হলুদ পাহাড় আকাশের বুক চিরে মাথা তুলে দাঁড়াল।
সে দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল, ‘আজকেই আমি আমার যাত্রা শুরু করে দেব। অজানা গন্তব্যের পথে আপনি আমার সঙ্গে থাকবেন তো?’
মেয়েটি কয়েক মুহূর্ত কোনো জবাব দিল না। তারপর সে হতাশ কণ্ঠে বলল, ‘এই যাত্রায় সবাইকে একলাই পথ চলতে হয়।
‘না।’
মেয়েটি মন্দ আওয়াজে বলল, ‘না।’
‘এ যাত্রায় একা পথ চলা যায় না। পথ দেখানোর জন্য দ্বিতীয় সত্তার প্রয়োজন।’
‘দ্বিতীয় সত্তা!’
সে মেয়েটির মুখের ওপর তার দৃষ্টিকে স্থাপন করল।
বিষণ্ন চেহারা আস্তে আস্তে আকাশে মিলিয়ে গেল। হলুদ রোদের রহস্য ঘনীভূত হয়ে উঠল। তখন তার মনে হল, ফুটপাতের উপর যেন সে একা দাঁড়িয়ে রয়েছে, আর মেয়েটির আপাদমস্তক তার আত্মার সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছে। সে চোখ খুলল।
তারা দুজন হাতে হাত রেখে হলুদ পাহাড়ের প্রান্তে দাঁড়িয়েছিল।
অনুবাদ : নেয়ামাল বাসির
নিখোঁজ – খোদেজা মস্তুর
সে যদি একলা হত, তবু কথা ছিল। পাথরের দেওয়ালে মাথা ঠুকে আবর্জনার মতো তুচ্ছ এই জীবনটাকে শেষ করে দিতে পারত। কিন্তু আরো তিনটি প্রাণী রফিকের জীবনের কণ্ঠহার। কণ্ঠহারে ওরা তিনজন তিনটি মোতির মতো– একটিকেও সে এই মালা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না।
বিয়ের পর তাদের সেই প্রখর যৌবনের দিনে তারা ছিল সন্তানের কাঙাল। আল্লার কাছে কত কাকুতিমিনতি করেছে, কত মোনাজাত করেছে সন্তানের জন্য, কিন্তু তা পূর্ণ হয়নি। তারপর, যৌবন যেন ক্ষণস্থায়ী, তা যখন ফুরিয়ে যাচ্ছে, তখনো তারা নিঃসন্তান। আল্লাকে স্মরণ করার কথাও তখন ভুলে গিয়েছে। পাড়া-প্রতিবেশীরা এই অসহায়তা দেখে বুঝিয়েছে, ‘রফিক মিয়া, দোয়ার জোরে পাথরও গলে যায়– আর তোমার এই সামান্য আরজি আল্লা শুনবেন না, তা কি কখনো হতে পারে। নিরাশ হয়ো না, খাঁটি মন নিয়ে আল্লাকে ডাক। ডাকার মতো করে ডাক, তাহলেই পাবে।’ কিন্তু রফিকের মন বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। পাড়ার ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের খেলতে দেখলে কখনো কোলে তুলে নিতে ইচ্ছা করে, আবার কখনো বিষাক্ত হয়ে ওঠে মন। নিজের একটা সন্তান লাভের ইচ্ছার অপূর্ণতা গোটা বিশ্ব-সংসারের প্রতি তার মনকে করে তোলে বিরূপ। এমনি সময়ে হঠাৎ একদিন রফিকের বউ দাঁতের ডগায় ওড়নার আঁচল চেপে ধরে
লজ্জারাঙা হয়ে বলল, ‘তোমার দোয়া আল্লা কবুল করেছেন।
