পাসিরা আমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাটারও খবর রাখে। তিন বছরে স্বভাবটা একটুখানি চাষি-মার্কাও হয়েছে বটে। তারা খুব ভালো করে জানে, আমি শিকারের ভক্ত। হাজার হলেও পুরনো সঙ্গী তো তারা। অত্যন্ত গর্বভরে জানাল, দু’বছরের মধ্যে সিং বাবু আমাদের এলাকায় শিকারেও আসতে পারেননি। তেল ঢেলে ঢেলে তোষামোদের সুরে বলল, আপনি আসবেন, তাই এ-দু’বছর জঙ্গলের মাত্তর বিশেষ বিশেষ এলাকায় পশুপাখি শিকার করে খেয়েছি আমরা। আপনি শিকারে গেলে ভারি চমৎকার হবে।
মহালে আসার দিন তিনেক পরই শিকারের উত্তেজনায় ডুবিয়ে আমায় জঙ্গলে ঢুকিয়ে দিল তারা। এমনিতে তো আমি জানিও, আমার ‘পিগ্ স্টিকিং’-এর শখ এইখানেই মিটতে পারে। পাঁচ হাজার বছরের পুরনা জিনিস এই ‘পিগ্ স্টিকিং’। মানুষ যখন ঘোড়া আর কুকুরকে পোষ মানিয়েছে, তার সংস্কৃতির কাফেলা যখন পর্বতগুহার আশ্রয় ছেড়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে কুঞ্জকুটিরের দিকে ছুটেছে, পশুপালনের মধ্যে যখন দেখা দিচ্ছে অর্থনীতির আদিমতম সূত্র, সেই তখনকার। আজ, বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি, কৃষ্টি ও সভ্যতার সৃজনের ভিড় থেকে পালিয়ে আমরা মাঝে মাঝে ফ্রি স্টাইল কুস্তি আর ‘পিগ্ স্টিকিং’-এর মতো খেলা শুরু করে দিই। হাল্কা একখানি বর্শা, শিক্ষিত এবং দ্রুতগতির একটা ঘোড়া আর নিজের হাত-পা নিয়ে পাথরের মতো বুনো শুয়োরের সঙ্গে লড়াই জুড়ি। ‘পিগ্ স্টিকিং’ শিকারের জবরদস্তির স্তরের চূড়ান্ত। নির্ভেজাল শিকার।
পাসিরা ফণিমনসা আর ঝাউবনের কয়েক জায়গা থেকে হই-হই করে মাঠের মধ্যে শুয়োর বার করে নিয়ে এল। কিন্তু আমার বরাতে প্রত্যেক বারই ফস্কা গেরো। সকাল ছ’টা থেকে দুপুর বারোটা তক্ ঠায় ঘোড়ার পিঠে বসে থেকে থেকে সর্বাঙ্গ ব্যথা হয়ে গেল। সেতারাও ক্লান্ত হয়ে পড়ল। আর, সেই ক্লান্তির বোঝার উপর শাকের আঁটি হয়ে দাঁড়াল একটা ব্যর্থতা। মাইলের পর মাইল এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করবার পর এখন ফিরে চলেছি। প্রচণ্ড তেষ্টায় মনে হচ্ছে, গলা থেকে পেটের তলা তক্ কাঠের একটা ছুঁচল ডাণ্ডা ঢুকিয়ে রেখেছে যেন কেউ। মাথায় রুমাল বাঁধা কিন্তু তার মধ্যে দিয়েই সুচের ডগার মতো রোদ বিঁধছে যেন মাথায়। পয়লা দিনেই চার-পাঁচটা গুলি ফসকে গেল। এদিকে কতকালের নিঝুম বন এখন সরগরম। কাল যে কিছু হবে সে-আশা বড় কম। সঙ্গীরা কোথায় উধাও হয়ে গেছে। ছুটোছুটি করতে করতে সীমা-সরহদ্দের খেয়ালও রাখিনি।
সেতারার সহজাত প্রবৃত্তির ওপর নিশ্চিন্ত নির্ভর করে তার পিঠে চাপিয়ে দেওয়া বোঝার মতো হয়ে ঢিমে তেতালে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। চোখ তুলে দেখি, চারদিক একেবারে নির্জন। জায়গাটা একান্তই অজানা-অচেনা লাগে যেন। সেতারা আমায় কোথায় নিয়ে চলেছে, কে জানে। আমারই মতো ও-ও তো এই প্রথম এসেছে এখানে। হতভাগা ব্যাধগুলোই-বা কোথায় গায়েব হয়ে গেল?
