কিন্তু ঘরের কোণায় বসে থাকলে নিখোঁজ শিশুকে পাওয়া যাবে না। সুতরাং, সে রাস্তায় নামল। রাস্তায় রাস্তায়, গলিতে গলিতে, পার্কে-ময়দানে নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে বেড়ালো হন্যে হয়ে। দুর্বলতা হেতু মাথা ঘুরলে কিংবা হাঁটুর ব্যথা চাড়া দিয়ে উঠলে এক জায়গায় থপ্ করে বসে পড়ল। বসে বসেই খুঁজতে লাগল নিখোঁজ শিশুকে। বাচ্চা দেখলেই সে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে। কিছু যেন মিল পাওয়া যাচ্ছে! না, এ দেখার ভুল। কোনো ছেলেকে একা একা কাঁদতে দেখলে সে ছুটে যায়। কিন্তু ধরতে পারার আগেই ছেলেটা পালিয়ে যায় কিংবা ঢুকে পড়ে নিজের বাড়িতে। দীর্ঘশ্বাস পড়ে অগোচরে। তবু মনে মনে ভাবে, আশাই এখন সম্বল, হাল ছাড়া উচিত নয়।
ঘুরতে ঘুরতে সে একটা বড় রাস্তায় নামল। অন্য কারও ছেলে নয়– যেন সে নিজেরই কোনো হারানো মানিককে খুঁজছে। সেই মানিক খুঁজতে খুঁজতে শেষে বড় একটা প্রাসাদতুল্য বাড়ির সামনে ভিড় দেখে থামল। সম্ভবত বিয়ে-বাড়ি। সামনের প্রশস্ত উদ্যানে শামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। তার নিচে খানা-পিনার আয়োজন। বহু চেয়ার-টেবিল, লোকজন। ব্যান্ড বাজছে। ছেলে-মেয়েরা রং-বেরঙের পোশাক পরে ছুটোছুটি, হুড়োহুড়ি করছে। প্রাসাদের ফটকের কাছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এইসব দেখতে লাগল অনেকক্ষণ ধরে। রফিক ভাবছে, তার ছেলের যখন বিয়ে হবে, তখন ব্যান্ড-পার্টি না আনতে পারুক, সানাই নিশ্চয় বাজবে, মেহমানদের পোলাও-জর্দা খাওয়াবে, আর কনের জন্য খুব দামি না হোক, ভালো পছন্দসই কাপড়-চোপড়, অলঙ্কার কিনে আনবে।… এমনি আরো কত কী চিন্তার মগ্নতা ছিন্ন করে সামনে এসে দাঁড়াল ভৌতিক স্বপ্নের মতো মওলা মুদির প্রলুব্ধ চোখ দুটো। আর, অমনি হাঁটুর ব্যথাটা সে টের পেল। আর, চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল দু’গাল বেয়ে।
তখনো তার চোখের পানি শুকোয়নি। এমন সময় দুটি শিশু ছুটতে ছুটতে ফটকের বাইরে এসে পড়ল। একটা ছেলে তাড়াচ্ছিল একটা মেয়েকে। একেবারে রফিকের সামনে এসে পড়লে ছেলেটা মেয়েটিকে ধরে ফেলল, তারপর বেশ কয়েকটা কিল-চড় মারল। রফিক গিয়ে বাধা দিতে পারার আগেই আরো কয়েকটা কিল-ঘুষি মেরে দিয়ে সে পালিয়ে গেল বাড়ির ভেতরে। ছোট মেয়েটি কাঁদতে লাগল গলা ফাটিয়ে। রফিক তাকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করতে লাগল। আস্তে আস্তে কান্না থামাল মেয়েটি।
‘নাম কী, মা তোমার?’ আদর করতে করতে প্রশ্ন করল রফিক।
‘তা-তা-তাতি।’ কান্নার রেশ তখনো থামেনি, তার ওপর এত বেশি তোতলাচ্ছে যে, কী সে বলল, তা ভালোমতো বোঝাই গেল না।
রফিক তাকে আরো বেশি আদর করতে লাগল, আর আদর করতে করতেই হঠাৎ তার মাথায় একটা বদ-খেয়াল চেপে গেল। মেয়েটিকে সে চুরি করবে। কিন্তু না, চুরি করা মহা-পাপ। সে কখনো কোনোরকম পাপের পথে পা রাখেনি। কিন্তু মওলা মুদির চোখ দুটোকে কেমন করে তার ভিটেমাটির ওপর থেকে সরাবে সে এইসব ভাবছে আর এদিকে-ওদিক তাকাচ্ছে চোরের মতো– কেউ-না আবার দেখে ফেলে এই অবস্থায়। রাস্তা দিয়ে যত লোক যাচ্ছে, তারা সবাই যেন ওকে সন্দেহের চোখে দেখছে। তারা যদি টের পায় ওর উদ্দেশ্য, তাহলে যে কী অবস্থা হবে তা সে ভাবতেও পারে না। তারপর একসময়, রাস্তায় যখন আর কেউ নেই, তখন মেয়েটিকে বুকের সঙ্গে আঁকড়ে ধরে প্রথমে একটা গলিতে ঢুকল; তারপর নানা ঘোরাল পথ, গলি-পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সটান উঠল গিয়ে নিজের বাড়িতে। মেয়েটি কখন কাঁধের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে, তা সে টেরও পায়নি।
বউ ছুটতে ছুটতে কাছে এল। ‘কী ব্যাপার? এ মেয়েকে কুড়িয়ে পেলে? হারিয়ে গিয়েছিল? বড়লোকের মেয়ে মনে হচ্ছে!’
