তারা দুজনে পাশাপাশি চৌরাস্তা পার হয়ে গেল। যে বিন্দুতে তাদের পথ আলাদা হচ্ছিল, সেখানে সে জিগ্যেস করতে চাইল, ‘আপনিও কি হলুদ পাহাড়ের আওয়াজ শুনতে পান? হলুদ পাহাড়ের রহস্য কি আপনার জানা?’ কিন্তু সে ভাবল, ওই রহস্য আমার নিজে নিজে জানা দরকার।
মেয়েটি নীরবে নিজের পথে চলে গেল।
‘মেয়েটা কে হে?’
‘আমি তো জানি না।’
ফুটপাত ধরে যখন হাঁটে, কারও দিকে তাকায় না।’
‘কেমন অসুস্থ অসুস্থ মনে হয়।’
‘অসুস্থের ওই রূপ আমায় বড় টানে। ওর বড় বড় চোখ কেমন উদাস, তাই না? ওইখানেই তো ওর আকর্ষণের রহস্য হে।’
‘তাহলে যাও, ওর পিছু নাও। অফিসে পৌঁছাতে ওর নিশ্চয় কখনো দেরি হয়, কিংবা ঘরে ফেরার তাড়া থাকে। গাড়িতে লিফটের অফার দিয়ে দেখ।’
‘না, ও ভড়কে যাবে। কোনো কারখানায় বোধহয় ও টাইপিস্ট হবে। খোঁজ কখনো-না কখনো পেয়ে যাবই। আচ্ছা, ওর সঙ্গে আর একজন লোক কে ছিল বটে?’
‘কেন, কালকের সেই দার্শনিক? চিনতে পারেননি?’
‘ঠিক ট্রাফিক-দুর্ঘটনায় পড়বে একদিন, দেখে নিও।’
‘তাতে আপনার কী?’
‘হ্যাঁ, আমার কী?’
.
‘মা, জেগে আছিস?’
‘হ্যাঁ, বাবা।’
‘আমাকে আজ ছাদে নিয়ে যাবি, মা?’
‘তুমি যে অসুস্থ, বাবা। অতগুলো সিঁড়ি ভেঙে তুমি ক্লান্ত হয়ে পড়বে।’
‘কতকাল আমি ধ্বনির পর্বতকে সূর্যের আলোয় জন্ম নিতে দেখিনি।’
‘ধ্বনির পর্বত?’ তার ভরা পেয়ালার মতো দুই চোখ। সেখানে অসুস্থতার পিঙ্গল আলো ঝলমল করছে। বিস্ময়ে সেই চোখ বিস্ফারিত হল।
‘ধ্বনির পর্বত হচ্ছে সেই পর্বত, যার দুর্গের সব দেওয়াল আকাশে গিয়ে ঠেকে রয়েছে। সেখান থেকে আপনাআপনি আওয়াজ আসে। কেউ কেউ তাকে ‘দিনের হলুদ পাহাড়’ বলে। আমি কালের প্রহরী, তবু এখনো তার রহস্যভেদ করতে পারিনি।’
‘বাবা, তুমি আজ এসব কেমনধারা কথা বলছ?’
‘হলুদ পাহাড় থেকে মাঝে মাঝে কারও কারও ডাক আসে। সেই ডাকের আওয়াজ শুনতে পায় সবাই। কিন্তু আমরা তার সঙ্গে যেতে পারি না। সে একলা ওই পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে অদৃশ্য হয়ে যায়। ওপারের অবস্থা কারও জানা নেই, মা। আমায় ছাদে নিয়ে যাবি? হয়তো কালের এই প্রহরীর কাছে আজকেই ধ্বনির পর্বত থেকে ডাক এসে যাবে।’
অসুস্থ যৌবন বার্ধক্যের হাত ধরল। কেননা সেই তার একমাত্র অবলম্বন। অসুস্থ দুই চোখের পক্ষ্ম শিশিরে টইটম্বুর ছিল। ছাদের উপর প্রত্যূষের ঝাপসা আলো। পূর্বাচলের আঁচল কেঁপে উঠল। একটি অগ্নিশর নিক্ষিপ্ত হল, আর পূর্বাচলের আঁচলে আগুন লেগে গেল। তখন সূর্যোদয় হল। বার্ধক্যের ঠোঁট কেঁপে উঠল, ‘আমায় নিচে নিয়ে চল্, মা। এখনো আমার ডাক আসেনি।
অসুস্থ যৌবন বার্ধক্যের হাত ধরে তাকে নিচে নামিয়ে আনল।
‘মা, তুমি যখন সন্ধ্যায় ফেরো, ক্লান্তিতে একেবারে ভেঙে পড়, সেই অবস্থায় আবার তোমায় রাঁধতে যেতে হয়। ছোট ভাইগুলোর দেখাশুনো করতে হয়। তোমার মাইনের পয়সায় দু’বেলা দু’মুঠো জুটে যায় অনেক কষ্টে। বুড়োর বোঝা আর কতকাল বইবি, মা। আমাকে আমার হাতে ছেড়ে দে। নিজের মাইনের অর্ধেকের বেশি যা তুই আমার রোগ-ব্যাধি বার্ধক্যের পেছনে ঢালিস তা নিজের জন্যে খরচ কর।’
‘না বাবা।’
.
