‘হ্যাঁ, পয়সা পেলেই দিয়ে দিবি আমাকে, বুঝেছিস? পয়সা বাজে খরচ করা খুব খারাপ।’
‘দাদা!’
‘কী, বল?’
‘আমার মাথাটা একটু চুলকে দাও তো– ঠিক তোমার বুড়ো আঙুলটার কাছে।’
দাদা থেমে গিয়ে জোরে জোরে সুলতানের মাথা চুলকে দিল। তারপর বলল, ‘ঘরে ফিরে জেবুকে বলব, তোর মাথার উকুন বেছে দেবে। তুইও ওর কোনো কাজ করে দিস, কেমন?’
‘আচ্ছা’।
কিন্তু ঘরে ফিরলে আর উকুন বাছার কথা জেবুকে বলতে মনে থাকে না দাদার। এটা রোজকার ব্যাপার। ঘরে ফিরলে রোজই খাঁটিয়ার উপর বসে দাদা প্রথমে একটু হাঁপ ছাড়বে। লাঠিটাকে খাঁটিয়ার কোণায় পায়ার সঙ্গে ঠেকিয়ে রাখবে।
আর, সুলতানের মাথা থেকে দাদার হাতটা যখন সেদিনের মতো নেমে আসবে, সুলতানের তখন মনে হবে, যেন তার মাথাটা একেবারেই হাল্কা হয়ে গেছে। চুপি চুপি পা টিপে টিপে সে বাইরে বেরিয়ে পড়বে। জেবু খালা যেন দেখতে না-পায়, সেদিকেও তার খেয়াল থাকা চাই। একবার বেরুতে পারলেই হাল্কা মাথা নিয়ে চোঁ চোঁ দৌড়। এক দৌড়েই বাংলো দিয়ে ঘেরা মাঠটায় গিয়ে পৌঁছাবে সে। সেখানে বড়লোকের বাচ্চারা ক্রিকেট খেলে, আর গরিবের বাচ্চারা দূরে চলে-যাওয়া বল কুড়িয়ে এনে দেয়। তারপর, বড়লোকের বাচ্চারা যখন খেলাশেষে মাঠ খালি করে দিয়ে চলে যায়, তখন বেয়ারা, চাপরাসি, খানসামা আর মেথরের বাচ্চারা কাঁচের গুলি খেলতে আরম্ভ করে দেয় সেই মাঠে
সুলতানও একবার চেষ্টা করেছিল এই খেলায় যোগ দিতে। কিন্তু মেথরের বাচ্চা প্রকাশ করে দিয়েছিল, ওটা তো ভিখিরির বাচ্চা। কাজেই সুলতান আর খেলবার সুযোগ পায়নি। কিন্তু কাঁচের গুলি অনেক দূরে চলে গেলে দৌড়ে গিয়ে সে কুড়িয়ে আনে সেটা, আর যার জিনিস তাকে ফেরত দেওয়ার আগে গুলিটাকে সে আঙুলের ডগায় ভালো করে নেড়েচেড়ে দেখে নেয়।
একদিন সে অনেক কান্নাকাটি করে দাদার কাছ থেকে কয়েকটা পয়সা নিয়ে কাঁচের গুলি কিনেছিল কয়েকটা। কিন্তু সেই গুলি নিয়ে যখন সে বড় সাধ করে মাঠে গেল খেলতে, তখন বেয়ারা, চাপারাসি, খানসামা আর মেথরের বাচ্চারা সুলতানের ওপর চিলের মতো ঝাঁপটা মারল, আর ভিখিরির বাচ্চারা সব গুলি কেড়ে নিয়ে গেল। সুলতান অনেক কাঁদল, কিন্তু গুলি সে ফেরত পেল না আর।
সুলতান তবু ফাঁক ফেলেই ওই মাঠে যায়। মাঠে যাওয়া একটা নেশার মতো। মাঠটা যেন তাকে চুম্বকের মতো টানে।
আর, মাঠে এলে ফিরতে ইচ্ছে করে না সুলতানের। দাদার হাতের পাঞ্জাটাকে সে একেবারেই সহ্য করতে পারে না। সেই হাতে রস নেই, কষ নেই। শক্ত। শুকনো কাঠের মতো। সেই কাঠে কী ধার। সুলতানের মগজের ভেতরে যেন সেটা কেটে বসে যেতে চায়। সুলতান জানে, সকাল হলেই তাকে উঠতে হবে। উঠে মাথার উপর চাপিয়ে নিতে হবে হাতের পাঁচটা আঙুল। আঙুল নয়, যেন লোহার পাঁচটা শলা।