একটা পেয়েই তাদের আনন্দের সীমা ছিল না। কিন্তু দ্বিতীয় বছরেই আরো একটা যখন এল, তখনো তারা আল্লার উদ্দেশে মাটিতে মাথা রেখে তাঁর হাজার শুকুর আদায় করল। রফিক নিজেই যেন একটা ছোট শিশু তেমনি শিশুর মতো করেই সে আনন্দ যতই খারাপ হোক– গরিবের আনন্দ প্রকাশ করে বেড়াতে লাগল সর্বত্র। অবস্থা বাঁধনহারা। এ কথাও তার স্মরণ থাকে না যে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আনন্দ করার শক্তিও ফুরিয়ে এসেছে : অল্পতেই হাত-পা ক্লান্ত হয়ে আসে। এই ক্ষুদ্র দুটি প্রাণকে বড় করে তুলতে এক যুগ সময়ের দরকার। আর, এক যুগ সময় কাটানোর জন্য দরকার অনেক টাকা-পয়সার।
যখন সুদিন ছিল আর গায়ে ছিল জোয়ানির তাকত, তখন মজুর খেটে অনেক পয়সা সে আয় করেছে। তখনকার সঞ্চয় এই বেকারত্বের দিনেও ওরা খরচ করে আসছে। সঞ্চয় এমন কিছু নয়– ভালোভাবে খেলে-পরলে এক বছরের বেশি যাওয়ার কথা নয়। কিন্তু রফিকের বউ শুকনো রুটি খেয়ে এমনভাবে খরচ চালিয়েছে যে, এতদিন পর্যন্ত তা টেনে আনা গেল। কত কষ্ট স্বীকার করেছে, কিন্তু স্বামীকে একটা কথা বলেনি। কারণ, সে নিজের চোখে দেখছে, কাজের খোঁজে সারাদিন লোকটা কেমন পই পই করে ঘোরে। হাঁটুর ব্যথায় যার চৌ-প্রহর বিছানায় পড়ে থাকার কথা, সে আরাম কাকে বলে জানে না।
কিন্তু আর তো চুপ থাকা যায় না। পানি যখন গলা পর্যন্ত উঠেছিল, তখনো রফিকের বউ কিছুই বলেনি; এখন মাথাটাই ডুবতে বসেছে, কেমন করে চুপ থাকে। খাবার সময় হলে সবাই তো তার কাছেই আসবে। কাজেই তাকে বলতে হল, ‘আজকের দিনটাও কোনোরকমে কাটল, কাল সকালে কিন্তু চুলো জ্বলবে না।’
শুনে রফিকের চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এল। মনে হল, শ্মশান থেকে উঠে আসা একসারি কঙ্কাল তার চোখের সামনে নৃত্য জুড়ে দিয়েছে।
সাত-সকালে উঠে সে বাইরে বেরুল। পাড়া-প্রতিবেশীদের ঘরে ঘরে উনুন জ্বলছে। তারই ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে আকাশপানে ছুটছে। এই ধোঁয়া আজ তার রান্নাঘরের চাল থেকে বের হবে না ভাবতেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। ছেলেদের আজ সে কেমন করে খেতে দেবে, চতুর্দিকে একবার করে সে দৃষ্টি বুলিয়ে নিল। এ-পাড়ার সব কুঁড়েঘর তার চেনা। কিন্তু কেমন করে গিয়ে সে বলবে, আজ আমাদের ঘরে উনুন জ্বলেনি। আজ পর্যন্ত কখনো সে হাত পাতেনি কারও কাছে। কোনো দোকানে গিয়ে আটা ডাল ধার চাইবে, সেরকম মনোবলও তো তার নেই।
দোকানের কথা ভাবতেই সামনের মোড়ের মওলা মুদির দোকানের কথা তার স্মরণ হল। তার সঙ্গে ওর ঘনিষ্ঠতা অনেক দিনের। নিজে লেখাপড়া জানে না, কিন্তু খবরের কাগজে চুরি-ডাকাতি, লোমহর্ষক রাহাজানি, নারী হরণ, বাজার-দর ইত্যাদি খবর শুনতে মওলা মুদির খুব ভালো লাগে। রফিক নিজেও বিশেষ লেখাপড়া জানে না; কিন্তু কোনোরকমে উর্দুটা পড়ে নিতে পারে। প্রত্যেকদিন সকাল বেলায় গিয়ে মওলাকে সে খবরের কাগজ পড়ে শুনিয়ে দিয়ে আসে। এই সুবাদেই তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা। আর, খবর শোনার নেশা মওলার এত যে, হাড়-কিপটে হলেও খবরের কাগজটা সে রোজ নিজের পয়সা দিয়েই কেনে।
