর সারাটা জীবনকে বাঙ্ময় করে তুলেছে।
কারো বিয়ে হলে, নেংড়ি মামিই সেখানে সবার আগে গিয়ে হাজির; দেখা গেল, ঢোল নিয়ে এসে বাজাতে বসে গেলেন তিনি। সবসময়, সব অবস্থাতেই তিনি খুশি এবং সব কাজেই তিনি অগ্রণী। কোথাও নব-দম্পতির মধ্যে মনোমালিন্য দেখা দিয়েছে, অমনি নেংড়ি মামি ভীষণ ব্যস্ত। এখান থেকে ওখানে যাচ্ছেন, ওখান থেকে এখানে আসছেন। তখন তাঁর একমাত্র কামনা, তাদের পুনর্মিলন সম্ভাবিত হোক। কোনো বিয়েতে গান-বাজনার আয়োজন হলে, দেখা গেল, তিনিও সেখানে গাইছেন। প্রসবের বেলায়ও তিনি উপস্থিত। কখনো কারো জন্যে হয়তো পথ্য তৈরি করছেন, কারো জন্যে অন্য কিছু। অসুখ-বিসুখে কতজনের জন্যেই-না কতরকমের ওষুধ পিষছেন, কুটছেন, ছাঁকছেন, তৈরি করছেন। কেউ সুস্থ হয়ে উঠলে তার জন্যে পথ্য নিয়ে যাচ্ছেন, জানের ‘সকা’ হিসেবে রুটি দিচ্ছেন ফকিরকে। কেউ বিদেশ যাত্রায় বেরুলে তিনি পীর-ইমামদের স্মরণ করছেন। দুঃখীর দুঃখে কাঁদছেন, সুখীর সুখে হাসছেন। সবারই খবর নিয়ে বেড়াচ্ছেন, অথচ নিজের খবরটি জানাচ্ছেন না কাউকে।
যখন আমি ছোট ছিলাম, আমার বোধশক্তি অপরিপক্ক ছিল, তখন তাঁকে বুঝিনি। কিন্তু আজকে কারণে-অকারণে কেবল তাঁর কথাই মনে পড়ে যাচ্ছে। কত আন্তরিকতার সাথেই-না তিনি মেয়েদের সুখী-সমৃদ্ধিশালী জীবনের জন্যে প্রার্থনা জানাতেন। মনে হত যেন তাঁর জীবনের সমস্ত দুঃখ-বেদনাকে এই প্রার্থনা দিয়ে ধুয়ে নিচ্ছেন তিনি। যেন বলছেন, আমার জীবনে কিছুই পেলাম না, তবু তোমরাই সবকিছু পেয়ে সুখী হও। তোমাদের সুখ দেখলে আমিও সুখী হব।
.
নেংড়ি মামির সাথে কখনো কারো ঝগড়া হত না। একমাত্র ডুলিবাহক কাহার ছাড়া। কখনো কোথাও তিনি পায়ে হেঁটে যেতেন না। দু-পা যেতে হলেও ডুলি নিতেন। ডুলি থেকে নেমে গেট পার হবার সময় কাহার ডাক ছাড়ত, নেংড়ি মামি, আরেক আনা পয়সা পাঠিয়ে দিও। বিশ বছর তোমাকে বয়ে বেড়াচ্ছি।
অমনি তিনি রেগে যেতেন, ভ্যালা জ্বালাতন দেখছি! কিসের এক আনা পয়সা, শুনি! নিমতলার মজলিস থেকে আসছি, সেখানে নিয়েছ একআনা। আবার এক আনা কিসের? বিশ বছর বয়ে বেড়াচ্ছ, তাতে হয়েছে কী? বিশ বছরে কি আমার ওজন বিশ মণ বেড়ে গেছে নাকি?
পাড়া-প্রতিবেশী সবাই তাঁর এই ঝগড়ায় মজা পেত খুব।
এছাড়া, আরো একদল লোকের সাথে তাঁর ঝগড়া হত। এরা তাঁর ছাগলটিকে মার-ধোর করত। ছাগলটিও ছিল যেন বেশ একটা তাগড়া বলদের মতো। যেখানে যখন খুশি ঢুকে পড়ত। লোকে একটুখানি বিড়বিড় করেই চুপ হয়ে যেত। কিংবা চ্যাঁচাতে শুরু করত, উহ্, নেংড়ি মামির ছাগলের জুলুম– আল্লা রে আল্লা, আর সওয়া যায় না। বলি হল তো, ধনেগাছগুলো সব মুড়িয়ে দিলে কমবক্ত। এ ভাই, শিগগির ছাগলটাকে একটু তাড়িয়ে দাও!
ততক্ষণে, সম্পূর্ণ না-হলেও অন্তত অর্ধেক শেষ হয়ে গেছে। এখন ছাগলটাকে মারেই- বা কে? সারাটা পাড়ার লোকই যে তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। প্রত্যেকেরই তো তিনি কিছু না-কিছু উপকার নিশ্চয়ই করেছেন। তবু যদি কেউ তাঁর ছাগলকে ছোঁয়-ও তাহলে সে ম্যা ম্যা করে বাড়ি চলে যায়। কখনো কখনো অনেকে শুধু এই দৃশ্য দেখার জন্যেই ছাগলটিকে মেরে বসে। নেংড়ি মামি ডাল ধোয়া কিংবা কাপড় সেলাই ফেলে ছাগলটির গলা জড়িয়ে ধরেন। তারপর, বিনিয়ে বিনিয়ে বলতে থাকেন, আমার মেয়েকে কারা ধরে মারল গো! আল্লার বে-গোনাহ অবলা জানোয়ার, তাকে কি কখনো মারতে আছে? তুই-ই-বা কেন কমিনাদের বাড়ি যাস্ বল দেখিনি মা! বাড়িতে থাকতে পারিনে? নে, এখন চাট্টি ভুষি খেয়ে নে!
বিড়বিড় করে খোঁড়াতে খোঁড়াতে ঘরে মধ্যে ঢুকে মামি ভুষি এনে, ছাগলের সামনে রেখে দেন। ছাগলটি মাথা নড়িয়ে নড়িয়ে ভুষি খেয়ে চলে– ব্যাপারখানা যেন পুরোপুরিই সে আন্দাজ করতে পেরেছে। কখনো-বা ছাগলটির সাথে মামি এমন সব কথাও বলেন, যা আর কারো পক্ষে চিন্তা করাই কঠিন।
আরো একটি ঘটনা যখনই মনে পড়ে যায়, মনের মধ্যে কেমন এক অদ্ভুত অনুভূতি এসে জড়ো হয়।
