পরদিন যখন ভোরের আলো ফুটল, সকাল হল, তখন সেই অসুস্থ চেহারার মেয়েটির সামনে হলুদ পাহাড় বুক ফুলিয়ে এসে দাঁড়াল। তার কমল-আঁখি প্রভাতের বিষণ শিশিরের বদলে হলুদ রোদের কাল সাপের ভয়ে আতঙ্কিত হল।
‘মা, আমি বুঝতে পারছি, এবার আমার ডাক আসার সময় হয়েছে।’
‘অমন কথা বোলো না বাবা, অমন কথা তুমি বোলো না!
ভিড় হলুদ পাহাড় থেকে আসা ধ্বনির জন্য অপেক্ষা করছিল, সেই সময় ওরা দুজন ফুটপাতে এসে মিলল।
‘আসুন, চৌরাস্তা পার হই।’ মেয়েটি বলল।
এক-পা বাড়িয়ে সে চকিত আওয়াজে বলল, ‘দাঁড়ান!’
সে দাঁড়িয়ে পড়ল।
সে জিগ্যেস করল, ‘আচ্ছা, আপনার চোখের সেই কেমন অসুস্থ উদাস ভাব কোথায় গেল?’
‘আমি জানি না।’
‘একটু আগেই আমি আপনার চোখে ভয়ের কাল-সাপকে কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে থাকতে দেখেছিলাম। সেটা কি আমার কল্পনামাত্র?’
‘না।’
‘তাহলে বুঝি আপনিও হলুদ পাহাড় দেখতে পেয়েছেন?’ কিছু বলার জন্যে মেয়েটির ঠোঁট ফাঁক হল। কিন্তু ঠিক সেই সময়ে শব্দ শোনা গেল, ‘ভ্রাতঃ! ভ্ৰাতঃ!’
ভিড় হলুদ পাহাড়ের দিকে ছুটল। মেয়েটির ঠোঁট কেঁপে কেঁপে থেমে গেল।
সে ভয় পেয়ে যুবকের হাত চেপে ধরল। তারপর জিগ্যেস করল, ‘ওই ডাক কার জন্যে, বলুন!’
‘আমি বলতে পারি না। অত বড় ভিড়ের মধ্যে থেকে তাকে আমি কেমন করে চিনব?’
‘ওই ডাক যখন বাজছিল, তখন আমি একটা মূর্তি দেখেছি। সে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল। যখন ডাক এল, তার চেহারা লাল হয়ে উঠল। হলুদ পাহাড়ের দিকে সে ছুটে গেল। কে সে? কে সে?’
‘আমি তাকে দেখিনি। হবে কোনো কালের প্রহরী।’
‘কালের প্রহরী? হ্যাঁ, আমি তাকে চিনেছি।’
‘কে?’
‘সে বহুদিন থেকে হলুদ পাহাড়ের চূড়ার ওপারে যাওয়ার জন্যে অস্থির হয়ে ছিল। আজ খুব সকালে সে আমাকে বলেছিল : মা, আমি বুঝতে পারছি, আজ ধ্বনির পর্বত থেকে আমার ডাক আসবে।’
‘তাহলে তো ওই ডাক তার জন্যেই ছিল।’
‘হ্যাঁ। মাফ করবেন, আজ আমি আর চৌরাস্তা পার হব না। আপনি যান।’
সেই মেয়ে মুখ ফেরাল। লাল বাতির পর সবুজ বাতি হল। সে চৌরাস্তা পার হওয়ার অনুমতি পেয়েছিল। কিন্তু তার পা এগুতে পারল না। মেয়েটির পেছনে পেছনে সে চলতে লাগল।
.
‘মহিলা, আপনার বড় কষ্ট হচ্ছে।’ ঠিক পেছনে গাড়ি এসে থামল। মেয়েটি কোনো কথা বলল না।
‘আপনার খুব তাড়া। দাঁড়ান।’
‘না। সে মৃদু গলায় বলল।
‘আমায় আপনার সেবার সুযোগ দিন। দেখুন, আমার গাড়ি প্রস্তুত রয়েছে। কড়া রোদ। আপনার ঘরও এখান থেকে অনেক দূর।’
‘দূর তো বটেই।’ তার পায়ের জ্বলন্ত পাতা থেকে যেন কথাটা এল।
‘তাহলে আসুন-না আমার গাড়িতে। আমি আপনাকে ঘর পর্যন্ত পৌঁছে দি।’
‘দাঁড়ান। একটু দাঁ– ড়া– ন!’ দূরে কেউ তাকে ডাকল।
‘ওই দার্শনিকটার কথায় কান দেবেন না, মহিলা– দেবেন না। ও আপনাকে তার কথার ফাঁদে ফেলবে। আপনার গন্তব্যে ও আপনাকে পৌঁছাতে দেবে না। আপনি শ্রান্ত। ফুটপাত তেতে উঠছে। আপনার পায়ের তলা জ্বলছে।’
‘একটু দাঁড়ান! আমি আপনার সঙ্গে যাব। এই যাত্রায় আপনার একজন সঙ্গী দরকার। এখনি এক জনহীন ভয়ঙ্কর মাঠে গিয়ে পড়বেন। সেখানে না-কোনো সবুজের চিহ্ন পাবেন, না-ছায়া। তার ওপর এক রক্তের নদী– তাতে রক্তের ঢেউ।’ দার্শনিক পেছন থেকে বলল। ‘আমার গাড়ি খুব দ্রুত ছোটে। আমি এটাকে একশো মাইল গতিতে চালাতে পারি। এক মিনিটে…।’
মেয়েটি ফুটপাতে দাঁড়িয়ে পড়ল। বড়ই শান্ত কণ্ঠে জিগ্যেস করল, ‘আপনার গাড়ি রক্তের নদী পার হতে পারবে?’
