এমনিতে চোখ সরাবার অবসর নেই। কিন্তু বুঝি-বা কী একটা শব্দ শুনেই আমার অনিচ্ছুক চোখ দু’টি এক মুহূর্তের জন্যে ওপরে উঠল। একটু দূরে ফণিমনসার ঝাড়। এখানে কোথায় জানি মানুষের মতো একটি মূর্তির ওপর গিয়ে পড়ল চোখ দুটি। কানে ভেসে এল একটা উৎসাহের আওয়াজ। চোখ দুটি এবার এক নিমিষে মৃত্যুর জগৎ থেকে বাঁচার পথের সন্ধানে ফিরে এল। কান দু’টি কিন্তু ওই শব্দেই মগ্ন হয়ে রইল। বোধহয় আরো দুই-তিনটে হামলা আর প্রতিরোধের পালা গেল। তারপর দেখি, কে যেন ঝড়ের বেগে আমার দিকে ছুটে আসছে। লম্বামতো একটা মানুষ বর্ণা বাগিয়ে আমাদের লড়াইয়ের মাঝখানে ঝাঁপিয়ে পড়ল। শুয়োরটাকে প্রচণ্ড একটা ধমক দিল লোকটি। সে-গর্জনে সেতারার সাহস ফিরল। আমার বুকখানাও যেন শান্ত হয়ে এল।
এবার শুয়োরটা প্রচণ্ড জোরে লোকটির ওপর হামলা করল। কিন্তু আগন্তুক অতি সংক্ষেপে একটুখানি নড়াচড়া করেই হামলাটা ব্যর্থ করে দিল। লড়াইয়ে এবার সে আধা-শরিক। আমার পালাবার পথ পরিষ্কার! কিন্তু এখন একথা মনে আসাও তো সম্ভব নয়। লোকটির মুখ দেখেই আমার ভাবনা দূর হয়ে গেছে। সে দুই-একবার চিৎকার করে আমায় সঠিক পন্থা বাতলে দিল। দেখা গেল, লোকটি আমায় চেনে। বড্ড চ্যাঁচামেচি করছে লোকটি। ধমকে শুয়োরটার মন তার দিকে ফিরিয়ে নিচ্ছে। বারবার ধমক দিয়ে দিয়ে সেতারাকে পথ বাতলাচ্ছে আর সাহস দিচ্ছে, আর আমায় আক্রমণ আর প্রতিরোধের উপায় শেখাচ্ছে। নিজে আত্মরক্ষা করছে সে নিপুণভাবে, অতি সুন্দর কৌশলে। তাকিয়ে দেখি লোকটির কাঁধে রাইফেল ঝুলছে। কিন্তু এ-অবস্থায় রাইফেলও আমার রিভলভারের মতোই বেকার।
তবু আশ্চর্য কাণ্ড ঘটে গেল একটা শেষ পর্যন্ত। শুয়োরটা আমার ওপর হামলা করছিল। এই সুযোগে লোকটি ঘায়েল করে ফেলল তাকে। কিন্তু বর্শার ফলাটা পড়েছিল শরীরের পেছন দিকে। বর্শার আঘাতে উত্তেজিত শুয়োরটা একটুও বিচলিত হল না। এবার আগুনের শিখার মতো লাফাতে শুরু করল সে। কিন্তু লোকটি তেমনি নিশ্চিন্ত, তেমনি শান্ত। জঙ্গলের দিক মুখে করে বারবার ডাক ছাড়ছে সে। কাকে যেন ডাকছে লোকটি।
দূরে মাঠের মধ্যে একটা বান্ডিলের মতো দেখা গেল। কিন্তু না, বান্ডিল নয়। এক মুহূর্ত পরেই দেখা গেল, একঝাঁক কুকুর। তীর বেগে ছুটে আসছে। লোকটি অত্যন্ত উত্তেজিতভাবে বাড় দিয়ে উঠল। বাহ্ বেটা! মার ওস্তাদ!
