খবরের কাগজ ফেরত দিয়ে রফিক মওলা মুদির কাছে পুরো পনেরো টাকা চেয়ে বসল। মওলা প্রথমে একটু ভ্রু কুঁচকাল, তারপর দিয়ে দিল টাকাটা। টাকা নিয়ে সে দৌড়াল ঘরের দিকে। বউকে শোনাল বিজ্ঞাপনের কথা।
‘কত টাকা দেবে লিখেছে?’ তার বউও অধৈর্য হয়ে উঠেছে
‘লিখেছে, সন্ধানকারীকে এনাম দিয়ে খুশি করা হবে।’ এই বলে রফিক শূন্যের পানে দু’হাত বিস্তৃত করে দিল। ‘হেই আল্লাহ্, তুমি তাদের খুশি রেখ।’
রফিকের বউ তাড়াতাড়ি মেয়ের জন্য পরোটা-ডিমের নাশ্তা তৈরি করল। তাকে গোসল করিয়ে চুল আঁচড়ে দিল। খাওয়াল। তারপর, কপালে-মুখে চুমু দিয়ে বিদায় করে দিল।
রফিক মেয়েকে কোলে করে বাইরে নিয়ে এল। টাঙা ভাড়া করে তাতে বসল। কোথায় যেতে হবে বলে দিল। আর বলে দিল, রাস্তায় খেলনার দোকান দেখলে যেন গাড়ি থামায়। খেলনার দোকান থেকে খেলনা কিনে ফেলল পুরো দশ টাকার। খেলনা পেয়ে মেয়ে একেবারে আনন্দে আত্মহারা। কেউ যাতে নিয়ে না নেয়, সেজন্য ফ্রকের আঁচলে সে লুকিয়ে রাখল খেলনাগুলো।
বিরাট এক কুঠির সামনে টাঙা এসে থামল। দেখে রফিকের চক্ষু চড়কগাছ। কুঠি নয়– যেন বিরাট এক পানির জাহাজ। জাহাজের মতোই চেহারা-সুরত। আনন্দে তার পা কাঁপতে লাগল। মেয়ে কোলে করেই সে টাঙা থেকে নামল। মেয়ে এতক্ষণে পরিচিত পরিবেশ পেয়ে রফিকের কোল থেকে নামার জন্য ছটফট করতে লাগল। তারপর, কুঠির সদর-দরজা দিয়ে ঢুকতে না-ঢুকতেই মেয়ে একেবারে ছিটকে কোল থেকে নেমে দৌড় দিল ভিতরের দিকে। রফিক তাকে ধরবার অনেক চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। মেয়ে ততক্ষণে অন্দরে চলে গিয়ে কোথায় মিলিয়ে গেছে। রফিকের বড় দুঃখ হল। সে চেয়েছিল আঁচল-ভরা খেলনা নিয়ে মেয়েকে কোলে করে সাহেব-বাহাদুরের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে, কিন্তু তা আর হল না। কাজেই সিঁড়ির কাছ পর্যন্ত গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল খালি হাতে।
সাদা পোশাক সজ্জিত এক ব্যক্তি এসে তার সামনে দাঁড়াল। ‘তুমিই তামিনাকে এনেছ?’
