‘হ্যাঁ, হল।’
চিঠি শেষ করে আমি ওর হাতে দিয়ে দিলাম। সে উঠে দাঁড়িয়ে চলতে শুরু করল। দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে আবার জিগ্যেস করল, ‘শহরে আজ এত ঝাণ্ডা কেন ঝোলানো হয়েছে, বাবুজি?’
‘ও, তুমি জান না? শেখ খয়রুদ্দিন মরহুমের আজ জন্মদিন যে।’
‘সত্যি? শেখ খয়রুদ্দিন? আমি তেনাকে দেখেছি। তিনি খুব জবর লোক ছিলেন। পাহাতুন তেনার কাপড় ধুত।’
মেহেরুন চলে গেল। আমি বক্তৃতা শেষ করার জন্য আবার কাগজের উপর ঝুঁকে পড়লাম। কিন্তু আমি তখন চোখে কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। আমার চোখের সামনে পাহাতুনের বুড়ো মুখটা ভাসতে লাগল। মনে হল যেন তার ওই মুখের উপর শত শতাব্দীর স্বার্থহীন সেবার ধুলো জমা হয়ে আছে। সেই ধুলোর আস্তরণের ভেতর থেকে তার বোবা চোখ আমাকে কী-যেন প্রশ্ন করছে। আর, আমার মগজের ভেতর মেহেরুনের কথাগুলো ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে : ‘খায়রুদ্দিন খুব জবর লোক ছিলেন! পাহাতুন তেনার কাপড় ধুতো।
অনুবাদ : নেয়ামাল বাসির
হলুদ পাহাড় – গোলামুস্ সাক্লাইন নাক্বি
চৌরাস্তায় এসে পৌঁছাতেই মুহূর্তটা দুই ধারায় ভাগ হয়ে গেল।
দুই ধারা একে অন্যের উল্টো দিকে বইতে লাগল। সৃষ্টির প্রথমদিন থেকে যে-ছবি তার মননের দিগন্তে অঙ্কিত ছিল, সেটা হঠাৎ আলাদা হয়ে গেল এবং হলুদ পাহাড়ে পরিণত হল। একটা ধারা হলুদ পাহাড় থেকে দূরে সরতে লাগল। দ্বিতীয় ধারা তাকে হলুদ পাহাড়ের দিকে টানতে লাগল। আর, ভিড় চৌরাস্তার উপর থমকে দাঁড়িয়েছিল। কেননা সামনে তার পথ আগলে ছিল লাল বাতি।
অকস্মাৎ হলুদ পাহাড়ের চূড়া থেকে আওয়াজ ভেসে এল, ভ্ৰাতঃ! ভ্রাতঃ!’
রাস্তার ওপারে দীর্ঘ বাঁশি বেজে উঠল। সবুজ বাতি জ্বলে উঠল এবং ভিড় বিষম চঞ্চলতায় চৌরাস্তা পার হতে লাগল। তখন দুই ধারা হঠাৎ মিশে গেল। হলুদ পাহাড় তখন চোখের সামনে থেকে মিলিয়ে গেল। তখন রোদ-মগ্ন হলুদ সব পাথর ছাড়া আর কিছুই দেখা গেল না।
‘দেখতে পাচ্ছেন না, লাল বাতি জ্বলে গেছে?’
এই সতর্কবাণী শুনে সে ঠিক চৌরাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ল। সে পিটপিট করে রাস্তার ওপারের দৃশ্য দেখল। উঁচু উঁচু বিস্ময়কর সব অট্টালিকা ভিড়কে গ্রাস করে দাঁড়িয়ে ছিল। যন্ত্রের ঘূর্ণমান চাকার ঘড়ঘড় শব্দ তার কানে এসে লাগলে সে বলল, ‘যদি আমি চৌরাস্তা পার না-হই, তাহলে ফটক বন্ধ হয়ে যাবে– আমি বাইরে রয়ে যাব।’
‘যখন সবুজ সঙ্কেত হল, আপনি ফুটপাতে দাঁড়িয়ে রইলেন, আর লাল সঙ্কেতে চৌরাস্তা পার হতে চাইলেন। আপনার প্রাণের মায়া যদি না-ও থাকে, তবু ট্রাফিক মেনে চলুন।
‘পাগল-টাগল হবে।
‘চেহারা দেখে তো তা মনে হয় না। ‘
‘যখন সবুজ বাতি হল, ও আমার কাছে দাঁড়িয়েছিল।’
‘তারপর কী হল?’
