সুতরাং যে-রাগ নিয়ে গিয়েছিলাম, সেই রাগ নিয়েই ফিরে আসতে হল আমাকে। কোনো লাভ হল না। লাভের মধ্যে আমার আরো খানিক মূল্যবান সময় নষ্ট হল।
মহামারি আকারে কত রানীক্ষেত এল, কত মুরগি কুকুরে খেয়ে ফেলল, কত লোপাট করল প্রতিবেশীরা, কিন্তু মুরগির যে বীজ একদিন আমার সেই সদাশয় আত্মীয় বপন করে দিয়ে গিয়েছিলেন, তার গাছ, ডাল-পালা, শাখা-প্রশাখা, পত্র, পল্লব, পুষ্প যেন অমর। এ বংশ কিছুতেই ধ্বংস করা গেল না।
অনুবাদ : নেয়ামাল বাসির
বোবা চোখ – মির্জা আদিব
সেদিন সারা শহর শেখ খয়রুদ্দিন মরহুমের জন্মবার্ষিকী পালন করছিল।
এই দিনটি উদ্যাপনের জন্য গত ক’সপ্তাহ ধরে খুব তোড়জোড় প্রস্তুতি চলছে। যেমন : বিভিন্ন খবরের কাগজের বিশেষ সংখ্যা ছাপা হচ্ছে। পত্র-পত্রিকায় মরহুমের চিত্রাবলি মুদ্রিত হচ্ছে। এবং রবিবার সন্ধ্যায় পৌরসভার মেয়রের সভাপতিত্বে টাউন-হলে এক বিরাট সাধারণ সভাও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ওই সভায় শহরের ক’জন প্রখ্যাত অনন্য পুরুষ মরহুমের বরেণ্য জীবনের ঘটনাবলির ওপর আলোকপাত করছেন। এই সূত্রে আমাকেও অন্যতম বক্তা নির্বাচিত করা হয়েছে। মরহুমের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত জানাশুনো ছিল। তাছাড়া, সংবাদপত্র, পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধাদি অধ্যয়ন করার পর আমার হাতে এত বেশি উপকরণ জমা হয়ে গিয়েছে যে, ওঁর সম্পর্কে একটা কেন, কম-সে-কম দশটা লম্বা-চওড়া বক্তৃতা তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু আমি চাইছিলাম, যাই লিখি-না কেন, মরহুমের জীবনের একটি বিশেষ দিককে নিয়েই শুধু লিখব। আর, তার জন্য আমি যে বিষয় নির্বাচন করেছি, তা হচ্ছে : শেখ খয়রুদ্দিন মরহুমের কাছে জনগণের ঋণ। আমার চোখের সামনে উপকরণ ছড়িয়ে পড়ে ছিল– আমার কলম দ্রুতগতিতে সেগুলোকে গুছিয়ে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছে–
এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, শেখ সাহেব মরহুম শহরের বিখ্যাত ধনবানদের একজন ছিলেন। পৈতৃক ওয়ারিশান সূত্রে তিনি প্রচুর সম্পত্তি লাভ করেছিলেন। তাছাড়া নিজের ব্যক্তিগত চেষ্টায়ও তিনি তাঁর দৌলতের অনেক বৃদ্ধি ঘটিয়েছিলেন। কিন্তু যে বিষয়টি আমাদের দেখা দরকার, সেটি হচ্ছে এই যে, তাঁর মরহুম ধন-দৌলত কোথায় কীভাবে খরচ করেছেন এবং মরহুমের হাতে তাঁর পুঁজির আর কত অবশিষ্ট ছিল। শেখ সাহেব ছিলেন নিরাশ্রয়ের আশ্রয় আর পিতৃহীন-মাতৃহীনের ভরসা। সারাজীবন তিনি আল্লার সৃষ্ট জীবের সেবা করে গেছেন। তিনি তাঁর আয়ের একটা বিশেষ অংশ জনকল্যাণের জন্য আলাদা করে রাখতেন। কবিবর জওক্ বলেছেন :
বরণীয় নাম : তিনি কল্যাণের হইলেন হেতু।
কূপ হইল, মসজিদ হইল, হইল পুষ্করিণী, সেতু।।
‘মরহুম এই কবিতার জীবন্ত প্রতীক। আজ কে না জানে ‘খয়রুদ্দিন হাসপাতালে’র নাম। এই হাসপাতালে প্রতিদিন বহু রোগীর চিকিৎসা হচ্ছে, আর বেশির ভাগ রোগীকেই ওষুধ দেওয়া হচ্ছে বিনামূল্যে। মরহুম শুধু হাসপাতাল করেই ক্ষান্ত হননি, একেবারে আপন পকেট থেকে মোটা অঙ্ক ব্যয় করে একটি এতিমখানাও বানিয়ে দিয়েছেন। আজও সেই এতিমখানায় সমাজের কত নিরাশ্রয়, নিঃসম্বল শিশু প্রতিপালিত হচ্ছে। সহায়-সম্বলহীন মানুষের সহায় হওয়াই ছিল তাঁর কাজ।’
‘বাবুজী, একটা চিঠি লিখে দেবেন গো?’
