কিন্তু মওলা মুদির দোকান আজ এখনো বন্ধ। হয়তো এখনো সময় হয়নি– রফিক এসে গেছে অনেক সকালে। ওর দৃঢ় বিশ্বাস, কোনোরকমে লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে চাইতে পারলে ধারে জিনিস সে দেবে। খবরের কাগজ পড়ে দেওয়া ছাড়াও সে আরো কত কাজ করে দেয় মওলার। কাজেই সে আশায় বুক বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকল দোকান খোলার অপেক্ষায়।
মওলা মুদি এল খবরের কাগজ বগল-দাবা করে প্রায় দশটা বাজিয়ে। খবরের কাগজ হাতে নিয়ে রফিক গিয়ে বসল তার নির্দিষ্ট ভাঙা চেয়ারটায়। পড়তে শুরু করে দিল। কিন্তু আজ আর পড়ায় মন নিবিষ্ট করতে পারছে না। জানা শব্দও আজ তাকে বানান করতে হচ্ছে। এইভাবে কোনোরকমে দায় সেরে সে মাথা নিচু করে চুপ করে বসে থাকল। তার ধারণা, এইরকম গুমটি মেরে বসে থাকলে মওলা কারণ জানতে চাইবে। কিন্তু মওলা মুদি নিজের কাজে ব্যস্ত। ধুলো ঝাড়ার কাজ শেষ করে এখন সে হিসাবের খাতা দেখতে বসে গেল। অনন্যোপায় হয়ে রফিক কথাটা পাড়ল।
শুনে মওলা মুদি খুব ইতস্তত করতে লাগল। তারপর তার কাছে যখন কড়ার করল যে, যেমন করে হোক, আজ সন্ধ্যার মধ্যে দাম দিয়ে দেবে, তখন মওলা তাকে দু’সের আটা আর এক পোয়া ছোলার ডাল ওজন করে দিল।
সওদা নিয়ে রফিক যখন যাওয়ার জন্য প্রস্তত হচ্ছে, মওলা মুদি তখন তাকে আরো একবার বুঝিয়ে দিল যে, ওর এই ছোট দোকান ধারে জিনিস দিলে একেবারেই অচল হয়ে পড়বে; এমনকি দু-চার দিনের জন্যেও সে ধার আটকে রাখতে পারে না।
এ কথা শুনে ওর লজ্জায় মাথা কাটা যাওয়ার মতো অবস্থা। কিন্তু করার কিছুই নেই। ছেলেদের মুখে রুটি গুঁজে দিতে হবে। গলায় মালার একটা মোতিও সে ছিঁড়তে পারে না। বাড়ি গিয়ে বউ-এর হাতে পোঁটলা দিয়ে চুপচাপ আবার বাইরে বেরিয়ে পড়ল সে।
তিন-চার ঘণ্টা ক্ষুধার্ত পেট নিয়ে কাজের খোঁজে ঘুরে বেড়ানোর পর সে অনুভব করল, প্রত্যেকদিন ছেলেদের মুখে রুটি তুলে দেওয়া সহজ নয়। গরিব লোকের জন্য শৌখিন মিষ্টির দোকান কাছে থাকলেও যেমন নাগালের বাইরে, তার জন্যে তেমনি কাজ করে রোজগার করাটা দুঃসাধ্য।
রফিক তবু শব্জি-বাজারে কাজ করে। আধ মাইল দূরে একটা দোকানে চার ঝুড়ি মাল পৌঁছে দিয়ে পেল বারো আনা। শেষ ঝুড়িটা বয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় মনে হতে লাগল, মাথাটা তার সেই বলদের শিঙের মতো, যার উপর এই দুনিয়াটা দাঁড়িয়ে রয়েছে। শোনা যায়, এক শিং ক্লান্ত হলে সে অন্য শিঙের উপর দুনিয়ার বোঝা পালটে নেয়, আর তখনই দুনিয়ার কোথাও না-কোথাও ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। কিন্তু রফিকের শিং, অর্থাৎ মাথা তো মাত্র একটাই– বদল করার কোনো জো নেই।
