ছেলেদের বলল, ‘তোরা দুজন হাততালি দে।’ তাদের হাততালি শুনে মেয়ে থামল। কিন্তু হাততালি থামতে আবার চিৎকার জুড়ে দিল। ততক্ষণে ক্ষীর তৈরি হয়ে গিয়েছিল। রফিক নিজের হাতে ধরে ধরে মেয়েকে ক্ষীর খাওয়াতে আরম্ভ করল। কিন্তু দূরে নিজের ছেলেদের চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বউয়ের ওপর বিগড়ে গেল ভীষণ। ‘তুমি আমার ছেলেদের ক্ষীর দাওনি কেন?’
নিজের ছেলেদের কাছেও পরিবেশন করা হল ক্ষীর। ক্ষীর খেয়ে মেয়ে অনেকক্ষণ চুপ থাকল বটে, কিন্তু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল এখানকার অপরিচিত পরিবেশকে। রফিক বউকে বলল আশ্বস্ত হয়ে, ‘ক্ষিদে পেয়েছিল, সেই জন্যে কাঁদছিল। দেখ, এখন কেমন চুপ করেছে।’
‘হ্যাঁ, তা যেন হল। কিন্তু মা-মণির ক্ষীর পছন্দ হয়েছে কিনা কে জানে!’ বউ বলল। রফিক জানতে চাইল, ‘কী মা-মণি, ক্ষীর তোমার ভালো লেগেছে তো?’
সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল মেয়েটি।
‘তোমার আব্বার নাম কী?’
সংক্ষিপ্ত উত্তর এল, ‘আব্বা।’ ওরা দুজন হেসে ফেলল তাই শুনে
‘তোমার আব্বা কী করেন?
‘লুটি খান।’
‘রুটি খান? আর কিছু করেন না?’
‘বলফের পানি খান। লেডিও শোনেন
ওরা দুজন এই শুনে খুব হাসল। রফিক বউকে বলল, ‘বড়লোকের কাণ্ডই আলাদা। উঠতে খান, বসতে খান, শুতে শুতেও খান।’ আনন্দে রফিক আত্মহারা। আজকে সে হাঁটুর ব্যথার কথাও সম্পূর্ণ ভুলে গেছে। আনন্দের জোয়ার এসেছে তার মনে। সে কোনো কিছুই গুছিয়ে চিন্তা করতে পারছে না। কেবল একটা চিন্তাই তার মাথায় বারবার ঘুর-পাক খাচ্ছে। আর, তা হচ্ছে : দৌলত সে এখনো পেয়ে যদি না-ও গিয়ে থাকে, পেতে বিশেষ আর বিলম্ব নেই।
‘ঘোড়া-ঘোড়া খেলবে, মা-মণি?’
রফিকের এই প্রস্তাব সে সঙ্গে সঙ্গে মেনে নিল। আর, অমনি রফিক লুঙ্গি গুটিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে বসে পড়ল। তারপর সারা আঙিনায় এবড়ো-খেবড়ো মাটিতে সে হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াতে লাগল মেয়েকে পিঠে চাপিয়ে। ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে মেয়ে খুব আনন্দ পেল, আর হাসল খিলখিল করে। তারপর, ক্লান্ত হয়ে যখন সে মেয়েকে পিঠ থেকে নামিয়ে দিল, তখন তার হাঁটু দিয়ে রক্ত ঝরছিল।
বউ সেই রক্ত দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলে রফিক বলল, ‘ও কিছু নয়– আমার একটুও কষ্ট হয়নি।’ তারপর, লুঙ্গি দিয়ে রক্ত মুছে ফেলল।
