এইরকম চলতে লাগল প্রত্যেকদিন। সকাল বেলায় মওলা মুদির দোকানে গিয়ে চুরি-ডাকাতি, রাহাজানি, লুটতরাজ, দাঙ্গা, নারী হরণের খবর শুনিয়ে আসে। বিনিময়ে ধারে কিনে আনতে পারে আটা-ডাল। তারপর, চলে যায় শবজি-বাজারে মজুর খাটতে। এখন সে তার নিজের শক্তির পরিমাপ গ্রহণ না-করেই ছয়টা পর্যন্ত ঝুড়ি বয়ে নিয়ে যায় দুপুরের প্রখর রোদ অমান্য করে। তারপর বেলা গড়িয়ে বাড়ি ফিরতে পারে।
এইভাবে পনেরো-কুড়ি দিনের বেশি চলা গেল না। লু হাওয়ার গরমে শরীর ঝলসে গেল। সেই সঙ্গে হাঁটুর ব্যথা তীব্রতা লাভ করল আর ছড়িয়ে পড়ল অন্যান্য জোড়ে। ছেঁড়া খাঁটিয়ায় শুয়ে শুয়ে ছটফট করতে লাগল। ব্যথার দোসর হয়ে এল জ্বর। জ্বরের বিকারে সে বকতে লাগল, ঝগড়া করতে লাগল মোট বইবার দরাদরি নিয়ে মালিকের সঙ্গে।
রফিকের বউ কখনো এর-ওর বাড়ি যাওয়া ছাড়া অন্য কোথাও যায়নি। এখন তাকে লম্বা একটা ময়লা বোরকা পরে বাইরে বেরুতে হল। মওলা মুদির দোকানে না-গেলে হাঁড়ি চড়বে না। অবশিষ্ট সময় সে কেবল অঝোর ধারে কাঁদে আর আল্লার কাছে প্রার্থনা করে। ছেলেরা ম্লান মুখে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। ঘোড়ায় চাপা তাদের হয় না। খেতে পায় না লেবুনচুস। পনেরো দিন পরে রফিকের জ্বর বাড়ল।
অসুস্থতার কালে মওলা মুদি প্রত্যেকদিন আটা, ডাল, সাগু দিয়েছে ধারে। প্রত্যেকদিন দু আনা, তিন আনা করে এতদিন যা বাঁচিয়েছিল, তাই দিয়ে ওষুধ আর ডাক্তারের খরচ কুলিয়েছে। মরলে গরিব লোকের কাফনের টাকাটা হয়তো চাঁদা করে তোলা যায়, কিন্তু না-মরা পর্যন্ত চিকিৎসার খরচটা গাঁট থেকে না-খসালে চলে না। কিন্তু ঋণের বোঝা এত বেড়েছে যে, তা সারাজীবন মজুর খাটলেও শোধ হওয়ার নয়। ভাবতেও তার সারা শরীর শিউরে ওঠে। রোগমুক্তির পর থেকে সবসময় তার চিন্তা, কেমন করে এই ঋণ শোধ করবে। ব্যথা কিছু কমলেও দুর্বলতার জন্য উঠবার সাধ্য নেই। তবু তার আশা, আরো আট-দশ দিন গেলে হয়তো আবার শবজি-বাজারের দিকে পা বাড়াবার যোগ্য হয়ে উঠবে সে।
জোয়ান বয়স হলে আরোগ্যলাভের পর শক্তি ফিরে পেতে সময় লাগে না বেশি। কিন্তু ওর বয়স প্রৌঢ়ত্বে এসে ঠেকেছে। তার ওপর কর্জের শুকনো রুটি খেয়ে অচিরে সে বুঝে ফেলল, দেহটা একেবারেই অকেজো হয়ে গেছে। মাত্র কিছুক্ষণের জন্য মওলা মুদির দোকানে খবরের কাগজ পড়তে গেলেও পা টলমল করে, মাথা ঘোরে, হাঁটুর ব্যথা বেড়ে যায়। বাড়ি ফিরে একাকী মুখ লুকিয়ে পড়ে থাকে। ছেলেদের দিকে তাকালে আপনি আপনি দুচোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে অঝোর ধারে।