‘হবে আর কী? দেখি, চোখ দিয়ে আকাশ হাতড়ে বেড়াচ্ছে। মনে হয়, দেখা যায় না এমন কিছু ও দেখছিল।’
‘বুঝি সারারাত জেগে কাটিয়েছে। এখন ঠিক চৌরাস্তার উপর ঘুম পেয়ে থাকবে।’
‘না, ও জেগেই ছিল। ওর চোখ খোলা ছিল। ওর চোখ দূর দিগন্তে আটকে ছিল। ও সবকিছুই দেখছিল। অন্তত আমি এইটুকু বলতে পারি, তার দেহখানা এই দুনিয়াতেই ছিল।’
‘কিন্তু তার আত্মা এই দুনিয়ায় ছিল না।’
.
সে একটা রোগা-পটকা মেয়ে। চৌরাস্তার এই দিকে এই ফুটপাতে তাকে প্রায়ই দেখা যায়। ভিড়ের মধ্যে তাকে একটু স্বতন্ত্র বলে মনে হয়। মাথা হেলিয়ে সে দাঁড়িয়ে থাকে। তার হাতে একটা ছোট ব্রিফকেস্। ভিড়ের প্রত্যেকটা মানুষ তাকে একনজর অবশ্যই দেখে নেয়। সেইসব নজর থেকে সে এমনভাবে গা-বাঁচিয়ে চলে, যেন সেগুলো বিষ-মাখানো তীর। কিন্তু যারা তাকে দেখে, তাদের না-দেখেও উপায় নেই। তার ফ্যাকাসে অসুস্থ চেহারায় এমন একটা ভাব ফুটে থাকে যে, তা প্রত্যেক দৃষ্টিকেই তার দিকে টানে। তার চেহারা হাজারটা থেকে স্বতন্ত্র। আর, চেহারার ভিড়ে এমন চেহারাও মাঝে মাঝে দেখা যায়, যা সন্ধানী চোখদের নিজের দিকে আকর্ষণ না-করে পারে না।
তারপর, আর একদিন যখন মুহূর্তের ধারা দু’ভাগে ভাগ হতে যাচ্ছিল, সেই সময় সে তার কাছে এসে থেমে গেল। চৌরাস্তার মাথায় ভিড় অস্থিরভাবে দাঁড়িয়ে ছিল। মুহূর্ত দুভাগে ভাগ হয়ে গেল। হলুদ পাহাড় প্রকৃতির বুক চিরে বেরিয়ে এল। তার মাথা আকাশে গিয়ে ঠেকল।
তা করতে করতে সেই পাহাড়ের দিক থেকে আওয়াজ ভেসে এল, ‘ভ্ৰাতঃ! ভ্ৰাতঃ!’ প্রত্যেকে ভাবল, ‘ধ্বনির পর্বত’ থেকে তার ডাক এসেছে। চৌরাস্তার সবুজ বাতি জ্বলে উঠলে হলুদ পাহাড়ের গগনস্পর্শী চূড়ার দিকে সবাই রুদ্ধশ্বাসে ছুটতে লাগল। কিন্তু তাদের পাগুলো মাটির সঙ্গেই লেগে রইল। যতক্ষণ পর্যন্ত-না ধ্বনির পর্বত থেকে ডাক আসে, কারও পা মাটি থেকে মুক্ত হতে পারে না। ভিড় চৌরাস্তা পার হতে হলুদ পাহাড় মিলিয়ে গেল। তখন মুহূর্ত শেষ হয়নি, খুট্ করে লাল বাতি জ্বলে উঠল। সে চলার জন্য পা ফেলতেই ফ্যাকাসে চেহারার অসুস্থ মেয়েটি বলল, ‘দাঁড়ান।
সে দাঁড়িয়ে পড়ল।
‘মাফ করবেন। এক্ষুনি সবুজ বাতি জ্বলবে। তখন আমরা দুজনে চৌরাস্তা পার হব।’ সেই মেয়ে নত চোখ তুলে তার চেহারার ওপর বুলিয়ে নিল |
তার দুই চোখ ছিল অসুস্থ আর ঘুমে ঢুলু-ঢুলু। কিন্তু তা থেকে সহমর্মিতা আর করুণার যে ধারাবর্ষণ হচ্ছিল, তাতে তার অন্তর ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার, পবিত্র হয়ে উঠেছিল।
