মজার ব্যাপার ঘটল এবার একটা। জীব-জানোয়ার কোনোদিন যা করে না, শুয়োরটা দেখি তাই করেছে। আমি যেদিক থেকে অনুসরণ করেছিলাম, সেই দিকেই ছুটছে। কিন্তু আমিও এক নিমেষে উঠে দাঁড়ালাম। ডিগবাজি খেয়ে যেমন প্রচণ্ড বেগে ছিটকে পড়েছিলাম, বুঝি-বা তেমনি জোরেই। বর্শাখানা পাশেই মাটিতে বিঁধে রয়েছে। সেতারা দৌড়ের ঝোঁকে আমার কাছ থেকে পঞ্চাশ-ষাট গজ দূরে গিয়ে পড়েছে। বর্শা তুলে নিয়ে সেতারার দিকে ছুটলাম। সেতারাও আমার দিকে ছুটতে শুরু করল।
.
সঙ্গিন মুহূর্ত। এইমাত্র একটা প্রচণ্ড দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। কিন্তু শিকারি এখন সবকিছুর ঊর্ধ্বে। যে-শিকারি আজ এই প্রথম সাফল্য লাভ করেছে। কয়েক সেকেন্ড আগের দুর্ঘটনা থেকে যে বেঁচে বেরিয়েছি, তার গুরুত্বের কোনো ধারণাই মনের ভেতর নেই। ধারণা নেই, ‘পিগ্ স্টিকিং’-এর চেষ্টাটা মূর্খতা। যে-মূর্খতা মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে প্রকাশ করে আসছে। সামনে আধ মাইল দূরে শুয়োরটা পালিয়ে যাচ্ছে। রেকাবেও আর পা ছোঁয়ালাম না আমি। সেতারার কেশরগুলো একটু হাতের মুঠোয় নিয়ে বানরের মতো এক লাফে তার পিঠে উঠে বসলাম।
শুয়োরটাকে ধরে ফেলতে সেতারার দু’মিনিটও লাগল না। বর্ণা বাগিয়ে ঘোড়া নিয়ে ছুটেছি। শুয়োরটা ফার্লং খানিক আরো ছুটল। তারপর বর্শাখানা শুয়োরের কাঁধ লক্ষ্য করে বিশেষ এক তাকে বাগিয়ে ধরে ঘোড়াটাকে হুঁশিয়ার করতে যাচ্ছি। এমন সময় শুয়োরটা আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে হামলা করল। কিন্তু এবার বোধহয় সেতারা আগের থেকেই সজাগও ছিল এবং এমন অবস্থায় চলাও বন্ধ করেনি। দৌড়াচ্ছিল সেতারা। শুয়োরটা পা পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই আশ্চর্য কৌশলে সে দৌড় হয়ে গেল লাফ। চট্পটে খেলোয়াড়ের মতো পাঁয়তারা ভেঁজে একেবারে শুয়োরের পেছন দিকে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল সেতারা। শিকারিকে কৌশলের ঘাঁটিতে পৌঁছে দিয়ে আবার শিকারের লক্ষ্য ঠিক করে নিতে চাইল বুঝি সে। কিন্তু পড়ে গিয়ে সামলে ওঠারও সময় পেল না। শুয়োরটা সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় আক্রমণের জন্য তৈরি হয়ে দাঁড়াল। সেতারাও এক মুহূর্তেই কাটিয়ে দিল আক্রমণটা।
দুই-তিনটি হামলা তক্ আমার শিকারি স্পিরিট বজায় রইল। প্রতি মুহূর্তেই অপেক্ষা, শুয়োরটা পালাতে গেলেই বর্শা গেঁথে দেব। কিন্তু একবার হামলা হয় আর একবার হামলা কাটাই, এই করতে করতে মনটা কখন যে প্রতিরোধের দিকে ঝুঁকে পড়েছে, টেরও পেলাম না। সেতারা কিন্তু সাপ-নেউলের খেলা খেলছে। প্রতিটি হামলা সে বাহাদুরের মতো পাঁয়তারা ভেঁজে কাটিয়ে দিচ্ছে। হামলায় তেজ ক্রমশই প্রচণ্ডতরো হয়ে উঠেছে। সেতারা দক্ষ ব্যায়াম-বীরের মতো ডাইনে-বাঁয়ে-পিছনে ঘুরে ঘুরে দশ-বারো মণের শরীরটা লাঠির মতো দুলিয়ে দুলিয়ে এদিক থেকে ওদিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে। পাথরের চাঁইয়ের মতো বিশাল-দেহ ‘ইকড়া’ শুয়োরটাও সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করে লাফিয়ে লাফিয়ে কেবলই আক্রমণ করে চলেছে।
