‘হেই বাবু, হেই বাবুজি– ‘ সুলতান দৌড়াতে লাগল মরিয়া হয়ে তাঁর পিছু পিছু।
বাবু থামলেন। ‘কি, চাকরি করবি নাকি, বল!’ আরো কিছু লোক জুটে গেল সেখানে।
‘বাবুজি… ‘হাঁপাতে হাঁপাতে সুলতান তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার নিচের ঠোঁটটা ঝুলে পড়ল। ‘বাবুজি, ভিখ চাই না, চাকরি চাই না।’ টিনের বাটিটা সে পটকে দিল রাস্তায়।
‘তাহলে আমাকে ডাকলি কেন?’
অপ্রতিরোধ্য, অজস্র বারিধারা সুলতানের দু’চোখের গহ্বরে ভিড় জমাল। তার ঠোঁট দুটো কাঁপতে লাগল থরথর করে। অনকে কষ্টে কেটে কেটে বলল, ‘বাবুজি, খোদায় আপনার ভালো করবে। আমার মাথায় হাত রেখে খানিকদূর আপনি আমার সঙ্গে চলতে পারবেন?’
‘শোনো কথা।’ চারপাশের ভিড় জমানো লোকদের পানে বোকার মতো চেয়ে
থাকলেন ভদ্রলোক।
অনুবাদ : নেয়ামাল বাসির
দুশমন – আবুল ফজল সিদ্দিকি
সকাল থেকে ছুটে বেড়াতে বেড়াতে দুপুর হয়ে গেল। বসন্তের রোদ্দুরে রীতিমতো কড়া আমেজ লাগছে এবার। পরনে কাপড়-চোপড় নেহাত কম নয়। তা-ও বোঝা হয়ে উঠছে। সেতারার পা দু’খানাও ভারি হয়ে এসেছে। ক্লান্ত পায়ে হাঁটছে এখন সেতারা। যা অবস্থা, তাতে জানটা এমনিতেই ছুটে বেরিয়ে যেতে চায়। মনে চেপে বসে ক্লান্তির বোঝা। তার ওপরে আবার এদিকে আর-এক কাণ্ড। ভারি চমৎকার সুযোগ পাওয়া গিয়েছিল একটা কিন্তু সবই ফসকে গেছে। আর তারপর শুরু হয়েছে গরম। গলাটা শুকিয়ে আসছে।
বসন্তের রং-লাগা দূরবিসারী বনরেখাটা স্বচ্ছ নীল আকাশের নিচে নির্বাক আলোর ঝরনায় নেয়ে ঝলমল করছে। বারবার চোখ দুটি দূর দূর প্রান্তে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। আশা এই, সঙ্গীদের দেখা পেলে হয়তো কাছাকাছি একটা রাস্তার সন্ধান মিলবে। কিন্তু সামনে আমার বিজন তেপান্তর। যতদূর চোখ যায়, ভেজা, কালো কাদাটে পলির বিস্তার। পথের রেখা পড়াই সম্ভব নয় এ-মাটিতে। সেতারার খুরের ছাপটা পর্যন্ত এই কাদাটে ভেজা মাটিতে পড়তে না-পড়তে ভেঙে-চুরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমার ডান পাশ আর পেছন দিক ঘিরে গঙ্গার চকচকে জলধারা। সদ্য-গলা বরফের জলে থই থই করছে নদী। গতিভঙ্গে বসন্তের এক অদ্ভূত মদিরতা মাখানো। বাঁ-দিকে মাইল দুই-তিন দূরে মানুষ-সমান ঝাউ আর ফণিমনসার ঘন জঙ্গল। দেখে বোঝা মুশকিল, কতখানি জায়গা জুড়ে আছে। এদিকে সামনের মাঠখানা দিগন্তের কোলে গিয়ে মিশেছে। কোন দিক দিয়ে এগালে যে উদ্ধার পাব, কিছুই মাথায় ঢুকছে না।