বিশাল দেহ একটি কুকুর বিদ্যুৎবেগে দল থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল। নিমেষে কালো কম্বলের মতো মেঘ উড়ে উঠল একবার। তারপরই লাল-সাদা জলের মতো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল কুকুরটা কিন্তু তক্ষুনি আছাড় খেয়ে তেমনি জোরেই লুটোপুটি খেতে লাগল। কুকুরটা সোজাসুজি শুয়োরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছিল। কিন্তু শুয়োরটা দাঁতের ওপর তুলে আছাড় মেরে তার নাড়ি-ভুঁড়ি বার করে দিল। রক্তের গরম আর উৎসাহের আতিশয্যে ওস্তাদ তবু নাড়ি-ভুঁড়ি ঘটাতে ঘটাতেই উঠে গিয়ে শুয়োরের টুটি চেপে ধরল। এদিকে, ওস্তাদ কামড় বসাতে না-বসাতেই বাকি সব ক’টি কুকুর লেলিয়ে-দেওয়া নেকড়ের মতো শুয়োরটার সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়ল। লোকটি এবার এক-একটি কুকুরের নাম ধরে ধরে জোর গলায় উৎসাহ দিয়ে যেতে লাগল। চোখের পলকে চাপা-কলের মধ্যে পড়ে গেল যেন শুয়োরটা। তারপরই এগারটা কুকুরের দাঁতের তলায় পাথরের মতো দেহ তার তুলো-তুলো হয়ে গেল।
.
চারদিকে এবার মৃত্যুর নীরবতা। আরো কয়েকজন লোক এগিয়ে এল। আর এল একটি মাদি ঘোড়া। পৃথিবী বুঝি সম্বিৎ ফিরে পেয়ে নতুন জীবনে চোখ মেলল একবার। আমি ঘামে নেয়ে উঠেছি। সেতারার গা বেয়েও ঘামের স্রোত বইছে। ওস্তাদের প্রাণ হয়তো প্রথম ধাক্কাতেই হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। কিন্তু উহ্, হিংস্র শিকারি শরীরটা এখনো টুটি কামড়ে যেখানকার সেখানেই পড়ে রয়েছে।
পকেট থেকে রুমাল বার করে মুখখানা মুছে ফেললাম। সামনে কয়েক হাত দূরেই ওস্তাদের মৃতদেহ পড়ে রয়েছে। দেখে বড় দুঃখ হতে লাগল। ক্লান্তিতে অবশ, ব্যথায়- বেদনায় জীর্ণ শরীরটা হেঁচড়ে ঘোড়া থেকে নেমে, বর্শাখানা ফেলে দিয়ে সোজা লোকটার দিকে এগিয়ে গেলাম। কিন্তু লোকটি একটু নড়লও না। একবার আমার দিকে চেয়ে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে বর্শাখানা খাড়া করে ধরল সে। চোখে-মুখে ফুটে উঠল অপরিচিতের ভাব। চাল-চলনে কেমন যেন একটা বন্যতার ছাপ।
আরো একটু এগিয়ে সাগ্রহে হাত দু’খানা বাড়িয়ে দিলাম। ভারি ইচ্ছে হচ্ছিল লোকটিকে জড়িয়ে ধরে আদর করি, তার হাতে চুমো খাই। আর খাঁটি শিকারিসুলভ মানসিকতা আর বীরত্বের উদ্দেশ্যে দুটি প্রশংসার কথা উচ্চারণ করি। সামনা-সামনি গিয়ে দাঁড়াতেই লোকটি সহজ হয়ে এল। বর্শাখানা হাত থেকে ঝুলে পড়ল। কিন্তু আমি হয়তো শিকারি পরিভাষায় কিছু প্রশংসার কথা বলেছিলাম– পরমুহূর্তেই তাচ্ছিল্যভরে সরে দাঁড়াল সে। মুখখানা ঘৃণাভরে ফিরিয়ে নিল যেন। তারপর পেছন ফিরে ঘোড়ায় উঠে রওয়ানা হয়ে পড়ল।
আমি ডাক দিলাম, একটু শুনুন।
কিন্তু লোকটি যেন শুনতে পেল না। আস্তে আস্তে ঘোড়া চালিয়ে ফিরে গেল সে।
বিস্মিত হয়ে ভাবতে লাগলাম, এ-কী করল লোকটা? অ্যাঁ!
আমি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। কিন্তু লোকটা আর ফিরল না।
এদিকে লোকগুলো শুয়োরটার খাল-মাংস নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, এ লোকটি কে?
