সেতারার চোখ বারবার ওঠানামা করছে। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে আমিও দেখলাম শুয়োরটাকে। সঙ্গে সঙ্গে আপনা থেকেই সামলে বসে ‘পজিশন’ নিলাম। সেতারার ইতি-উতি ছোটাছুটিতে এখন আর সে-তেজ নেই। চোখ দুটি বারবার ওঠানামা করছে। চোখে তীব্র দৃষ্টি, কিন্তু কোণে কোণে হরিণীর ভয় চিক্ চিক্ করে। লাগামটা একটু ঢিলে করে দিয়ে আমি ‘পজিশন’ নিতেই দেহে তার বিদ্যুতের শিহরণ খেলে যেতে লাগল। ‘পিগ্ স্টিকিং’ আর পোলোর ঘোড়া ভারি বুদ্ধিমান হয়। শিকারে সে সওয়ারের থেকে কম মনোযোগী নয়।
আস্তে আস্তে পিঠ চাপড়াতে লাগলাম সেতারার। সেতারা অত্যন্ত মিষ্টি সুরে হি-হি করে জবাব দিল তার। বর্গাখানি একটু শক্ত হাতে সোজা করে ধরতেই উৎসাহের আতিশয্যে লাফিয়ে উঠল সেতারা। এই বুঝি দৌড় শুরু করে দেয় সে। আমি ক্লান্ত। কিন্তু আমার চেয়েও বেশি ক্লান্ত সেতারা। দুজনেরই সে ক্লান্তি এবার হয়ে উঠল স্ফূর্তি। সকালবেলা প্রথম শিকার দেখে যে জোর আর উৎসাহ এসেছিল সেতারার সেই জোর আর উৎসাহই নেচে উঠল আবার তার দেহের শিরায় শিরায়।
কিন্তু শুয়োরটা এখনো অনেক দূরে। বিপদের গন্ধটুকুও পায়নি শুয়োরটা। এখনো পরম নিশ্চিন্ত মনে হাঁটছে সে। সুতরাং সেতারার লাগামটা টেনে ধর। দস্তুরমতো জোরে অবাধ গতিতে ছুটতে থাকুক সেতারা। মাঠের দুই দিকে নদী। শুয়োরটা আমার উল্টো দিকের পথ দিয়ে মাটি শুঁকতে শুঁকতে আস্তে আস্তে নদীর দিকে এগিয়ে চলেছে। ইঙ্গিত করতেই সিতারা বিদ্যুৎবেগে লাফ দিয়ে কদম তুলে তীরবেগে শুয়োরের দিকে ছুটে চলল।
শুয়োরটাও দৌড় ধরল এবার। কিন্তু সেতারার পায়ে শুয়োরের পায়ের থেকেও তীব্রতরো ঝড়। ব্যবধানটা এক মিনিটে মিলিয়ে গেল। চার পায়ে ভর দিয়ে শুয়োরের মাথায় চড়ে বসল যেন সেতারা। ‘পিগ্ স্টিকিং’-এর ঘোড়া সে। শিকারের সময় শিকারির চেয়ে বেশি রক্তপিপাসু হয়ে ওঠে ওরা। শিকারি তখন ওদের কাছে হাতিয়ারের মতো। আসল শিকারি ওরাই। বর্শার ফলা আর শুয়োরের চাকির ওপর একবার নজর বুলিয়ে নিয়েই গতি নিয়ন্ত্রিত করে চলতে থাকে। তারপর শিকারির একটুখানি ইঙ্গিতের অপেক্ষা মাত্র। ইঙ্গিত পেলেই সে গতি এক ঝটকায় রূপ পালটে ফেলে। সে বড় অদ্ভুত ঝট্কা। চোখের পলকে ছুটতে থাকে তখন ওরা। আবার, চোখের পলকেই দৌড় বন্ধ করে ঢিমে- তেতালে হাঁটতে তাকে। ঝঙ্কার সঙ্গে সঙ্গে বর্শার ফলাখানাও শুয়োরের পাঁজরের মধ্যে বিঁধে কলজে ফুঁড়ে বেরিয়ে যায়। শিকারির মনে হতে থাকে ঘোড়ার সমস্ত শক্তি বুঝি রূপান্তরিত হয়ে তাঁর হাতের মধ্যে এসে জমা হয়েছে। রেকাব, আসন, তাঁর হাত এবং লম্বা বর্শাখানা পর্যন্ত কী যেন যান্ত্রিক কৌশলে ঘোড়ার দেহের অংশ হয়ে যায় তখন। শিকারির ডান পাঁজর থেকে শুরু করে বাহু আর কব্জি হয়ে হাতের মুঠো তক্ মদির শিহরণ বয়ে যায় একটা। তখন একান্তভাবেই মনে হতে থাকে ঘোড়ার ঝট্কা বুঝি তাঁরই হাত থেকে বেরিয়ে আসছে, একেবারে তাঁরই দেহের মধ্যে জেগে উঠছে। শিকারি বা ঘোড়া এর কিছুই বুঝতে পারে না। এ জিনিস বুঝতে পারে শুধুমাত্র জহুরি।
