‘তারা বলল, ‘যদি-না ছাড় তো আমরা তোমাকে একঘরে করব।’
‘পাহাতুন তেমনি মুখের ওপর জবাব করল, ‘যা খুশি কর। আমি যখন ওকে বুকে তুলে নিয়েছি, তখন আমার মরণই শুধু ওকে আলাদা করতে পারে।’
মেহেরুনের গলায় তখন উত্তেজনা। এমনভাবে সে বর্ণনা দিচ্ছিল, যেন মনে হচ্ছিল, মঞ্চে সে পাহাতুনের চরিত্রে অভিনয় করছে।
‘তাহলে পাড়া-পড়শি তাকে একঘরে করল?’
‘হ্যাঁ, বাবুজি। আর শেষ পর্যন্ত মওলা বখ্শও তার বিবির খেলাপ হয়ে গেল। পাহাতুনের দুই ছেলে তো আগেই খেমটাউলিকে দেখতে না-পেরে মামা-বাড়ি চলে গিয়েছিল। তারা সেখানেই কাজ-কাম করছিল। আমি যখন দেখলাম পাহাতুন তার জেদের জন্যে বড় লোকান করছে নিজের, তখন একদিন তাকে বললাম, ‘পাহাতুন, তুমি মেয়েটাকে পাঠিয়েই দাও। ওটাকে কাছে রেখে কী ফায়দা বল। সব লোক তোমার শত্রুর হয়ে গেল।’
‘তাই শুনে সে বলল, ‘না রে বউ, তা হয় না। আমি ওর মাকে কড়ার করেছি ওকে বুকে করে রাখব। তাইলে বল্, তাকে কী করে পাঠাই? লোকে শত্তুর হচ্ছে তো হোক– হাজার বার হোক। কাউকে যখন ঠাঁই দিয়েছি, তখন আর লোকের কথায় ডরানো চলে?’
আমি বললাম, ‘তোমার নিজের ছেলেরাও তো তোমার শত্তুর হয়েছে।
‘পাহাতুনের চোখে পানি ভরে এল। সে বলল, ‘লোকে বলে, ছেলে মা-বাপের ডান হাত। কিন্তু আমার ছেলেরা! যাকগে, আল্লা তাদের ভালো করবেন। তারা যা-খুশি তাই করুক। তাদের আমি ডরাই না। আল্লা, যদি বুকে বল দেয় আমার কোনো কাম আটকাবে না।’
‘আর পাহাতুন তার নিজের কাজ-কাম করে যেতে লাগল। আয়েশা বাড়তে লাগল। পাহাতুন দিন-রাত খেটে তার বিয়ের যৌতুক জমা করতে লাগল– তাতে সে তার সব পুঁজি ঢেলে দিল। আয়েশার বিয়ে হয়ে গেলে পাহাতুন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। তার ফরজ সে পুরা করেছে। কিন্তু বাবুজি, আসলে আল্লার ইচ্ছা অন্যরকম। আয়েশার বিয়ে হয়েছিল গুজরাতে। আয়েশার শ্বশুরকে গিয়ে সেখানে কেউ বলে বলে দেয়, আয়েশা খেমটাউলির বেটি। ব্যস্, আর যায় কোথা! শ্বশুরবাড়ির লোকে তাকে মেরেধরে পাহাতুনের বাড়ি পাঠিয়ে দিল। তারপর তালাকের কাগজও পাঠিয়ে দিল। আয়েশা এদিকে তালাক নিয়ে বাড়ি ঢুকল, আর ওদিকে মওলা বখ্শ রক্ত তুলতে লাগল। পাহাতুনের বিপদের ওপর বিপদ। আর কেউ হলে, তো পাগলই হয়ে যেত। কিন্তু পাহাতুন দমবার লোক নয়। একা নুলো শাশুড়ির খেমত করতে লাগল, সোয়ামির অসুখের খরচ চালাতে লাগল, আবার মানুষের কাপড়ও সমান ধুয়ে চলল।
‘পাহাতুনের এক সম্পর্কের ভাইপো ছিল– নাম তার তাজু। মস্ত একটা বাউণ্ডুলে। পাহাতুন তাকে নিজের কাছে এনে রাখল। সেই ছেলে তাকে কাজে-কামে সাহায্য করত। তারপর যখন পাহাতুন দেখল, তাজু ভালো হয়ে গেছে, তার সঙ্গে আয়েশার নিকাহ পড়িয়ে দিল। আল্লা আল্লা করে তার ঘাড় থেকে ওই বোঝা নামল। বাবুজি, তারপর হল কী, মওলা বখ্শ দুই বছর রোগে ভুগে মারা গেল। ক’দিন পর পাহাতুনের নুলো শাশুড়িও চলে গেল। বুড়ি পাহাতুনের বিয়ের পর পুরো এক কুড়ি দশ আর দু’বছর বেঁচে ছিল। এক কুড়ি দশ আর দুই, এই এত বছর পাহাতুন তার খেজ্জ্মত করেছে।