‘অ্যাঁ? কী বললেন আপনি?’
‘হলুদ পাহাড়ের চূড়ার ওদিকে রক্তের যে-নদী আছে, সেই নদী।’
‘আমি কোনো হলুদ পাহাড়ের কথা তো শুনিনি কখনো।’
‘আমি বলেছিলাম-না–এখনো হলুদ পাহাড় দেখার ভাগ্য ওর হয়নি।’
চুপ কর, হাম্বাগ দার্শনিক! এই মেয়েটিকে তুমি ফুলানি দিচ্ছ! মহিলা, আপনি ওর ধোঁকায় পড়বেন না। আমি দেখতে পাচ্ছি, আপনি বড় দুঃখী। অন্যের দুঃখ আমি চট্ করে দেখতে পাই। আমাকে বিশ্বাস করুন। আমি আপনাকে সুখ দিতে পারি।’
‘কিন্তু– রক্তের নদী?’
‘রক্তের নদী? কোথায় রক্তের নদী? ওই দার্শনিকটা আপনার ওপর জাদু চালিয়েছে এখানে রক্তের নদী-টদী কিছুই নেই। আমার বাড়ি পর্যন্ত যে-রাস্তা গেছে, তা একেবারে সোজা, পরিষ্কার। সেই রাস্তার দু’পাশে ইউক্যালিপ্টাসের ছায়া। আমার বাড়ি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। সেখানে সবুজ, সতেজ লন রয়েছে। আমার ড্রয়িং-রুমে সুন্দর সুন্দর ছবি। যে-কোনো ক্লান্ত পথিক, যে-কোনো দুঃখী আত্মা সেখানে গিয়ে আরাম আর শান্তিতে মগ্ন না- হয়ে পারে না।
‘কিন্তু আমার গন্তব্য যে হলুদ পাহাড়ের ওপারে। সেখানে রক্তের নদীতে প্রবল ঢেউ। আপনি কি সেখান পর্যন্ত আমাকে সঙ্গ দেবেন?’
‘আমি… না তো… পাগল মনে হচ্ছে। তুমি আমার বড্ড সময় নষ্ট করে দিলে। এই প্রথমবারের মতো আমি বুঝতে পারলাম, আমার দরদ, আমার ব্যথা, আমার আবেগ কেমন এক মুহূর্তে ভেঙে খানখান হয়ে গেল। তবে যাও, গিয়ে রক্তের নদীতে ডুবে মর। আমি– আমি– চললাম।’ ক্রোধান্বিত হয়ে গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে সে চলে গেল।
আর, মেয়েটির উদাসীন ভয়ার্ত চোখ প্রদীপের মতো মিটমিট করে জ্বলতে লাগল। তখন উদাসীন চোখে তার দিকে তাকাল, যে ছিল কালের প্রহরী, যে ধ্বনির পর্বতের রহস্য জানার জন্য তার সঙ্গে যেতে প্রস্তুত। এ হচ্ছে সেই ধ্বনির পর্বত, যেখানে থেকে এখনি একজন কালের প্রহরীর ডাক এসেছে আর সে হলুদ পাহাড়ের চূড়া পার হয়ে চলে গেছে। ধ্বনির পর্বতের ওপারে সবুজ প্রান্তর– সেখানকার এক টুকরো শূন্য জমিতে সে তলিয়ে গেছে, তারপর সেই জমিটুকুকে পান্নার মতো সবুজেরা এসে ঢেকে ফেলেছে। আর তার সামনে রক্তের নদী।— মেয়েটির শরীরে কাঁপন লাগল। তার রং ফ্যাকাসে হয়ে গেল। দার্শনিক এগিয়ে এল। মেয়েটির হাত সে ধরতে চাইল, এমন সময় মুহূর্ত দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেল।
