দুর্বল দড়ির দিকে তাকিয়ে অনুযোগের সুরে বললাম, নেংড়ি মামি, দড়িটা যে ছিঁড়ে যাবে!
না রে, না, ছিঁড়বে না। এখনো শক্ত আছে– বোস্ তো তুই!
দোলনা চড়ে দোল খেতে শুরু করে দিলাম আমি। কুলগাছের নরম ডাল দুলতে থাকল। চোঁ চোঁ চর্র্র্―। নেংড়ি মামি পড়াতে লাগলেন, আলিফ জবর আ, বে জবর বা– ছুঁড়ি, পড়তে পারিসনে, খেতে তো পারিস খুব! মুখ দিয়ে কথাই বেরোয় না যে! এত মেহনতের দাম নেই বুঝি! হ্যাঁ, বল– তে জবর তা, জিম জবর জা–!
মামির হাতে একটা ছোট্ট পাখা। পাখাঁটির চারদিকে কালো কাপড় দিয়ে মোড়া। মধ্যিখানে কালো কাপড়েরই একটা পানের নকশা। পানের মধ্যে আবার সুতো দিয়ে ফুল তোলা। সুতোগুলো ছিঁড়ে এদিকে-সেদিকে বেরিয়ে পড়েছে। কখনো কখনো কোনো মেয়ের পিঠের ওপর বর্ষিত হচ্ছে পাখাঁটি।
অবশেষে পড়ানোর কাজ শেষ হল। মেয়েরা বই-পত্তর গুটিয়ে নিয়ে চলতে লাগল।
লাল চুড়িদার পাজামা পরা মেয়েটিকে ডেকে তিনি বললেন, এই, শোন্ তো উমরের মেয়ে! দাঁড়া!
খোঁড়াতে খোঁড়াতে ঘরের মধ্যে চলে গেছেন তিনি। ঘর থেকে এক টুকরো ভেলি গুড় আর কাগজের মোড়কের মধ্যে কী যেন নিয়ে ফিরে এলেন। একটা বড় কাগজের মধ্যে জিনিস দুটি মুড়ে মেয়েটি হাতে দিয়ে বললেন, মাকে বলিস, কাগজটা যেন আবার আমাকে ফিরিয়ে দেয়। আমার কাছে আর কাগজ নেই। কালকে তুই নিয়ে আসিস যেন, বুঝলি? আর, ওই ছোঁড়াটার জ্বর ছেড়েছে রে?
মেয়েটি বলল, না। এখনো ছাড়েনি!
দোলনাটা থামিয়ে মেয়েটির নাকে রুপোর ছোট্ট নোলকটা লক্ষ করছিলাম আমি।
তাহলে সাঁঝের বেলা ওষুধ নিয়ে যাস। মগরেবের নামাজের আগে তৈরি করে রাখব’খন।
মেয়েটি চলে গেল। নেংড়ি মামি মিনিটিখানেক মিঠু মিয়াকে আদর করলেন। তারপর, আমার দিকে মন দিলেন, আয়, এখানে বোস্!
দোলনা থেকে নেমে চৌকিতে গিয়ে বসলাম আমি। মামি আবার খোঁড়াতে খোঁড়াতে ঘরের ভেতর চলে গেলেন। বাইরে বসে বসে চাবির ঝনঝন আর বাক্স খোলা এবং বন্ধ করার খটখট আওয়াজ শুনতে পেলাম। একটু পরে এক হাতে একটা পোঁটলা আরেক হাতে ছোট্ট একটা প্লেট নিয়ে বের হলেন মামি। বললেন, ততক্ষণে তুই খা দেখিনি এগুলো!
আমার সামনে প্লেটখানা তিনি রেখে দিলেন। তাতে রয়েছে হরেক রকমের খাবার জিনিস। তারপর পোঁটলা খোলা হল। তার ভেতর থেকে বেরুল কাপড়ের একটা সেলাইদানি। সেলাইদানি থেকে বেরুল নানান রঙের কাটা কাপড়। মামি বেশ নিশ্চিন্ত হয়ে পা ছড়িয়ে বসে কাপড় খুঁজতে খুঁজতে বললেন, তোরা বাবা তো চীনা প্লেটে খায় রে, না? আর আমার প্লেট দিল্লি থেকে আনা। তাই তোর জন্যে বের করে দিলাম।… দেখ তো এত বড় নিবি পুতুল?
