কিন্তু পাসিরা আধা-যাযাবর জাত। ওদের অনেকগুলো দলের ওপর শিকারের সূত্রে আমার প্রভাবও আছে। ওদের ঝোঁক শিকার আর বন্য জীবনের দিকেই বেশি। হঠাৎ কখনো চাষ-আবাদের কাজও করে বসে। অত্যন্ত কষ্টসহিষ্ণু সাহসী এবং শক্তিধর জাত। একটুখানি উপলক্ষ পেলেই অপরাধের দিকে ঝুঁকে পড়ে। শিকারে বেরোয় জানপ্রাণ কবুল করে। প্রাণ দেয়া-নেয়াকে মনে করে মামুলি ব্যাপার। এ-পথে আসতে হল আমায় উপায়ান্তর না দেখে। আমার কানে এমন ধরনের গুজবও এসেছিল যে, সিং বাবু আমায় খুন করাবার তাকে আছেন। কাছারিতে দুই-একবার চেষ্টা করেছিলাম, সিং বাবুর মুখখানাও যদি একবার দেখতে পাই। তাছাড়া, একটুখানি কৌতূহল ছিল। আমার মোকাবেলায় তাঁর প্রভাব- প্রতিপত্তির কথা তো ভালো করেই জানি। আরো শুনেছি, তিনি বড় বিলাসী শিকারিও। কিন্তু কাছারিতে, বিশেষ করে, আমার সঙ্গে মামলা চলবার সময় শুনেছি, এক-আধবার এমনিই কিছুক্ষণের জন্য এসেছেন। অথচ আমি তাঁকে দেখতেও পাইনি।
মহলের সবচাইতে উর্বর অংশে জায়গায় জায়গায় প্রতিবছরই নতুন নতুন সম্ভাবনার আভাস পাওয়া যায়। পরিকল্পনা মোতাবেক পাসিদের একটা শক্তিশালী, উদ্যমশীল দল অঞ্চলটা সুকৌশলে দখলে আনার উদ্দেশ্যে ওখানে গিয়ে আস্তানা গাড়ল। সিং বাবুর এতে চমকে ওঠার কোনো কারণ নেই। পরিকল্পনায় ছিল, প্রথম বছরে দখল নেয়া হবে। আর দ্বিতীয় বছরে হবে সিং বাবুকে খুন করা। কাজটা সারতে হবে একেবারে চুপ-চাপ করে। যাতে কাক-পক্ষীটিও টের না পায়। পাসিদের আর কী চাই!
উর্বর জমি আর শিকারের জীব-জানোয়ার, পাখ-পাখালিতে ভরা জঙ্গল। প্রথম বছরেই শীতের সময় আস্তানার চারপাশে গোপনে গোপনে মাটির দেয়াল মাথা তুলে দাঁড়াল। সিং বাবু ঘুণাক্ষরেও কিছু জানতে পারলেন না। গরম পড়বার সঙ্গে সঙ্গে এবং খড়কুটো শুকোতেই চালা উঠে গেল। তারপর সিং বাবুর বিস্ময় কাটতে না-কাটতেই, বর্ষা নামবার সঙ্গে সঙ্গে চালার আশেপাশে মোষের লাঙল চলা শুরু হল। পরের বর্ষাতেই শ্যামল গ্রামখানা পাকাপোক্ত হয়ে উঠতে দেখা গেল।
কিন্তু গ্রাম পাকাপোক্ত হওয়ার পরও সিং বাবু চুপ করে বসে রইলেন। ফসল ওঠার সময় তক্ সবকিছু মুলতবি রাখলেন। কিন্তু যখন ধান আর জোয়ারের ভাগ-বাঁটোয়ারার জন্যে তাঁর লোকজন এসে হাজির হল, তখন পাসিরা তাদের হাঁকিয়ে দিল। এতদিনে তিনি বুঝতে পারলেন, কোন পরিকল্পনা মোতাবেক গ্রাম হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে একথাও বুঝলেন, লড়াইটা সহজ নয়। পাঁচ হাজার বছরের পুরনো কেচ্ছার পুনরাবৃত্তি না-হয় শেষকালে।
