সুলতান যে কেবল দাদাকে দেখতে পারে না, তাই নয়– জেবু খালাও দু’চাখের বিষ দাদাকে ঘরে তুলে খেলার মাঠে রওনা দেওয়ার সময় ধরা পড়লে পড়তে হয় এক জেবু খালারই হাতে। আর, ধরা পড়লে অমনি জেবু খালা বলবে, ‘দেখেছ, বাবু এখন খেলতে চললেন। বুড়ো, অন্ধ, দাদাটাকে একলা ফেলে রেখে খেলতে যাওয়া– এ কেমনধারা আক্কেল বল দেখিনি?’
তাই শুনে দাদাও হয়তো অমনি বলে বসবে, ‘ওরে সুলতান, যাসনে ভাই। তার চাইতে চল, চৌরঙ্গিতে একটা চক্কর দিয়ে আসি। দুটো পয়সা বেশি পেলে কালকে তোর ছুটি।’
কিন্তু সুলতান জানে, ছুটি সে কোনোদিনই পাবে না। দুটো পয়সা বেশি পাওয়াও হয় না, ছুটিও মেলে না।
তবে ক’দিন থেকে দাদার হাঁপানিটা বেড়েছে। এই হাঁপানি যেদিন মাঝরাত্রে শুরু হয়, সেদিন বেলা উঠলেও শেষ হয় না। কাশতে কাশতে দম আটকে আসে। সেদিন আর ভিক্ষা করতে বের হয় না তারা।
কিন্তু সুলতানের তবু ছুটি নেই। সারাদিন বসে বসে সে দাদার পিঠ আর বুকে মালিশ করে, পাছা আর মাজা টিপে দেয়। তাতে অল্প খানিক আরাম হয় দাদার। সুলতানের হাত থেমে গেলে দাদা কাশির দাপট আটকে রেখে বহু কষ্টে টেনে টেনে বলে, ‘কি সুলতান, মরলি নাকি?’
সুলতান সঙ্গে সঙ্গে আবার টিপতে শুরু করে দিয়ে মনে মনে বলে, তুই মর, দাদা। কী মজাই-না হয় তুই মরলে— খোদার কসম। আল্লা আল্লা করে তুই মর, এখনই মর। তাহলে আমি সাহেবপাড়ায় গিয়ে সারাদিন মাথায় বাতাস লাগিয়ে কাটাতে পারি।
তারপর, দাদা একদিন সত্যি সত্যি মরে গেল। সেদিন হাঁপানির টান খুব বেড়েছিল। সারারাত দুই হাঁটুতে মুখ গুঁজে সে টেনে টেনে কাশল। দাদার পিঠে মালিশ করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিল সুলতান। আর দাদা কাশতে কাশতে দম আটকে মরে গেল।
সকালবেলায় সুলতান যখন উঠল তখন জেবু কাঁদছিল। জেবু বলল, ‘তোর দাদা মরেছে রে।’
‘সত্যি?’ সুলতানের যেন বিশ্বাসই হতে চায় না। দাদারাও যে মরতে পারে, তা তো কোনোদিন সে শোনেনি। এখন সে শুনল। নিজের চোখে দেখল। দেখে যখন বিশ্বাস হল, দাদা মরেছে, তখন তার মনের বাগানে ফুলঝুরির ফুলকি ছুটল।
বেগু টাঙাঅলা পাড়া-প্রতিবেশীদের ডেকে এনে জড়ো করল। দাদাকে নাইয়ে-ধুইয়ে কবর দিতে নিয়ে গেল তারা।
সারাদিন জেবু খালা কাঁদল আর সুলতানকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলাল। বেগু টাঙাঅলা দাদাকে মাটি দিয়ে যখন ফিরল, সুলতানের হাতে তুলে দিল সে একমুঠো আখের গোল্লা। তাই সে সন্ধ্যা পর্যন্ত চিবোল আর চুষল। মনে মনে বলল, খোদার কসম, দাদা মরলে কত লাভ।
রাত্রেও জেবু খালা সুলতানকে দাদার খাঁটিয়ায় শুতে দিল না। বাচ্চা ছেলে, রাত্রে ঘুম ভেঙে অন্ধকারে একলা ভয় পেতে পারে। সে নিজের কাছে বুকের সঙ্গে সুলতানকে জড়িয়ে ধরে ঘুম পাড়াল।
সকাল হলে জেবু খালা জব্বর নাশতা খাওয়াল সুলতানকে। দইয়ের সঙ্গে গুড় মেশানো; তার সঙ্গে পুরো একটা বাসি রুটি। খেয়েদেয়ে সুলতান মনের ফুর্তিতে বাইরের দিকে পা বাড়াল।
জেবু খালা জিগ্যেস করল, ‘কোথায় চললি, বাপ?’