হাত দিয়ে মেপে দেখালেন পুতুলের দৈর্ঘ্য। আমি ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালাম। ইয়া হজরত আলি, মুশকিল আসান’ বলে তিনি পুতুল সেলাইয়ে মন দিলেন।
সাত রাজ্যের লোকের সেলাই করেন নেংড়ি মামি। জীবিকার বেশির ভাগই আসে তাঁর সেলাইয়ের কাজ থেকে। রমজানের সারাটা মাস তিনি পাড়ার যত বিধবা আর অনাথদের কাপড় সেলাই করেন বিনা পারিশ্রমিকে। সব কাজই তাঁর হাতে-সেলাই। বাজার থেকে কখনো সুতো কিনতে হয় না তাঁকে। লোকের কাছ থেকে যতরকমের কাপড় আসে, তার থেকে দশ-বিশটা সুতো বের করে পাকিয়ে নিয়ে তাই দিয়ে সেলাইয়ের কাজ চালিয়ে যান তিনি। এই পাকানো সুতো এত মজবুত হয় যে, বাজারের রিলের সুতোকেও হার মানিয়ে দেয়। তাঁর কাছে যতরকমের কাপড় এসেছে সেলাইয়ের জন্যে, সবরকম থেকেই সুতো বের করে নিয়ে পাকিয়ে রেখেছেন। প্রত্যেকটারই একটা করে অন্তত নমুনা তাঁর সেলাইদানিতে খুঁজলে পাওয়া যাবেই।
রেশমের চমকদার এক টুকরো কাপড়ের ওপরে আমার নজর পড়ল। মনটা আনন্দে নেচে উঠল কাপড়টা দেখে। বেশ খানিক অনুনয়ের ভঙ্গিতেই বললাম, নেংড়ি মামি, এটা আমি নিই?
না, না, রেখে দে! ওটা দিয়ে থলে বানাতে হবে যে! আল্লারাখাদের বাড়িতে বিয়ে- সেখানে দরকার। তুই নিয়ে কী করবি, শুনি? ছিঁড়ে ফেলবি তো দুদিন পরেই?
তখন আমার যা রাগ হয়েছিল নেংড়ি মামির ওপর। ভালো কাপড়টা নিজের জন্যে রেখে দিয়ে আমার পুতুলের জন্যে কিনা সত্তরটা তালি মারা আর বাহাত্তরটা সেলাই করা কাপড়। কিন্তু আজকে চিন্তা করলে একথা বুঝতে কষ্ট হয় না, তাঁর মতো একজন গরিব মানুষের পক্ষে এদিক-সেদিক থেকে কাপড় সংগ্রহ করে আল্লারাখাদের বিয়েতে সাতটি থলে আর দুটি জুজ্দান তেরি করে দেয়া কম কৃতিত্বের ব্যাপার নয়। প্রতিদানে যে ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা তিনি পেয়েছিলেন, তার জন্যে তাঁর নির্জন জীবনে শান্তিও কম আসেনি হয়তো।
.
মামির খোঁড়া হওয়ার ব্যাপারটাও একটা গল্পের মতোই। বয়স তখন তাঁর গোটা বিশেক। মহরমের সময়ের কথা। সন্ধের দিকে কোনো বৈঠকে যাচ্ছিলেন নেংড়ি মামি। নির্জন পথ। সেই অঞ্চলেরই একজন তাঁর রূপের নেশায় পাগলের মতো ঘুরত। প্রেম নিবেদনও করেছিল বার কয়েক। প্রথম প্রথম তার চেষ্টা ছিল বিয়ের জন্য তাঁকে কোনোরকমে রাজি করানো। কিন্তু কোনোমতেই সম্মতি দেননি তিনি। তাই সে এতদিন অপেক্ষা করছিল সুযোগের। সেদিন তিন-চারজন সঙ্গী নিয়ে সে এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করল। আমবাগানের কাছটায় তারা নেংড়ি মামির ডুলি ঘিরে দাঁড়াল। কাহার ছিল দুজন। লাঠি চলতে লাগল। একটা কাহারের ওপর লাঠি ওঠাতেই নেংড়ি মামি তাদের মাঝে এসে দাঁড়ালেন। লোকটা ছিল বেশ তাগড়া জোয়ান। লাঠির পুরো আঘাতটা গিয়ে পড়ল তাঁর ডান পায়ের ওপর। পা-টা ভেঙেই গেল। অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন তিনি। ইতোমধ্যে চিৎকার শুনে লোকজন জড়ো হল সেখানে। আক্রমণকারীর দল পালিয়ে গেল।