‘হ্যাঁ, হারিয়ে যাওয়া মেয়ে। রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছি। খুব বড়লোকের মেয়ে।’ রফিক বউকে মিথ্যা বলল। তারপর হাঁক ছাড়ল, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছ কী? পরিষ্কার ওয়াড়অলা বালিশ আনো। আস্তে করে শুইয়ে দাও, যেন কোথাও চোট না লাগে। এয়ারকন্ডিশনে মানুষ– তুমি ওর মাথার কাছে হাত-পাখাটা নিয়ে বসে থেক।’
রফিকের বউ বালিশ এনে মেয়েকে শোয়াল। তারপর, হাত-পাখার বাতাস দিতে লাগল। রফিকের ছেলে দুটো এমন জমকালো পোশাক-পরা মেয়ে দেখে অবাক হয়ে গেছে। তাই দেখে রফিক বলল, ‘আমি তোদের এর চাইতে ভালো জামা বানিয়ে দেব, দেখিস। আর নতুন জুতোও পাবি। তাই পরে হেঁটে বেড়াবি মমশ্ করে।’ ছেলেদের কাছে টেনে নিয়ে খুব খানিক আদর করল, তারপর বউকে বলল, ‘তুমি মা-মণির কাছ থেকে সরে যেও না কিন্তু। একলা আবার ভয় পেয়ে যেতে পারে। আমি ততক্ষণে ওর খাবার ব্যবস্থা দেখি। শুকনো বাসি রুটি তো আর ওর খাওয়ার অভ্যেস নেই।’ এই বলে সে বাইরে চলে গেল তাড়াতাড়ি।
মওলা মুদির কাছে পাঁচ টাকা ধার চাইল। ওর কুঁড়েঘরের দিকে প্রলুব্ধ দৃষ্টি হেনে সে ঠোঁটের কোণায় মিহি করে হাসল। ভাড়াটে বাসায় বউ-ছেলে-মেয়ে নিয়ে আরো কতদিন কষ্ট করতে হবে, সে তার হিসাব নিল মনে মনে। তারপর যোগ-বিয়োগের ফলাফল সন্তোষজনক মনে হওয়ায় পাঁচ টাকা ধার দিতে সে আর দেরি করল না। ওই কুঁড়েঘর ভেঙে ওখানে একটা ছোটখাটো বাড়ি তুলবে যেদিন, সেদিন তার বেশি দূরে নয়।
মেয়েকে ক্ষীর খাওয়ানোর মানসে কিনে নিয়ে গেল দুধ, পাটালিগুড় আর খুশবু মিহি চাল। দুপুর গড়িয়ে যাওয়া সত্ত্বেও ওর বউকে আবার নতুন করে চুলো ধরাতে হল। এদিকে ক্ষীর রান্না হচ্ছে, ওদিকে রফিক দৌড়াতে দৌড়াতে আবার বাজারে গেল। মেয়ের জন্য কিছু মিষ্টান্ন আনা হয়নি। বাড়ি ফিরে দেখে মেয়ে জেগে গেছে। জেগেই কাঁদতে শুরু করে দিল সে। মিষ্টি দিয়ে ভুলিয়ে ভুলিয়ে রফিক তার কান্না থামাল। কিন্তু মিষ্টি ফুরোলে এদিক-ওদিক তাকিয়ে অপরিচিত পরিবেশ দেখে আবার কাঁদতে আরম্ভ করল। তখন কোলে নিয়ে আদর করতে লাগল রফিক, আর অদ্ভুত অদ্ভুত সব শব্দ করে তার কান্না থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল।