বারো আনার বারো আনাই মওলা মুদিকে দিয়ে সে খালি হাতে বাড়ি ফিরল। বুকটা তখন বড্ড খচখচ করতে লাগল একটা কথা ভেবে। এত খাটল, তবু ছেলেদের জন্য এক আনার লেবুনচুসও আনতে পারল না। আঙিনায় রাখা ছেঁড়া খাঁটিয়ার উপর শুয়ে পড়ল সটান হয়ে। ছেলেরা এই প্রথম বাবাকে সারাদিন দেখতে পায়নি। তাই দুজনেই হইচই শুরু করে দিল। কেউ বুকের উপর, আর কেউ পায়ের উপর লাফাতে লাগল। তারপর, মুখে ঘোড়ার খুরের কৃত্রিম শব্দ তুলে বলল, ‘আমরা ঘোড়ায় চাপব।’
ঘোড়া সাজবার সাধ্য এখন তার নেই। তবু একজন একজন করে ছেলেদের পিঠে চাপিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে কিছুক্ষণ সে ঘুরল। এত তাড়াতাড়ি নেমে পড়তে হল বলে অসন্তুষ্ট হল ছেলেরা। রফিক বলল, ‘ঘোড়া এখন বুড়ো হয়েছে। বুড়ো ঘোড়া চলতে পারে না, আরাম করে।
ছেলেরা চলে গেল রাগ করে। আর রফিক আকাশের দিকে মুখ করে শুয়ে থাকল। আকাশে অফুরন্ত আনন্দ নিয়ে পাখির দল এক রাজ্য থেকে আর এক রাজ্যে চলে যাচ্ছে।
বউ হয়তো সবই বুঝল, কিন্তু কিছুই বলল না। বলার তার কিছুই নেই। চুপচাপ চলে গেল খাবারের আয়োজন করতে।
এদিকে হাঁটুর ব্যথায় রফিক ঝাঁকিয়ে উঠল। পা দুটোকে গুটিয়ে নিল বুকের কাছে। মুখ বিকৃত করে সে পড়ে থাকল চোখ বুঁজে। মোট বইবার কাজ করতে গিয়ে হয়তো, এ ব্যথা এত বেড়েছে।
রাত্রে বিছানায় শুয়ে ঘুমন্ত ছেলে দুটোর মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে আপন মনে বলতে লাগল, ‘কাল আমি তোদের জন্যে লেবুনচুস নিয়ে আসব, দুধ-মালাই নিয়ে আসব।’ কী ভেবে আবার নিজের মনেই বলল, ‘না, না, দুধ-মালাই আনতে পারব না– অনেক দাম, তবে লেবুনচুস নিশ্চয়ই আনব।’
হাঁটুর ব্যথায় বড় কষ্ট পাচ্ছে, ঘুম আসছে না। বউ অনেকক্ষণ ধরে পা টিপে দিল। তারপর, আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়ল– গভীর ঘুম।
সকালে উঠে মওলা মুদির কাছে থেকে আবার আটা-ডাল ধারে আনল। আজকে আর ধার দিতে সে আপত্তি করল না। হয়তো বুঝেছে, এ বাকি রাখার লোক নয়। হলও তাই। শবজিবাজারে দোকানে দোকানে মাল পৌঁছে দিয়ে এক টাকা আয় করল। বারো আনা দিল মুদিকে। এক আনার লেবুনচুস কিনল। আজকে বেশি ঝুড়ি বয়েছে। তাই হাঁটুর ব্যথাও কালকের চাইতে বেশি। কিন্তু ছেলেদের লেবুনচুস খাওয়া দেখে আর ওড়নার খুঁটে বউকে তিন আনা পয়সা বাঁধতে দেখে হাঁটুর ব্যথা ভুলে গেল রফিক। সেই আনন্দের টানে টানে সে ছেলেদের সঙ্গে ঘোড়া-ঘোড়াও খেলল। কিন্তু বেশিক্ষণ পারল না। এত তাড়াতাড়ি নামতে হল বলে ছেলেরা রাগ করল। রফিক বলল, ‘ঘোড়া এখন বুড়ো হয়েছে। বুড়ো ঘোড়া চলতে পারে না, আরাম করে।’