‘একদিন রাত্রে পাহাতুন কাপড় ইস্তিরি করছিল। আল্লা জানে, কী করে ইস্তিরি থেকে আগুন বেরিয়ে তার কাপড়ে পড়ে। তাতে বেচারির হাঁটু পুড়ে যায়। সকাল পর্যন্ত সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিল। সকালবেলা আয়েশা তাকে ওই অবস্থায় দেখে নিজের মাথায় বাড়ি মারতে লাগল। আমরা ছুটে গিয়ে সবাই তাকে চারপাইয়ে তুলে শুইয়ে দিলাম ডাক্তার ডাকলাম। তার জ্ঞান ফিরে এল। কিন্তু আগের সেই পাহাতুন আর রইল না। বেচারি চারপাই থেকে নামতেই পারত না। মঙ্গলবারের রাতের কথা। পাহাতুন নিচে শুয়ে, আর ছাদের উপরে আয়েশা, তাজু, আর তাদের ছেলে। মাঝরাতে ছেলেটা কাঁদতে লাগল। আল্লা জানে, কেন সে অত কাঁদছিল। আয়েশার হল গিয়ে জোয়ান মানুষের ঘুম। সে বেঘোরে ঘুমোচ্ছিল। পাহাতুন আর থাকতে পারল না। পেখম ডাকাডাকি করল। তাতেও ছেলের কাঁদা থামল না দেখে সে উপরে গেল। আল্লা জানে, কী করে সে উপরে উঠল আর কী করেই-বা ছেলেকে কোলে নিল। আর আয়েশার ঘুম ভাঙাল। আয়েশা খুব রাগ করল। বলল, ‘মা, তোর মরার সাধ হয়েছে!’
‘সেই কথা তার সত্য হল। পাহাতুনের ঠাণ্ডা লেগে গেল। তারপর বৃহস্পতিবারের সন্ধেবেলা সে মরে গেল। সারাজীবন মানুষের খেমত করে আর উপকার করে শেষে মরেই গেল।’
মেহেরুনের গলা বুজে আসে। তার চোখে দুঃখের ছায়া। ওড়নার খুঁটে নাক মুছতে মুছতে সে অন্যদিকে মুখ ফেরাল।
আমি ভাবতে থাকি : পাহাতুন– মা মরে গেছে। এ হল সেই পাতাতুন-মা, যে বত্রিশ বছর নুলো শাশুড়ির সেবা করেছে। নিজের সতিনকে এমন সময় ঠাঁই দিয়েছে, যখন তার নিজের লোকে তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়ে তাকে পাথারে ভাসিয়েছে। সেই সতিনের মেয়ে যখন মায়ের বুকের দুধ থেকে চিরতরে বঞ্চিত হয়েছে, তখন তাকে নিজের বুকে তুলে নিয়েছে। দুবছর ধরে অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসার ব্যয় বহন করেছে। এ হল সেই পাহাতুন-মা, সে পঞ্চাশ বছর এই পাড়ায় ছিল, কিন্তু তার সম্পর্কে আমি শুধু এইটুকুই জানতাম যে, সে একজন ধোপানি আর খুব ঝগড়াটে মেয়েলোক।
মেহেরুন ছলছল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বাবুজি, তাইলে লিখে দাও চিঠি।’ আমি কাগজ নিয়ে লেখার জন্য প্রস্তুত হলাম। মেহেরুন চোখ বন্ধ করে ডান হাতের আঙুল দিয়ে চোখ দুটো টিপে ধরল। তার চোখের নিচের উঁচু গালের হাড় সিক্ত হয়ে উঠল। মেহেরুন তর্জনী ঘষে ভেজা গাল শুকিয়ে নিল। তারপর গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘চিঠি লেখা হল বাবুজি?’
