‘আপনার পরামর্শ আমার লাগবে না। ধন্যবাদ।’
‘তবু যদি কখনো দরকার মনে করেন– আমি ওই সামনের মোড়ে প্রতিদিন গাড়ি দাঁড় করিয়ে পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করব। পরামর্শ দেয়ার ব্যাপারে আমি ধৈর্যধারণ করতে অভ্যস্ত।’
সেই মেয়ে দুই হাতে দুই কান চেপে ধরে বলল, ‘না না-আপনার পরামর্শ আমি চাই না।’
‘কে ভদ্রলোক?’ সে মেয়েটিকে জিগ্যেস করল।
‘পথচারী।‘
মনে হচ্ছে ওঁর এখনো হলুদ পাহাড় দেখার ভাগ্য হয়নি।’
‘চলুন, সবুজ বাতি জ্বলেছে।’
‘বাবা, হলুদ পাহাড়ের ওদিকে কী আছে?’ সে হঠাৎ জিগ্যেস করল।
‘সে রহস্য আমার জানা নেই, মা।’
‘সেদিন তুমি বলছিলে, তুমি কালের প্রহরী?’
‘হ্যাঁ, আমি কালের প্রহরী। প্রত্যেক মানুষই কালের প্রহরী। কিন্তু যদ্দিন-না ধ্বনির পর্বত থেকে তার ‘দ্বিতীয় সত্তা’র ডাক আসে, সে তার রহস্য জানতে পারে না।‘
‘দ্বিতীয় সত্তাটা কী, বাবা?’
‘আমি তা জানতে পারিনি।’
‘কেউ কি জানতে পেরেছে?’
‘শোনা যায়, ইয়েমেনের এক শাহ্জাদা হাতেম পেরেছে। ধ্বনির পর্বতের খোঁজে তার পাদদেশে গিয়ে পৌঁছালে সে তার এই দ্বিতীয় সত্তা পেয়েছিল। কাহিনীতে এইরকম বলা হয়েছে : মোটকথা, সেই শহরে হাতেমের ছ’মাস কেটে গেল। আর সেই সময়ের মধ্যে ওইরকম পনেরো জন মানুষ ওই পাহাড়ের দিকে গেল, তারপর আর ফিরল না। ঘটনাক্রমে হাতেম নামে এক ব্যক্তি সেখানে ছিল। হাতেমের সঙ্গে তার খুব বন্ধুত্ব ছিল আর তাদের মধ্যে গভীর প্রীতির সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সেই কারণে তারা দুজন চব্বিশ ঘণ্টা এক জায়গায় থাকত।’
‘তারপর?’
‘যে হাতেমের দ্বিতীয় সত্তা ছিল, ধ্বনির পর্বত থেকে তার ডাক এল। সে চূড়ার দিকে ছুটল। তখন হাতেম ভাবল, সে-ও ওইদিকে চলে যাবে। সে মনে মনে বলল, দুঃখের বিষয়, ওর সঙ্গে আমার খুব বেশি ভালোবাসা আর ঘনিষ্ঠতা হয়েছে। এখন সে-ও ছেড়ে যাচ্ছে। না, আমি ওকে কিছুতেই ছাড়ব না। এইকথা বলে সে কষে কোমর বাঁধল। এবং তার হাত ধরে পাহাড়ের দিকে ছুটল। পড়ি-মরি করে দুজনে পাহাড়ের উপর গিয়ে পৌঁছাল।’
তার বাবা থেমে তার দিকে নজর ফেলল। অসুস্থ মেয়ের দুটি চোখের পক্ষ্ম বিস্ময়ের ঝিলে ডুবে ডুবে কাঁপছিল।
‘তারপর কী হল?’ মেয়ে জিগ্যেস করল।
বুড়ো বাপের কানে তার গলা বড় রহস্যময় ঠেকল। সেই আওয়াজ যেন অজানা যাত্রায় পা রেখেছে এমন কোনো যাত্রীর আওয়াজ– যার চোখের সামনে কোনো বিস্ময়কর জগতের একটি জানালা একটু উন্মুক্ত হয়ে গেছে।
