: অ্যাঁ! আপনি চেনেন না? উনি তো আপনার গলা শুনেই এসেছিলেন! সিং বাবু।
: সিং বাবু!
কথাটা আমার কানে যেতেই হঠাৎ যেন বিশ্বজগৎ স্তব্ধ হয়ে গেল। আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। পৃথিবীটা যেন এতক্ষণ জ্বলছিল। এবার আকাশ-বাতাস শিকারি-মানসের মহত্ত্বে ভরে উঠল। তাঁর দিকে ফিরে তাকালাম। মনে হল তিনি যেন ঘোড়া নিয়ে অনেক-দূর এগিয়ে গেছেন। আমি তাঁর ধারে-কাছেও পৌঁছুতে পারব না।
অনুবাদ : আতোয়ার রহমান
সেকালের মেয়ে – রাজিয়া সাজ্জাদ জহির
দূর থেকে ব্যান্ডের শব্দ শোনা যাচ্ছে। বরযাত্রীর দল দরজার কাছে এসে পৌঁছাল বলে। মধ্যের ঘরটায় কাঁদতে কাঁদতে তেরো বছরের কনেটির অবস্থা কাহিল। বাইজি নাচিয়েরা চিৎকার করে, গলা ফাটিয়ে গান জুড়ে দিয়েছে। পানদানির খটখট আর নূপুরের ছমছম আওয়াজে কানে যেন ঝালাপালা লেগে যায়।
এমন সময় হঠাৎ একটা আর্তনাদের আওয়াজ শোনা গেল। ভয়ে আর আশঙ্কায় এদিক-সেদিক ছুটোছুটি শুরু করে দিল সবাই।
শোনা গেল, ঘোড়ার পা গর্তের মধ্যে ঢুকে গিয়ে উনিশ বছরের বর গুরুতর জখম হয়েছে। ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গিয়ে ভেঙে গেছে ঘাড়খানা। দশ মিনিটের মধ্যে বিয়ে বাড়িতে বিষাদের কালো ছায়া নেমে এল। যত মুখ, তত কথা। নানা জনের নানান মন্তব্য। সবাই কিছু-না-কিছু বলছেই। কিন্তু শুধু একজন ছাড়া। শুধু একজন মৌন-মূক হয়ে বসে। সে বুঝতে পারছিল না, এসব স্বপ্ন, না বাস্তব। বুঝতে পারছিল না সেই অল্প বয়স্কা কনেটি।
এই ঘটনার পঞ্চাশ বছর পরে আমি তাকে ‘নেংড়ি মামি’ বলে জানতে পেরেছি।
গল্পটা নতুন– যদিও এর পটভূমিকা অনেকদিন আগেকার। গল্পের প্রধান চরিত্রও অনেক পুরনো কালের। চরিত্রটি আমার মনের প্রচ্ছদে এমন একটা দাগ কেটে দিয়ে গেছে, যা কখনো মিটবার নয়।
শেষ পর্যন্ত সে বিয়ে আর হয়নি। তাই অনেকে প্রস্তাব দিলেন অন্যত্র বিয়ের ব্যবস্থা দেখতে। কারণ, এখনো সে কুমারী, আদও তো হয়নি– বিয়ে হওয়ায় বাধা কী। কিন্তু নেংড়ি মামি সেই যে বেঁকে বসলেন, তাঁকে আর কেউ রাজি করাতে পারল না।
যৌবনে তাঁর মুখখানা কেমন ছিল, দেখতে তিনি কেমন ছিলেন, সেসব এখন আমার পক্ষে বলা শক্ত। কিন্তু বার্ধক্যে তাঁকে দেখেছি। সে মুখ চন্দনের মতো উজ্জ্বল। রোদে বসলে গোলাপি আভা ফুটে ওঠে তাঁর গাল দুটিতে। এক খিলি পান চিবোলে গলার ভেতর থেকে লালিমা পষ্ট দেখা যায়। ছোটখাটো ছিপছিপে পাতলা লাজুক দেখতে তিনি। পরনে চুড়িদার পাজামা, ঢিলা কোর্তা, সাদা রঙের মোটা মলমলের ওড়না।
তখন আমার বয়েস পাঁচ, কি বড় জোর ছয়। আমরা নানার বাড়ি বেড়াতে এসেছি। জিনিসপত্তর গেট পার করে ভেতর-বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এমন সময় একজন বৃদ্ধা লাঠির ওপর ভর করে ভেতরে ঢুকলেন পেছনের দরজা দিয়ে। মার্কিনের একটা মোটা চাদরে তাঁর আপাদ-মস্তক ঢাকা। কোমরে চাবির গোছা ঝুলছে। হাতে কালো রঙের একটা ঝোলা– তাতে খুব সম্ভব ‘মর্সিয়া’ আর দোয়া-দরুদ লেখা পুঁথিপত্র।
মা তাঁকে দেখেই শ্রদ্ধাভরে ঝুঁকে পড়ে সালাম করেই জড়িয়ে ধরলেন; তারপর একে একে আমাকে এবং আর সব ছেলে-মেয়েদের ধরে ধরে তাঁর সামনে নিয়ে আসা হল। কত দোয়াই-না তিনি করলেন সবাইকে। কোলে নিলেন। তারপরেই মাকে বললেন, তোর মেয়ে তো বেশ সুন্দর হয়েছে রে, রুকুন! আল্লা করুন যেন তুই ডিপ্টি কালেক্টার জামাই পাস্!