এ-ঝট্কা লক্ষ্যচ্যুত হলে শিকারি মাঝে মাঝে সম্মোহিতের মতো কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়। তাকিয়ে দেখি, সেই কাণ্ডই। সোয়া তিন-মণি ধূসর শিলা বর্শার ফলার ধাক্কায় ঘোড়ার সামনে থেকে চার-পাঁচ গজ দূরে ছিটকে পড়ল। ঘোড়াকে হয়তো-বা সাবধান করতে ভুলই হয়েছে। দৌড় আর ঝঙ্কার মধ্যে তাল রক্ষা করতে পারল না সেতারা। জানি এমন প্রচণ্ড, এমন মাথা-ঘোরানো দুর্ঘটনায় হালকা বর্শাখানা এত শক্ত করে ধরবার ক্ষমতা শিকারির দুর্বল হাতখানায় থাকে না, যার জোরে তিন মণ ওজনের বস্তুটি ছিটকে গিয়ে পড়বে। এ হল শক্তি আর কৌশলের যাদুমন্ত্র। অমন ভেল্কিবাজি সম্ভব শুধুমাত্র ঘোড়ার শক্তি থেকেই। ঘোড়া যখন আর দৌড়ায় না, অথচ বিশেষ ঝট্কাও দেয় না, তখনই হয়তো-বা এমন কাণ্ড ঘটে।
ট্রেনিং পাওয়া ঘোড়া আক্রমণের জায়গা থেকে লাফ দিয়ে সরে যায় একটুখানি। তারপর চোখের পলকে থমকে দাঁড়িয়ে আক্রণের ফলাফলটা দেখে নেয় একবার। দরকার হলে আবার আক্রমণ করবে সেতারা, কিন্তু ভালো করে দাঁড়াবার অবসরও পেল না সে। তার আগেই দেখে হামলা হয়েছে তার উপর। স্বভাববিরুদ্ধ কাজ করে বসল শুয়োরটা। একটুখানি বাঁকা হয়ে দাঁড়াল একবার, তারপরই কামানের জ্বলন্ত গোলার মতো লাফিয়ে পড়ল। শুয়োর তো নয়, মৃত্যু। মূর্তিমান যম। পাথরের মতো মুখ আর ধারালো দাঁত খাড়া করে সেতারার সামনের পা দু’খানার ফাঁকে বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল শুয়োরটা।
আর একটু হলে চাকি আর দাঁত দুটো ঝড়ের বেগে বুকে বিঁধে যেত সেতারার। কিন্তু বাহাদুর ঘোড়া বটে সেতারা! চোখের পলকে একেবারে লাঠির মতো খাড়া হয়ে দাঁড়াল। দ্বিতীয় হামলা হল ফিট দুয়েক পিছিয়ে। সেতারা এবার সামনের পায়ে ভর দিয়ে লাথি ঝাড়ল বার দুয়েক। আর একটু হলেই নাড়ি-ভুঁড়ি বেরিয়ে যেত সেতারার। কিন্তু কিছুই হল না। শুধু সেতারার কানের ডগা থেকে লেজ পর্যন্ত বিদ্যুৎ-সৃষ্টের শিহরণ প্রত্যক্ষ হয়ে উঠল একটা। উল্টোমুখো এই ধাক্কার তাল সামলায় কার সাধ্য। ওপরে একটা ডিগবাজি, একটা তলায়। তারপরই আমি একেবারে মাটিতে। দ্বিতীয়বারের ডিগবাজিতে শরীরের খানিকটা ঘোড়ার গায়ে ধাক্কা খেয়ে শুয়োরের উপর এসে পড়ল। চাচা আপন প্রাণ বাঁচা। শুয়োর হয়তো বুঝতেই পারল না, শিকারি এসে পড়েছে ঘাড়ে, না ভূত এসে পড়েছে। আর একটা লাফ দিয়ে ছিটকে উপরে উঠে গেল শুয়োরটা। ভালোয় ভালোয় কেটেছে বটে। জখম সামান্যই। একটা আছাড় খেয়ে উঠেই দে ছুট।