এতক্ষণ সেতারা শুধু প্রতিরোধই করেছে। শিকারের কথা যেন আর মনে নেই। গোড়াতেই বুঝেছিলাম, ব্যাপার বড় সুবিধের নয়। শুয়োরটাও জানে, শেষ পর্যন্ত লড়াই না-করলে তার বাঁচোয়া নেই। মিনিট তিন-চার মাত্র সময় গেছে। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে যেন কত যুগ। পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে, জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে ধাক্কা খেয়ে বেড়াচ্ছি। হতভাগা শুয়োরটা একটানা হামলা করে চলেছে। ঘোড়াটাকে এক পলকে সামলে নিয়ে মাঠ থেকে পালিয়ে যাব, সে ফাঁকটুকুও পাচ্ছিনে। স্রোতের মতো আক্রমণে ফাঁক যেটুকু পড়ছে, তা-ও একটানা লাফ-ঝাঁপে ভরা। আক্রমণের ফাঁকে-ফাঁকে সেতারা অতি কষ্টে নড়েচড়ে প্রতিরোধের জন্যে তৈরি হচ্ছে। একবার ভাবলাম বর্শা ফেলে দিয়ে রিভলভার বার করি। কিন্তু লাভ নেই তাতে, মাঝখান থেকে বর্শাটাও হাতছাড়া হবে।
আক্রমণের প্রচণ্ডতা বেড়েই চলেছে। প্রতিটি হামলায়ই সেতারা কানের কাছ দিয়ে বেঁচে যাচ্ছে, আর আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে মাটিতে রাশ হয়ে পড়া সেতারার নাড়ি-ভুঁড়ি। সঙ্গে সঙ্গে নিজের পরিণামটাও দেখতে পাচ্ছি যেন ছায়াছবির পর্দায়।
আরো মিনিট তিন-চার কাটল। মৃত্যু এখন মিনিটে দু’বার করে সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে। সেতারা গুছিয়ে দাঁড়াতে না-দাঁড়াতেই দানবটা হামলার জন্য তৈরি হয়ে যাচ্ছে। মাটিও এখানে শুকনো। শুয়োরের প্রতিটি আক্রমণ আর ঘোড়ার প্রতিটি পাঁয়তারার সাথে সাথে ধুলোর ঝড় উঠছে। কত বালি যে আমার নাক-কান-গলায় ঢুকে গেছে, কে জানে। মাঝে মাঝে বালিতে প্রতিরোধেও প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এবার সেতারাও দমে গেল। সে যেন আর ইতিকর্তব্য খুঁজে পাচ্ছে না। লাফ-ঝাঁপ করছে, দেখছি, অবিবেচকের মতো। শুয়োরটা দুই-একবার ধরেও ফেলতে যাচ্ছিল। কিন্তু কী করে জানি বেঁচে গেল সেতারা। শুয়োরটা যেন গতি আর দৈহিক আক্রমণের স্রোত। আর, সেতারা কেবলই পাঁয়তারা। লাফ-ঝাঁপ আর লাফ-ঝাঁপ। প্রতিটি হামলায় যম হাঁ করে দাঁড়াচ্ছে চোখের সামনে, আর সেতারার প্রতিটি পাঁয়তারার সঙ্গে সঙ্গে নতুন জীবন ফিরে পাচ্ছি। ক্রমে নতুন জীবন লাভের কথাটা মনের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠার অবসরও আর পাচ্ছে না। তার আগেই আবার মৃত্যুর ছবি ভেসে উঠছে চোখের সামনে।