‘হ্যাঁ হুজুর, আমিই এনেছি।’ রফিক মাথা নুইয়ে কুর্নিশ করল।
‘সাহেব তোমাকে ভেতরে ডাকছেন– আমি সাহেবের আরদালি।’
‘আচ্ছা আচ্ছা ভাই, ভুল হয়েছে মাফ চাই। আমাকে ভেতরে নিয়ে চল।’
রফিক এখন সাহেব-বাহাদুরের সামনে সশরীরে দাঁড়িয়ে। আহা, কী জৌলুস! এমন ঘর, আর এমন সব আসবাব-পত্র, সাজ-সজ্জা সে কেবল রাজপুত্র আর রাজ-কন্যাদের গল্পতেই শুনেছে। সাহেব-বাহাদুর একবার তাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে নিলেন। রফিক বুঝল, এই ময়লা কাপড় পরে আসা তার উচিত হয়নি। বউটার আক্কেল বলতে যদি কিছু থাকে। এত পারল আর এক আনার সাবান কিনে তার কাপড়টা একটু ধুয়ে দিতে পারল না।
‘মেয়েকে তুমি এনেছ?’ সাহেব-বাহাদুরের তির্যক প্রশ্ন।
‘হ্যাঁ হুজুর, আমি এনেছি। আমি ওকে রাস্তায় পেয়েছি– কাঁদছিল। আর…’
‘আমরা খুব খুশি হয়েছি। তুমি খুব ভালো লোক। বেগম সাহেবের সঙ্গে মেয়ে গিয়েছিল বিয়ে-বাড়িতে। সেখানে থেকেই হারিয়ে যায়। তারপর…’
‘হুজুর, আমি… আমি…’ রফিকের মুখ থেকে আর কথা সরে না। আবেগে, উচ্ছ্বাসে সে ভেঙে পড়ে।
‘হারিয়ে যাওয়ার পর থেকে মেয়ের বাপ অজ্ঞান হয়ে পড়ে রয়েছে। সে আমাদের হেড-বাবুর্চি। আমাদের খাওয়া-দাওয়ার খুব কষ্ট হচ্ছে। তুমি খুব উপকার করেছ আমাদের। এই নাও, পাঁচ টাকা বখশিশ্ দিলাম তোমাকে।’
পাঁচ টাকার নোট রফিকের হাতে গুঁজে দিয়ে তিনি অন্দরে চলে গেলেন।
অনুবাদ : নেয়ামাল বাসির
সুলতান – আহমদ নদিম কাস্মি
দাদার বাঁ হাতের পাঞ্জার নিচে সুলতানের মাথা, আর ডানহাতে লাঠি। এই লাঠি পাকা ফুটপাতের উপর ঠুকে ঠুকে সে এলোপাতাড়ি শব্দ সৃষ্টি করছিল।
সুলতান যেই একটু থামল, দাদা অমনি বলতে লাগল, ‘বাবুজি, অন্ধ মিস্কিনকে দুটো পয়সা খয়রাত-‘
‘না, না, দাদা, বাবু নয়।’ সুলতান বলল, ‘ভেল্কির খেল হচ্ছে।’
‘হেঁহ, ভেল্কির খেল হচ্ছে। তোর– ‘ জিবের ডগায় একটা খারাপ কথা এসে গিয়েছিল, কিন্তু ঠিক সেই সময় ফুসফুস থেকে জোর একটা কাশির ধাক্কা ঠেলা দিয়ে উঠল। সুলতানের মাথা থেকে সরিয়ে নিয়ে হাতটাকে বুকে রেখে দীর্ঘ কাশির দমকে ডুবে গেল দাদা।
দাদার শ্বাসনালী পরিষ্কার হতে হতে যে সময়টুকু চলে গেল, সেই সময়ের মধ্যে ভেলকির পুরো একটা খেল দেখে নিতে পারল সুলতান। ঝুড়ির মধ্যে ময়লা ন্যাকড়া রাখা ছিল- ভেল্কিঅলা সেই ন্যাকড়াকে যখন দুই-দুটো মোটা মোটা পায়রা বানিয়ে ফেলল, তখন উপস্থিত দর্শকমণ্ডলী হাততালি দিয়ে উঠল। আত্মহারা, তন্ময় সুলতানও যোগ দিল সেই হাততালিতে।
দাদা আবার বাঁ হাতটা মাথার উপর রাখতে গিয়ে মাথা খুঁজে পেল না। ‘কোথা গেলি রে তুই?’
সুলতান দৌড়ে এসে হাতের নিচে মাথা রাখল। তারপর, আবার চলতে লাগল দাদাকে নিয়ে।
চলতে চলতে একসময় দাদার লাঠিতে বিদ্যুতের খুঁটি বেজে উঠল। সুলতান বলল, ‘শুনেছ, দাদা, থামটা কেমন বেজে উঠল?’
‘হুঁ।’ দাদা থামল। খুঁটির উপর দাদা আর একটা বাড়ি মারল লাঠির। কিন্তু বাড়িটা
বেজায়গায় লেগে ফসকে গেল।
সুলতান বলল, ‘আমাকে দাও।’ সুলতান দাদার হাত থেকে লাঠিটা নিয়ে জোরে জোরে বিদ্যুতের খুঁটির উপর বাড়ি মেরে বাজনা বাজাতে লাগল।
‘দেখেছিস, কেমন বাজনা!’ দাদা ছেলেমানুষি জুড়ে দিল সুলতানের সঙ্গে। ‘যখন আমি তোর মতো ছোট ছিলাম, থামে কান লাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। তখন থামের ভেতর থেকে মেম সাহেব ইংরেজিতে কথা বলত। ইউ গুড, ইউ ব্যাড
