‘থামের ভেতরে মেম সাহেব কথা বলত?’ সুলতান অবাক হয়ে গেল। ‘তখন না-হয় মেম বলত, আর এখন কে বলে, দাদা?’ তারপর, হঠাৎ সুর পালটে ফিসফিস করে বলল, ‘দাদা, দুজন বাবু আসছে।’
দাদা তাড়াতাড়ি আওড়াতে শুরু করে দিল, ‘ও বাবু, অন্ধ মিস্কিনকে দুটো পয়সা খয়রাত দিয়ে যাও। আল্লা তোমার চাকরিতে তরক্কি দেবেন, বাবা। সকাল থেকে রুটি খাওয়া হয়নি, বাবা। আল্লা তোমাকে ছেলে দেবেন, পোতা দেবেন; তুমি সুখে থাকবে, বাবা। গরিব মিস্কিনকে–‘
এক বাবু অট্টহাসি দিয়ে উঠলেন, ‘বুড়োটা দেখছি পরিবার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে হে।’ তারপর হাসতে হাসতে চলে গেলেন তাঁরা দুজন।
‘চলে গেল।’ সুলতান আস্তে করে বলল কথাটা। কিছুক্ষণ থেমে সে জোরে একটা গাল দিয়ে দিল বাবু দুজনকে।
দাদা সুলতানের মাথায় চাপ দিল বাঁ হাতের। ‘আবার মুখ খারাপ করলি তুই? কাল তোকে কী বলেছিলাম রে, শুয়োর। কেউ যদি শুনে ফেলে, কল্লাটা তোর ছিঁড়ে উল্টোদিকে বসিয়ে দেবে, বুঝেছিস?’
সুলতান চুপচাপ চলতে লাগল। কিছুক্ষণ পর বলল, ‘আমার মাথায় তোমার বুড়ো আঙুলটা যেখানে আছে না, ঠিক ওইখানকায় একটু চুলকে দাও তো, দাদা।’
দাদা কানের ওপাশ থেকে শুরু করে ওপাশ পর্যন্ত সারা মাথায় জোরে জোরে চুলকে দিল। ‘সুলতান, কী ব্যাপার, আজকে যে তুই থামতেই চাস না। বাবু-টাবু কেউ কি যাচ্ছে না রে?
‘না, দাদা।’
‘বাবুরা সব আজ গেল কোথায়, বলতে পারিস?’
‘মরেছে বোধহয়।’ তারপর, হঠাৎ থেমে পড়ে জিগ্যেস করল, ‘আজকে কী দাদা?’
‘তা আমি কেমন করে বলব রে! তুই মনে করে রাখতে পারিস না? আমার কাছে তো দিন-রাত সব সমান, তা জানিস না নাকি?’ কিছুক্ষণ চিন্তা করে দাদা আবার বলল, ‘পরশু তুই আমায় নীলা মসজিদ নিয়ে গিয়েছিলি না? পরশু জুম্মার দিন ছিল না? তাহলে তো আজকে রোববার রে। রোববারটা দেখছি এক্কেবারে সর্বনেশে দিন রে, সুলতান। বাবুরা আজকে বিবি-বাচ্চাদের নিয়ে বাড়িতে বসে খেলা করছে, বুঝেছিস?’
সুলতান দাঁড়িয়ে থাকল। একটু পরে টিনের বাটিতে টুন করে একটা শব্দ হল।
‘কী পড়ল রে সুলতান? কত?’