সকাল থেকে এতক্ষণ অবধি যে-পথে পাক খেয়ে খেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি, মনে মনে আবার তার একটা নকশা আঁকার চেষ্টা করলাম। সেই সাথে পাস-গাঁওয়ের সঠিক সীমানা-সরহদ্দের একটা আন্দাজও। আশেপাশে দূর-দূরান্তে নজর বুলিয়ে বুলিয়ে ভালো করে দেখে নিলাম জায়গাটা, কিন্তু কোনো তাল-মানই পাওয়া গেল না তবু। এই তেপান্তরে আমি একলা। পরিবেশ অপরিচিত। এবার ভয়-ভয় করতে লাগল আমার। মনের ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠল, কোথায় চলেছি?… তিনি তো এ-অঞ্চলের বাঘ। আমায় নিশ্চয়ই চেনেন। অথচ আমি তাঁকে চিনিও না। তিনি পেছনে-না লাগেন! সারাটা গা শিউরে উঠল আমার।
চোখ দুটি দূর-দূরান্তে ছুটে বেড়াতে লাগল এবার। ডান হাতে ঝোলানো বর্শাখানা আপনা থেকেই শক্ত মুঠোর মধ্যে খাড়া হয়ে উঠল। বাঁ হাতে লাগাম ধরা। কিন্তু কনুইটা হান্টিং কোটের পকেট হাতড়াতে লাগল। পকেটে ন’টা গুলিভরা রিভলবার পড়ে রয়েছে। আবার মনে পড়ল, সিং বাবুও তো শুনেছি পাঁড় শিকারি। এ-এলাকায় সর্বত্র তাঁর বাহাদুরির অপ্রতিহত প্রশংসা। তাঁর সাথে শিকারে নামব, এমন সুযোগ আর পাই কী করে? কিন্তু খোদা বাঁচিয়ে রাখলে একদিন তাঁর সাথে মোকাবেলাই হয়ে যাবে। মনে মনে ভাবতে থাকি, তিনি তো গোঁয়ার আনাড়ি কিসিমের শিকারি। আর আমি রীতিমতো বৈজ্ঞানিক কায়দায় লক্ষ্যভেদ করতে শিখেছি। কিন্তু বন্দুকের মুখোমুখি হওয়াটা বড় খারাপ জিনিস। এ-লড়াইয়ে তাকেই বলা হয় বাহাদুর, যার হাত প্রতিদ্বন্দ্বীর হাতের আগেই ইঞ্চিটাক উপরে উঠে যায়। তারপর সে-হাত ফেরবার পথে পয়লা চোটেই সামনে যা-ই পাক, তার বুক ফুঁড়ে গুলি পার করে দেয়।
আর একবার চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিলাম। আমার একাকিত্ব আর আশপাশের নির্জনতা আরো ভয়ঙ্কর মনে হল এবার। আচ্ছা, এই ব্যাধ শালারা রয়েছে কী করতে? আজই গিয়ে ঘোষণা করে দেব, দু’বছরের খাজনাই মাফ। শর্ত শুধু এই যে, এবারের ফসল উঠতে উঠতে সিং বাবুকে সাবাড় করে ফেলতে হবে। মহালটা এবার ঘুরে-ফিরে দেখতেও যাচ্ছি। পাসিদের সাহসটা এতে বাড়বে। সিং বাবুকে দেখে এখনো যে এক-আধটু ভয় আছে তাদের, তা-ও কেটে যাবে। খবর পেয়েছি, গোটা মহলে আমার সফরের কথাটা খুব ছড়িয়েছে এবং তাতে করে আমার পথের কাঁটার সম্মানেরও যথেষ্ট হানি হয়েছে।
.
একটুখানি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে না-ফেলতেই হঠাৎ সেতারা মোড় ফিরতে শুরু করল। সেতারার দেহের প্রতিটি অণু-পরমাণু থেকে আগুনের ফুলকি ছিটকে বেরুচ্ছে যেন এবার। চোখ দুটি তেপান্তরের দূর-দূরান্তে কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে। ওর চোখ বরাবর চোখ তুলতেই দেখি, অনেক দূরে মাঠের মধ্যে দিয়ে একটা শুয়োর হেঁটে যাচ্ছে। অত্যন্ত নিশ্চিন্ত মনে, ঢিমেতেতালে পা ফেলে ফেলে। দেখেই বোঝা যায়, ‘ইকড়া’ শুয়োর শুয়োর যূথচারী বুনো জানোয়ার। একলা যে থাকে, তাকে অত্যন্ত বিব্রত দেখায়। একা দেখলেই বুঝতে হবে, সে ‘ইকড়া’ শুয়োর। ‘ইকড়া’ সাধারণ শুয়োরের দল থেকে আলাদা হয়ে নিজের জুটি নিয়ে থাকে। তার কাজ দলের শুয়োরের সঙ্গে লড়াই করা, আর সবার খাবারে পোদ্দারি করা। গায়ে তার অসুরের বল, মনে মনে সে স্ফূর্তিবাজ। শিকারিকে সে দেখলেই চিনতে পারে। আর কিছু না-হোক, ষোলো আনা প্রকৃতি তার শুয়োর প্রকৃতির বিপরীত। গ্রামবাসী, জংলি চাষি আর শিকারির ভাষায় তার নাম ‘ইকড়া’। সব জঙ্গলেই দুই-একটা ইকড়া থাকে। সীমানা-বাঁধা এলাকায় তারা একচ্ছত্রাধিপতি। সেখানে আর কারো মাথা গলানোর উপায় নেই।