এইভাবে দিনটা কেটে গেল। কিন্তু সন্ধ্যা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটি আবার কাঁদতে আরম্ভ করে দিল। আবার তাকে মিষ্টি কিনে এনে খাওয়ানো হল, ওর জন্য বিশেষভাবে জর্দা রান্না করে তা-ও খাওয়ানো হল, বউ অনেকক্ষণ পর্যন্ত মেয়েকে কোলে নিয়ে টহল দিয়ে বেড়াল, কিন্তু কিছুতেই তার কান্না থামানা গেল না। অবশেষে সে নিজে নিজেই ঘুমিয়ে পড়ল ক্লান্ত হয়ে ঘুমুনোর সঙ্গে সঙ্গেই সারাটা ঘর জুড়িয়ে গেল। শোয়ার সময় না-হওয়া সত্ত্বেও নিজের ছেলেদেরও ঘুমিয়ে পড়তে বলল সে। তাদের কলরবে মেয়ে যদি জেগে যায়, তাহলে ভারি বিপদ হবে। রফিকের বউ মাথার কাছে বসে বসে পাখা করতে লাগল। না-জানি, নিজের বাড়িতে সে কত আরামে ঘুমায়। আর, রফিক মনে মনে অস্থির হয়ে মেয়ের চারপাশে ছটফট করে বেড়াতে লাগল। কিছুতেই সে নিশ্চিন্ত হয়ে দু’দণ্ড বসতে পারছে না। কেবলই ভাবছে যে, পুরস্কার যদি অন্তত এক হাজার টাকাও পাওয়া যায়, তাহলেও ওদের অনেক দুঃখ ঘুচবে। এইকথা সে ভাবছে আর কেবলই ঘুরপাক খাচ্ছে। রফিক ফিফিস্ করে বউয়ের কাছে জানতে চাইল, ‘এক হাজার টাকা পেলে তোমার কতদিন চলবে?’
‘তা চাটনি দিয়ে রুটি খেয়ে চালাতে পারলে তো পাঁচ-ছ’বছর যাবেই।’ বউ দিন-মাস-বছরের হিসাব-নিকাশ করেই উত্তরটা দিল। ‘তোমার ছেলেরাও বড় হয়েছে, ততদিনে ওরা কাজ করে তোমাকে খাওয়ানোর যোগ্য হয়ে উঠবে। তোমাকে আর তখন কাজ করতে হবে না।’
‘তা যা বলেছ বউ।’ সে বউয়ের আরো কাছে সরে এল। ‘বর্ষা আসছে; মাথার উপর চাল ফুটো, তা দেখেছ? এ বছর মেরামত না করলে সবসুদ্ধ ভেঙে পড়বে। আর, যদি পুরস্কার বেশি পাওয়া যায়, তাহলে গোটা ঘরটাই নতুন করে তোলা যাবে, কী বল?’
‘হ্যাঁ, নিশ্চয়– ঘর আগে, না পেট আগে। এই ঘরে আমাদের ছেলে-বউরা আসবে একদিন।
‘তাহলে আমি এখনই মিস্ত্রিকে খবর দিয়ে আসি, যেন কাল সকাল থেকে মেরামতের কাজ শুরু করে দেয়। মওলা মুদি দেখলে একেবারে মরমে জ্বলবে।’
‘এখন নয়, কাল সকালে বললেই চলবে’খন।’
‘না, না, এখনই বলে আসি– কাল সকালে তাকে আবার পাওয়া যাবে না।’ রফিক চলে গেল।
মিস্ত্রিকে খবর দিয়ে বাড়ি ফিরে শুয়ে পড়ল। কিন্তু ঘুম আসে না। আইচাই করে রাতটা কেটে গেল। সকালবেলায় উঠে দৌড়াল মওলা মুদির দোকানে। দোকান তখনো খোলেনি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল দোকান খোলার।
মওলা মুদি যখন এল, তখন তার হাত থেকে খবরের কাগজটা প্রায় কেড়ে নিল রফিক। তাড়াতাড়ি পাতা উল্টে খুঁজতে লাগল ‘নিখোঁজ’-বিজ্ঞাপন। শেষে এক জায়গায় পেয়ে গেল মেয়ে হারানোর খবর। কী আশ্চর্য! হুবহু মিলে যাচ্ছে বর্ণনার সঙ্গে। একেবারে এই মেয়েটিই। না হয়েই যায় না। তার ওপর পুরো ঠিকানাও দেওয়া হয়েছে, কোথায় পৌঁছে দিতে হবে। তারপর, শেষে লিখেছে, ‘সন্ধানকারীকে এনাম দিয়ে খুশি করা হবে।’ রফিকের বুকটা ধড়ফড় করে উঠল এনামের কথা পড়ে।