‘এক পয়সা, দাদা। টেডি এক পয়সা।’
সুলতানের মাথায় পাঞ্জাটা দাদা ঘোরাল। সুলতানকে নিজের দিকে করে নিয়ে বলল, ‘যা, ওইটা নিয়ে কিছু কিনে খাগে যা। আমি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকছি।’
‘এক পয়সা দিয়ে কিছুই পাওয়া যায় না, দাদা। কিচ্ছু না। আরো তিন-চারটে হলে হয়তো আখের গোল্লা পাওয়া যেতে পারে।
পকেটে হাত ঢুকিয়ে দাদা আরো কয়েকটা পয়সা বের করল। ‘এই নে। কিছু কিনে খেয়ে আয়। সকাল থেকে তো কিছুই খাসনি। বাচ্চাদের ক্ষিদে আবার বুড়োদের চাইতে বেশি! যা।’
সুলতান পয়সা নিয়ে দৌড় মারল।
দাদা আবার বলল, ‘তাড়াতাড়ি ফিরিস কিন্তু। আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি রে সুলতান?’ সুলতান আবার ফিরে এল। ‘আর একটু বাঁ দিকে সরে দাঁড়াও দাদা।’ সুলতান হাত ধরে সরিয়ে দিল দাদাকে। ‘এই থামটার সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাক
সুলতান চলে গেল। আর, দাদা থামের সঙ্গে কান লাগিয়ে কী যেন শোনার চেষ্টা করতে লাগল। শুনে শুনে মুচকে মুচকে হাসল সে। এইভাবে কেটে গেল অনেকক্ষণ। সুলতান আসছে না কেন? দাদা হাঁক ছাড়ল, ‘সুলতান ও সুলতান! ও হারামজাদা শুয়োরের বাচ্চা, মরলি নাকি?’ কোনো জবাব এল না। তারপর, এদিক-ওদিক ঘুরে ঘুরে রাস্তার লোকদের সম্বোধন করল, ‘ও ভাই, ও বাবু, আমার পোতাটা এইদিক দিয়ে গেল কিছু কিনতে। সুলতান নাম। টাঙার নিচে, মটরের নিচে গিয়ে পড়ল না তো হতচ্ছাড়াটা। ও সুলতান, সুলতান!
‘আসছি, দাদা।’ দূর থেকে সুলতানের গলা শোনা গেল।
কিন্তু ঠিক তেমনি সময়ে আবার কাশি উঠল দাদার। কাশির দমক কমলে মুখ ফিরিয়ে যেন সে থামটাকেই জিগ্যেস করল, ‘কোথায় গিয়েছিলি রে মরতে?’
সুলতান নিজে নিজেই দাদার বাঁ-হাতটা নিয়ে তার মাথায় চাপাল। ‘ভেল্কির খেল হচ্ছিল, দাদা?। পেটের ভেতর থেকে গুলি বের করছিল টেনে টেনে। আমার পেট থেকেও একটা বের করল।’
পাঁচ আঙুলের ডগা দিয়ে দাদা সুলতানের মাথাটাকে এমনভাবে টিপে ধরল, যেন সে তাকে উপরে তুলে ফেলবে। ‘চল, ঘরে ফিরে চল। ওখানে গিয়ে তোকে আমি ভালো করে ভেল্কির খেল দেখাব। হারামজাদা, আমি যে দুচোখের কানা, রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে থেকে পা দুটো যে পাথর হয়ে গেল, তা তোর একটুও মনে থাকল না রে, অ্যাঁ?’
সুলতান কিছুই বলল না, হাঁটতে থাকল।
কিছুক্ষণ পর শান্ত গলায় দাদা বলল, ‘কী খেলি রে, ছোঁড়া?’
‘আখের গোল্লা।’
‘আখের গোল্লা! আখ আবার একটা খাবার জিনিস হল রে, অ্যাঁ! ও তো একদম পানি। ছোলাভাজা কিনে খেতে পারলি না– সারাদিন পেটে থাকত।
সুলতান কিছু বলল না, চুপচাপ হাঁটতে থাকল।
দাদা আবার বলল, ‘বাটিটা হাতে ঝুলিয়ে রেখেছিস নাকি রে, সুলতান?’
‘না, দাদা।’
‘খবরদার, ঝুলিয়ে রাখবি না। উঁচু করে ধরে থাকবি, ঝুলিয়ে রাখলে লোকে ভাববে, ভিখিরি নয়, সওদা করতে যাচ্ছে।’
এ-কথায় স্মৃতি কপচানোর ইচ্ছা হল সুলতানের। মনে আছে-না দাদা, একবার বাটিতে করে তেল আনতে যাচ্ছিলাম দোকানে। বাটিটা তোলা ছিল বলে এক বাবু বাটিতে একটা দুয়ানি ফেলে দিল, না দাদা?’
‘তা দুয়ানিটা কী করলি?’
‘কেন, তোমাকে দিয়ে দিলাম, মনে নাই বুঝি?’