ঘুমিয়ে থাকলেও দাদার হাত মাথার উপর টের পায় সুলতান। হাতটা যেন একটা পিঞ্জর, আর সুলতানের উকুনে-ভরা-মাথাটা একটা পাখি। পিঞ্জর থেকে বেরিয়ে পালিয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই তার।
রাস্তা দিয়ে দাদাকে নিয়ে যখন চলে, তখন মনে হয়, কয়েদ খাটতে যাচ্ছে সে, সেপাই হাত-কড়া দিয়ে চোরকে বেঁধে নিয়ে গেলে চোরের না-গিয়ে যেমন কোনো উপায় থাকে না, সুলতানেরও না-গিয়ে তেমনি কোনো উপায় নেই।
দাদা আখ খেতে নিষেধ করে, কিন্তু আখের দিকেই তার টান বেশি। আখঅলার ঠেলাগাড়ি থেকে দু-একটা গোল্লা গড়িয়ে নালায় পড়লে সে ছুটে গিয়ে কুড়িয়ে এনে মজা করে খায়। দাদাকে নিয়ে পথ চলতে চলতে পায়ের কাছে বাবুদের-ফেলে দেওয়া কলার খোসা চোখে পড়লে কুড়িয়ে নেয়। সেই খোসাতে ইঁদুরের মতো দাঁত বসিয়ে মজ্জা বের করে আনে। বাদামের খোসা পেলে তুলে নিয়ে দেখে, আস্ত, না, ছাড়ানো।
রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে নানাভাবে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা কম করে না সুলতান। কিন্তু সুলতানের মাথায় রাখা আঙুলের ডগা দিয়েই দাদা অনেক আগে টের পেয়ে যায় সুলতানের ফন্দি। কখনো বকে, গাল দেয়। কখনো বোঝায়। বলে, ‘আমি মরলেই তোর ছুটি, তখন তুই যা-খুশি করে বেড়াবি। লোকের হাতে কত মার খাবি। তখন তুই নিজে নিজেই বুঝতে শিখবি, কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ। কিন্তু যদ্দিন না-মরছি, তোকে ছাড়া আমি ভিখ করব কেমন করে, বল। দিন পোয়ালে চারটি গণ্ডা পয়সা জেবুর হাতে তুলে না-দিলে রুটি খাবি কী দিয়ে?’
অনেকদিন আগের কথা, মেথরপট্টির পেছনে বেগু টাঙাঅলার গাড়ির নিচে দাদা-পোতায় জড়াজড়ি করে রাত কাটাত। একদিন সাহেবপাড়া থেকে ভিক্ষা করে ফিরছিল। বেগুর মা জেবু এসে সামনে দাঁড়াল। ‘ফকির বাবা, আল্লার কাছে একটু দোআ করে দাও, আমার বেগুর যেন অসুখ সেরে যায়। এক টাকা মানত করেছি ফকির বাবা, আমি তোমাকে দেব।’
দাদা ওইখানেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দু’হাত তুলে দোয়া করল।
আবার ক’দিন পর দাদা সুলতানকে নিয়ে ভিক্ষা করে ফিরছিল। জেবু সামনে এসে দাঁড়াল। দাদার হাতে একটা টাকা দিয়ে বলল, ‘ফকির বাবা, তোমরা বাইরে পড়ে থাক আমার ছেলে বলছিল, ওতে আমাদের পাপ হয়। তোমরা আজ থেকে আমার এই কুঁড়েঘরেই থাকবে।’
সেদিন থেকে ওরা জেবুদের কুঁড়েঘরে এক কোণায় জায়গা পেয়ে গেল। ওরা দিনমান ভিক্ষা করে যা পায়, জেবুর হাতে তুলে দেয়। বিনিময়ে জেবু ওদের রুটি খেতে দেয় দু’বেলা!