আমি সেই চিরাচরিত লজ্জার অনুকরণ করতে চেষ্টা করলাম। আজো মনে পড়ে, আমার টোপা টোপা গালের ওপর তাঁর সাদা শুকনো চিকন সোহাগ-মাখা আঙুলের ছোঁয়া কী ভালোই-না লেগেছিল। মনে পড়ে, ডান হাতের কড়ে আঙুলে রুপোর আঙটিটা ঠাণ্ডা লেগেছিল গালে। আমায় তিনি বললেন, আমাদের বাড়ি আসিস– পুতুল বানিয়ে দেব, বুঝলি?
পরের দিন পুতুলের লোভে সকালেই তাঁর বাড়ি পৌঁছে গেছি।
পেয়ারাবাগানের পাশ কাটিয়ে কিছুদূর গেলেই ইমামবাড়া। তারই গা-লাগা তাঁর ছোট্ট বাড়িখানা। ভেতরে, পেছনের দিকে একটা ছোট কুঠরি, সামনের দিকে একটা বড়। এক ফালি আঙিনার খানিকটা জায়গা জুড়ে ধনে, পুদিনা আর পেঁয়াজ-চারায় ভর্তি সারি দেয়া গাছ। অন্য পাশে একটা কুলগাছ– তাতে দোলনা ঝুলছে। দোলনার দড়ি খানিকটা ছেঁড়া ছেঁড়া। দেয়ালের ওপরে পায়রার খোপ তৈরি করে দেয়া। নিচের মুরগির পানি খাওয়ার মালই বসানো রয়েছে। কুলগাছটায় বাঁধা রয়েছে একটা ছাগল। বড় ঘরের সিঁড়ির কাছে একটি তোতাপাখি– নাম তার মিঠু মিয়া। কাঁচামরিচ কেটে কেটে ছড়িয়ে চলেছে সে। মাঝে মাঝে খাঁচার শিকগুলো ঠোঁট দিয়ে ধরে টানাটানি করছে পাখিটা। তারপর বিরক্ত হয়ে ডাক ছাড়ছে, নেংড়ি মামি, নেংড়ি মামি! নবিজি ভেজো! মিঠুকে রুটি দাও!
বড় ঘরের ভেতরে দেয়ালের গা-লাগা জলচৌকির একপাশে জায়নামাজ গুটোনো রয়েছে। পুরনো মলিন ‘জুজ্দানে’র মধ্যে কোরান শরিফ দেয়ালের ওপর লোহার পেরেকে ঝুলছে। মামি জলচৌকিটায় বসে পাঁচটি মেয়েকে কায়দা-বুগদাদি পড়াচ্ছেন। আমায় দেখেই মুচকি হাসলেন তিনি। বললেন, কে রে, রুকুনের মেয়ে নাকি? আয়, ভেতরে আসছিসনে কেন? দরজায় দাঁড়িয়ে রইলি যে!
ভয়ে ভয়ে ভেতরে গিয়ে ঢুকলাম আমি। মামি বললেন, তুই ততক্ষণে যত পারিস, দোল খা। আমি এদের ‘সবক্’ দিয়েনি। তারপর তোকে পুতুল বানিয়ে দোব’খন, কেমন?