কাজে যেতে না-পারলেও রোজ সকালে মওলার দোকানে ডিউটি দিতে যাওয়া অপরিহার্য। আটা আর ডাল ধার করতে যেতে হয়; তাছাড়া ধার যে সে শোধ করবে, এই মিথ্যা আশ্বাসটাও দিতে যেতে হয়। নিজে না-গিয়ে বড় ছেলেটাকে পাঠালে অসন্তুষ্ট হয় মওলা মুদি। রফিক তার কাছে এখন কৃপণ বেনের ঘিয়ের মতো, যে ঘি খাওয়া যায় না, কেবল আলমারির তাকে সাজিয়ে রাখা যায় সবসময় চোখের তৃপ্তি বাড়ানোর জন্য।
ওদিকে টাকা পাওয়ার জন্য মওলার কোনো তাড়া নেই। সে মনে মনে অন্য এক পাঁয়তারা কষে রেখেছে। কিন্তু রফিক মনে করছে, মওলার মতো বিপদের দিনের বন্ধু আর হয় না। একদিন সেজন্য সে তার ভদ্রতার প্রশংসাও করল। তখন মওলা তাকে বোঝাল, ধার শোধ করার ব্যাপার নিয়ে তাকে আদৌ চিন্তা করতে হবে না। যদি তেমন কিছু হয়, তাহলে রফিক তার কুঁড়েঘরের ওই সামান্য মাটিটুকু মওলাকে দিয়ে দিতে পারবে। বন্ধুত্ব মানেই হচ্ছে বিপদে একজন আর একজনের কাজে আসা।
বন্ধুত্বের এই ব্যাখ্যা শোনার পর থেকে রফিক আরো ঝিমিয়ে পড়ে। তার মনে শান্তি দেওয়ার মতো এখন কোনোকিছুই আর অবশিষ্ট থাকল না। বউ তার রাস্তায় নেমেছে। ছেলেরা আওয়ারা কুকুরের মতো এর-ওর বাড়ির সামনে ঘুরঘুর করে। আর, এই মাথা গুঁজবার ঠাঁইটুকুও ক’দিন পরে আর তার থাকবে না।
সেদিন সে মওলা মুদিকে খবরের কাগজ পড়ে শোনাচ্ছিল। হঠাৎ তার চোখ পড়ল নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তিতে গিয়ে। লিখেছে, হারিয়ে যাওয়া ছেলেটির সন্ধান দিতে পারলে পাঁচশো টাকা পুরস্কার। তন্ময় হয়ে ভাবতে লাগল রফিক এই ছেলেটিকে খুঁজে পাওয়া কি তার পক্ষে সম্ভব নয়। ভাবতে ভাবতেই মনের মধ্যে অজস্র চিন্তার বেড়াজালে সে নিখোঁজ করে ফেলল নিজেকে। পাঁচশো টাকা। যখন তার সুদিন ছিল, তখন সে এই কুঁড়েঘরটা তুলেছিল। এ তার নিজের ভিটেমাটি। পাঁচশো টাকা পেলে সুদিনের এই স্মৃতিটাকে রক্ষা করতে পারবে সে। তাছাড়া নিজে কিছু ভালো জিনিস খেয়ে গায়ে তাকত আনবে, যেন সে আবার নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে কাজ করতে পারে। ছি ছি, কী লজ্জার কথা। সে নিজের ছেলেদের কথা আগে ভাবেনি। ওদের জন্য লেবুনচুসের আস্ত একটা টিন কিনে ফেলবে। আর, বউটা খেটে খেটে একেবারে অস্থিচর্মসার– ওর জন্যও অনেক কিছু করতে হবে বইকি। তাছাড়া, পাঁচশো টাকার একটা বাচ্চাতেই তো আর ‘নিখোঁজ’ বিজ্ঞপ্তি শেষ হয়ে যাচ্ছে না। আরো কতজনের কত আদরের ছেলে বা মেয়ে নিখোঁজ হবে। তারা যদি হাজার টাকা বা পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে বসে, তাহলে তাতেই-বা আর বিস্মিত হওয়ার কী থাকতে পারে। যার অনেক দৌলত, তার কাছে টাকা আগে, না সন্তান আগে? বাড়ি ফিরে খুব রহস্যপূর্ণ ভঙ্গিতে বউকে পুরস্কারের কথা জানাল। আর বলল, আল্লার কাছে, যেন কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করে।