‘যেই সেই দুর্গের কাছে গেছে, একটি ছোট দরজা দেখা গেল, এরা দুজন পড়ি-মরি করে তার ভেতর ঢুকে পড়ল। মানুষের চোখের সামনে থেকে তারা অদৃশ্য হয়ে গেল। কিছুদূর গেলে পাওয়া গেল নিঝুমপুরী। একটা সবুজ প্রান্তর দেখা গেল– যেন পান্নার চাদর চারদিকে বিছানো রয়েছে। কিন্তু অল্প একটু জায়গা খালি পড়ে ছিল। সেই যুবক সেখানে পা রাখতে গেল। পা রাখতেই জমি ধসে পড়ল, মাটি ফাঁক হয়ে গেল। সে তাতে তলিয়ে গেল। অমনি সেই স্থানটুকুও সবুজ হয়ে উঠল।’
‘হাতেমের দ্বিতীয় সত্তার যখন সবুজ প্রান্তরে ঠাঁই হয়ে গেল, তখন হাতেমের কী হল?’ মেয়ে জিগ্যেস করল। তখন তার আওয়াজে জীবনের দর্শনের আকাশ থেকে অবতীর্ণ একটি আলোকবিন্দু কাঁপছিল।
বৃদ্ধ বাবা বলল, ‘হাতেম সেখান থেকে যাত্রা শুরু করে এক বিরাট সমুচ্চ পর্বতের পাদদেশে গিয়ে পৌঁছাল। সেখানে সে যে-পাথরই ওঠাল, দেখল, রক্ত। বারো দিন পর সেই পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে পৌঁছাল। হাতের কাছে একটা মাঠ দেখা গেল। সেখানে মাটি আর জীব-জন্তু-পাখি কলহ, বিবাদ আর খুনোখুনি করে রক্ত ঝরাচ্ছে। বারো মাইল আরো গিয়ে দেখতে পেল এক রক্তের নদী। বড় দুশ্চিন্তা হল, সেই নদী সে কেমন করে পার হবে।’
নদীটা কি সে পার হতে পেরেছিল?’
‘আসল কথা, দ্বিতীয় সত্তার নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হয়ে মানুষ আবার হলুদ পাহাড়ের দিকে ফিরে আসে, সেখানে দিগন্তবিস্তৃত সমতল মাঠ রয়েছে, রক্তের নদীতে ঢেউ উঠছে-পড়ছে, যেখানে পথের দিশা খুঁজে পাওয়া যায় না, যেখানে পানির বা খাদ্যের কোনো চিহ্ন নেই, এমন একটা গাছও নেই যার ছায়ায় মানুষ দুদণ্ড বিশ্রাম নিতে পারে।
মেয়ের ফ্যাকাসে মুখে আশার যে-আলোটুকু মিটমিট করে জ্বলে উঠেছিল, তা আবার নিভে গেল।
মা, যখন ধ্বনির পর্বত থেকে ডাক আসবে, তখন আমি সবুজ প্রান্তরের আকাঙ্ক্ষার পাহাড়ের চূড়া অতিক্রম করে যাব। তারপর সেই রহস্য আমার সঙ্গে সমাহিত হয়ে যাবে। কারণ, সে সময় আমি আর আমি থাকব না। অবশ্য আমি হলুদ পাহাড়ের ওপারের রহস্য পুরোপুরি জেনে যাব।’
‘ওপারের রহস্য কী, বাবা?’
‘ওপারে রয়েছে যন্ত্রের ঘড়ঘড়, ঘামের গন্ধ, অসুস্থ মানুষের ক্ষতের পূতিগন্ধ, গলিত দেহ আর বিক্ষিপ্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, বাসি ঠোঁট আর মথিত ফুল, পোকায়-খাওয়া লাশ…’
‘বাবা–।’ সে হাতে হাত জড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠল।
‘আমি একটা পাষণ্ড। হলুদ পাহাড়ের রহস্য কেন তোকে জানালাম আমি। আমার পোকায়-খাওয়া বার্ধক্যের কেন করুণা হল না তারুণ্যের ওপর। আমি এ কী করলাম, কালের প্রহরী হয়ে ধ্বনির পর্বতের রহস্যের যবনিকা আমি কেন তুললাম? সেই অজানা গন্তব্যের দিকে প্রত্যেকেরই তো আপন আপন বোধি অনুসারে নিজে নিজেই এগিয়ে যাওয়া উচিত।’