এই প্রশ্ন অদ্ভুত ঠেকল সুলতানের কানে। যেখানে খুশি যাচ্ছে সে। দাদা তো মরেই গেছে। তবে আবার কোথায় যাচ্ছে, তা জেনে কার কী লাভ?
নীরব দেখে খালা বলল, ‘ছি বাবা, ভিখিরির বাচ্চার খেললে চলে!’ তারপর সে সুলতানের হাত ধরে ভেতরে নিয়ে এল। সেই হাতে তুলে দিল টিনের বাটি। ‘বাটিটাকে ঝুলিয়ে রাখিসনে যেন— উঁচু করে তুলে ধরবি। ঝুলিয়ে রাখলে লোকে ভাববে, ভিখিরি নয়, সওদা করতে যাচ্ছে।’
সুলতান নীরবে তুলে নিল বাটিটা। বাইরে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর, আবার ঘরে ফিরে এল এমনভাবে, যেন কোনো জিনিস নিতে ভুলে গিয়েছে। কিন্তু না। জেবু খালার সামনাসামনি হতেই খালাকে সে জড়িয়ে ধরল। খালার পেটের নিচে মুখ গুঁজে দিয়ে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লাগল সুলতান, আর ছটফট করতে থাকল তাকে জড়িয়ে ধরে।
খালা বলল, ‘ভিখিরির বাচ্চা ভিখ না মাংলে খাবি কী? আজকে যদি তুই আট-দশ আনা আনতে পারিস, আমি তোকে খুশবু চালের ক্ষীর খাওয়াব দেখিস। আল্লার নাম নিয়ে বেরিয়ে পড়, বাছা– দেরি করিসনে।’
কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল সুলতান। কাঁদতে কাঁদতে গাড়ি-ঘোড়ার ভিড়ে বড় রাস্তার ধারে গিয়ে দাঁড়াল। কাঁদতে কাঁদতে টিনের বাটি মেলে সামনে। ‘বাবুজি, অন্ধ মিস্কিনকে দুটো পয়সা খয়রাত দিয়ে যাও। বাবুজি–‘ দাদার ভাষা তার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। মুখস্থ বুলিই তার মুখ থেকে বেরিয়ে পড়ল আপনা-আপনি।
‘কী বললি? অন্ধ? তুই অন্ধ?’ পথচারী বাবুর কঠোর প্রশ্ন।
সুলতান এই ভুল সঙ্গে সঙ্গে ধরে ফেলল। কেবল মাথা নাড়িয়ে জানাল, সে অন্ধ নয়। আর, ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লাগল।
‘মিথ্যে বলছিস, আবার উল্টো কাঁদছিস?’
এ যেন প্রশ্ন নয়– শাসন। এ শাসন বুঝি অনেক বেশি কড়া দাদার শাসনের চাইতে। সুলতান শাসনের কাছে মাথা নত করে দিল। কিছুই সে বলতে পারল না মুখ ফুটে।
‘চাকরি করবি? বাসার কাজ?’
সুলতান কেবল কেঁদেই যাচ্ছে। এসব প্রশ্নের অর্থ জানা নেই তার।
উত্তর না-পেয়ে বাবু চলে গেলেন।
অমনি যেন সম্বিত ফিরে পেল সুলতান। ‘হেই বাবু, দুটো পয়সা দিয়ে যাও। আল্লার রাহে খয়রাত করে যাও, বাবু।’
বাবু আবার ফিরে একবার তাকালেন। তারপর আবার হনহন করে চলে যেতে লাগলেন নিজের কাজে। সুলতান ভাবল, না-জানি আবার কী ভুল কথা বলে ফেলল সে।