‘আপনি আবার থেমে পড়েছিলেন?’ সে জিগ্যেস করল।
‘হ্যাঁ, বড্ড বেশি ভিড়। ভাবলাম, ভিড় কমে যাক, তখন চৌরাস্তা পার হব।’
‘ধ্বনির পর্বত থেকে যে আওয়াজ আসে, আপনিও তা শুনেছেন?’
‘ধ্বনির পর্বত?’ সেই মেয়ে অবাক হয়ে তাকে দেখতে লাগল।
‘হ্যাঁ, দিনের হলুদ পাহাড়। সেই পাহাড় এখনি দিগন্তের কিনারায় মাথা তুলেছিল।’
‘দিনের হলুদ পাহাড়?’ মেয়েটি অবাক হয়ে আবার জিগ্যেস করল।
‘আমি ঠিক মুহূর্তটিতে তাকে প্রত্যেকদিন মাথা তুলতে দেখি।’
‘আপনি সেই আওয়াজ শুনেছেন?’
‘আমি প্রত্যেকদিন সেই আওয়াজ শুনি। প্রত্যেকে শোনে। সবাই ভাবে, সেই আওয়াজ তাকেই ডাকছে। এইজন্যেই তো গোটা ভিড় তার দিকে ছুটে যায়। কে জানে, এত বড় শহরে সেই আওয়াজ এখন কাকে ডেকেছিল, আর কে তারা চূড়ায় পৌঁছে অন্য পারে চলে গিয়েছে। ভিড় ওই পাহাড়ের নিচে গিয়ে দাঁড়ালেই পাহাড় চোখের সামনে থেকে মিলিয়ে যায়।’
‘আর আপনি?’
‘আমি যখনি আওয়াজ শুনি, লাল বাতি আমার পথরোধ করে। দেখতে দেখতে একদিন আমি আর লাল বাতির তোয়াক্কা করব না। ওপারের ডাক ধীরে ধীরে আমার রক্তে ইচ্ছার আগুন জ্বালছে।’
‘কই, আমি তো ও-পাহাড় দেখতে পাই না। ‘
‘আপনি তাকে প্রত্যেক দিন দেখেন, কিন্তু আপনার চোখের সামনে তা অদৃশ্য থাকে।’
‘আপনার কথা বুঝতে পারলাম না তো।’
‘আগে আমিও বুঝিনি। একটি মুহূর্ত দুই ধারায় ভাগ হয়ে যায়। একটি ধারা ধ্বনির পর্বতের উলটো দিকে চলে যায়, অন্য ধারা তার নিচের দিকে বয়ে যায়। সেই মুহূর্ত যখন আসবে, তখন…’
একটি গাড়ি তাদের কাছে এসে ফুটপাতের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়ল।
‘মহিলা, আপনি এ কোন দার্শনিকের পাল্লায় পড়েছেন?’ একটি অতিরিক্ত ভদ্র আওয়াজ শোনা গেল।
‘আপনি কে?’ মেয়েটি প্রশ্ন করল।
‘আমি পথচারী। ওই দার্শনিককে রোজ ফুটপাতে দেখি। মানুষকে ও পথভ্রষ্ট করে।’
‘আমাকে আমার পথে চলতে দিন। ধন্যবাদ।’
‘আমি দেখতে পাচ্ছি, আপনি অসুস্থ। তবু আপনি বাধ্য হয়ে কাজে যান। আপনার আঙুল দেখে মনে হয়, আপনি টাইপ করেন। টাইপ করলে বুকে দোষ হয়। এমনিতে আপনি ভালো খাদ্যের অভাবে রক্তাল্পতায় ভুগছেন। আমার পরামর্শ… ‘