পাসিদের সঙ্গে আমার চুক্তি ছিল, প্রথম বছরে যতখানি জায়গা ওরা ভোগদখলে আনতে পারবে তার জন্যে চিরকালের মতো খাজনা মাফ এবং এই দানের কথার মধ্যেই সিং বাবুকে খুন করার ব্যাপারটা গোপনে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছিল। দু’বছর পার হয়ে তৃতীয় বছর এল। এই তিন বছর ধরে আমি আমার গোয়েন্দা বিভাগটা ক্রমেই সক্রিয় করে তুলেছি। খবরাখবরও বরাবরই পেয়েছি। সিং বাবু আমায় খুন করবার ষড়যন্ত্র করছেন, এমন আভাসও পেয়েছি দুই-একবার। কিন্তু এতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই। এ তো স্বাভাবিক ব্যাপার।
আমি থাকি এখান থেকে একশো-সোয়াশো মাইল দূরে এবং গ্রামে। এ-জায়গাটা থেকে পাকা রাস্তা এবং রেললাইন পনেরো-বিশ মাইল। তবু মাঝে মাঝে একটু গোলমেলে খবর কানে আসে বলে বাড়িতে রাত্রিবেলা আত্মরক্ষার বিশেষ ব্যবস্থা রাখতে হয়। কিন্তু ‘পাস-গাঁও’ বসবার দু’বছর পর চৈতালি ফসল ওঠার আগে আমার একবার কূট উদ্দেশ্যে মহালে আসতে হল। আমার লোকজন খবর দিয়েছিল, পাসিরা অনেক বেশি জমি আবাদ করে নিয়েছে। এদিকে দু’বছর ফসল হয়েছে প্রচুর। এ কয় বছরের আবাদি জমির খাজনা আদায় করা দরকার এবার। কিন্তু পাসিরা ভাবছে, বাছাধন ভয়ের চোটে এ-এলাকায় ঢুকতে পারছে না। সিং বাবুকেও তাই তারা মেরে ফেলেনি এখনো। তাঁকে মেরে ফেললে তো আমার আর ভয়ের কিছুই থাকবে না। আমি তখন আইন-মাফিক খাজনা উসুল করতে শুরু করে দেব। এমন করলে যা হয়ে থাকে পাসিরা পাস-গাঁওকে স্বাধীন লাখেরাজ রাজ্য করে নিয়েছে। আর, প্রতি বর্ষায় এই রাজ্যের সীমানা বাড়িয়ে চলেছে।
সিং বাবুর ভয়ে আমি মহালে ঢুকতে পারিনে, পারসিদের এই ভুল ধারণাটা ভেঙে দিয়ে যাব, শুধুমাত্র এই উদ্দেশ্যে এখানে আসতে আমার ভালো লাগেনি। যদিচ ধারণাটা না-পাল্টালে আমার একটু বিপদও ছিল। আশঙ্কা করছিলাম, এই পাসিরাই-না শেষটায় চেপে বসে। মাপ-জরিপ, খোঁজ-খবর আর উসুল-পত্তরের নাম করে তাই চলেই এসেছি। এবং থেকেও গেছি কয়েকদিন। জানি, সিং বাবুর পথের সবচেয়ে বড় কাঁটা আমিই এবং এই কাঁটা সরিয়ে তিনি পাসিদের সাজানো-গোছানো গাঁওখানা অতি সহজেই অধিকারে আনতে পারেন। তিনি তো এমনিতেই আমায় সাবড়ে দেওয়ার মতলবে ছিলেন। এখন আবার তার ওপর নতুন প্রলোভন জুটেছে। কিন্তু পাসিদেরও তো খুব বেশি প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়। চুক্তি যা ছিল, তাতে দ্বিতীয় বছরের শেষেই খাজনা-পত্তর আদায় করা উচিত ছিল। এখন তো তৃতীয় বছর চলছে। সুতরাং উপায় নেই। প্রাণ বিপন্ন করেও আসতেই হল। ভেবে রেখেছিলাম দু’সপ্তাহ থাকব। মহালের পাসিরা বড় আদর-আপ্যায়ন করল। পরদিনই আমার মন থেকে ভয়ও কেটে গেল।