এহেন অবস্থায় সওয়ারির পক্ষে সবচেয়ে ভালো পন্থা হল সওয়ারের প্রাণীটির প্রকৃতির হাতেই আত্মসমর্পণ করা। আমিও লাগাম ঢিলে করে দিয়েছি। নিশ্চিন্ত আছি, সেতারা সামান্য একটু এগোলেই আস্তানায় পৌঁছে যাবে। সঙ্গে সঙ্গে এ-আশাও আছে যে, প্রকৃতি এবং ঘ্রাণশক্তির গুণে জঙ্গলে হারিয়ে ফেলা আমার সঙ্গীদের সন্ধান করতে করতেও এগোতে পারবে সে।
জায়গাটা আমার অপরিচিত। জীবনে এই প্রথম বড় সাহস করে শিকারের ছলে একটা কূট উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে এসেছি। এমনিতে জায়গাটা আমার এক দূর সম্পর্কের নিঃসন্তান চাচার কাছ থেকে উত্তরাধিকারের সিঁড়ি ভেঙে পাওয়া। এই সঙ্গে উত্তরাধিকার সূত্রে ঝগড়া-বিবাদ এবং মামলাবাজিও পেয়েছি। পথের কাঁটা সিং বাবু। এ-তল্লাটের এক জাঁদরেল গেঁয়ো রাজপুত। নদীর পার বরাবর একটুখানি জমির স্বত্বকে শিখণ্ডী করে তিনি এই এলাকার জবর-দখল নিয়ে জমিয়ে বসেছেন। প্রভাব-প্রতিপত্তির জোরে দেওয়ানি আদালতে একাধিক রায় এবং মাপ-জরিপের দুই-তিনটি প্রস্তাবও তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন। পুলিশ পর্যন্ত আমাদের সাহায্য করতে বা তাঁকে ভাগাতে পারেনি।
সিং বাবু দল পাকাতে ওস্তাদ এবং খুনি কিসিমের মানুষ। শিকারের বড় ভক্ত। জানে ভয়-ডর এতই কম যে, বে-আইনিভাবে লাইসেন্সহীন হাতিয়ার নিয়ে দিন-দুপুরে শিকার করে বেড়ান। এ-এলাকার আশপাশে বহুদূর তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষী প্রমাণ পর্যন্ত পাওয়া যায় না। সারা তল্লাটে তাঁর ইচ্ছের বিরুদ্ধে যেমন-তেমন সরকারি হুকুমটা প্রচারেরও উপায় নেই। মুশকিলের ব্যাপার হল, জবাবদিহি করতে বা ওজর-আপত্তি জানাতে আদালতেও তিনি কদাচিৎ আসেন। উকিলের মারফত উল্টো-সিধে একটা মামলা রুজু করে দিলেন তো দিলেন। নতুবা রইলেন মওকার অপেক্ষায়। মরহুম চাচাজান কয়েকবার আদালত থেকে আইন মোতাবেক দখল পেয়েছিলেন। কিন্তু সত্যিকারের দখল আর তিনি নিতে পারলেন না। আর এক দফা নালিশ করলেন তিনি এবং আর এক দফা ডিক্রিও পেলেন। কিন্তু ফল যে-কে সেই। এমনি করে করে বারো বছর পার হয়ে গেল এবং এইভাবে জবরদখলই সিং বাবুর স্বত্বের নির্ভর হয়ে উঠল।
চাচাজান মামলা করে যা ফল পেয়েছিলেন, দু’বছর মামলা করে আমিও তাই-ই পেলাম। তিনবার দখল পেলাম, কিন্তু একবারও স্বত্ব ভোগ করতে পারলাম না। শেষকালে আর ফৌজদারি-মারামারি আয়োজন না-করে এক বন্ধুর পরামর্শ মাফিক ধরলাম ভিন্ন পন্থা। এর প্রথম লক্ষ্য হল এলাকার সবচেয়ে উর্বর অংশে পাসিদের (পাখি-শিকারি উপজাতি) একটা গ্রাম বসিয়ে দেওয়া। কাজটা করতে হবে ধীরে ধীরে বিষ দেওয়ার মতো অব্যর্থ উপায়ে, অতি সুন্দর করে এবং ধীরে-সুস্থে। নইলে গ্রাম বসানো দূরে থাক, মহলে আমার লোকজন নিরাপদে আসতেই পারবে না। তাছাড়া, এত সহজে গ্রাম বসাতে তিনি দেবেনই-বা কেন?