আমার কলম হঠাৎ থেমে গেল। মাথা তুলে সামনে তাকালাম। মেহেরুন গোয়ালিনী ময়লা হাতে একটি খালি খাম নিয়ে চৌকাঠে দাঁড়িয়ে।
‘দেবেন চিঠি লিখে? ফুরসত আছে?’
আমি জানি, যদি আমার যাবতীয় ভাবনাগুলোকে আমি এখন গুছিয়ে না-নিই, তাহলে পরে আমার বক্তৃতার গাঁথুনি আর ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়ে যাবে; এবং লেখার যে সহজ কায়দাটিকে আমি এখন আয়ত্ত করেছি, তা আর থাকবে না। কিন্তু কী করি, রাজি না হতেও মন চাইছে না। মেহেরুন গত দশ বছর ধরে পানি না-মিশিয়ে আমাদের দুধের রোজ দিয়ে আসছে। এরজন্য তার কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই। রাজি। না-হলে এই কৃতজ্ঞতার বরখেলাপ হয়। সুতরাং মাথা নেড়ে ইশারায় তাকে ভেতরে আসতে বলি। মেহেরুন ভেতরে এসে মেঝের উপর হাত-পা ছড়িয়ে বসে পড়ল।
‘বাবুজিকে বড্ড কষ্ট দিলাম গো! লিখতে হবে আমার বোনকে, বুঝলে গো? সে থাকে পিণ্ডিতে। গ্রাম–’
‘কী লিখতে হবে আগে বাপু তাই বল। ঠিকানা পরে লিখতে হয়। একটু দাঁড়াও। কাগজ নিই আগে। হ্যাঁ, এবার বল।
লিখে দেন, বিষুদ্বার সাঁঝের বেলা পাহাতুন-মা মারা গেছে– ব্যস্, এই কথা।’
বলতে বলতে তার গলার আওয়াজ কেমন ম্লান হয়ে গেল।
‘ফাতেমাকে পাহাতুন-মা বড় ভালোবাসত। সেই যে সেবার– ফাতেমা তখন আইবুড়ো– ওর পা একটু পুড়ে গিয়েছিল, পাহাতুন সারাদিন ঘুরে ঘুরে, আল্লা জানে কোথা থেকে না-কোথা থেকে মলম নিয়ে এল। এদিকে আবার সারা শহরে সেদিন জব্বর
হরতাল।’
আমি জিগ্যেস করলাম, ‘পাহাতুন-মা– মানে সেই ধোপানি তো?’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ– ওই যে গলির শেষে থাকত। আপনার কাপড়ও হয়তো ধুতো। গোটা মহল্লার কাপড় ওই তো ধুতো।’
‘ও, তাই বল। এইজন্য পরশু ওর ঘরের সামনে লোকজন বসেছিল? তাহলে পাহাতুন মারা গেছে?
মেহেরুন প্রশংসার গলায় বলল, ‘আহা, কী যে বুকের পাটা ছিল গো ওই মেয়ের। কাজ করে কেলান্তি নাই। কে বলে মেয়েলোক? সে ছিল মেশিন গো মেশিন।
‘আর জাঁহাবাজ ঝগুড়ে মেয়ে বলেও তার খুব নামডাক ছিল, তাই না? সব সময় ঝগড়া-কাজিয়া করত। পাড়ার লোক তার থেকে দশ হাত দূরে থাকত।’
