আমি পাহাতুনের যে বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা দিলাম, তা সর্বজনবিদিত। ওটা একটা নিত্যনৈমিত্তিক আলোচনার বিষয় ছিল।
‘ঝগড়া তো সে করতই গো নিচ্চয়, আর চেঁচাচেল্লিও করত। তা, সে ঝগড়া করত আপন সোয়ামির সঙ্গে। আল্লা জানে, তার জন্যে লোকে কেন অত বদনাম করত। আমি হক্ কথাটা বলব গো তোমাকে, সে কেমন মেয়েলোক ছিল? বড্ড ভালো। হায় মা, দেখ, তোমার সময় নষ্ট হচ্ছে!’
আমি বক্তৃতার কাগজটার উপর নজর ফেললাম : ‘অসহায় সম্বলহীন লোকদের আশ্রয় দেওয়া মরহুমের কাজ ছিল।’ পরের বাক্যটা ঠিক করার জন্য বাঁ হাতের চেটোর উপর কপাল রেখে চোখ বন্ধ করে আমি ভাবতে লাগলাম।–
‘পৃথিবীতে এমন লোক খুব কমই আছেন, যাঁরা ভাঙা হৃদয় জোড়া দেন, নিপীড়িতকে ঠাঁই দেন এবং অনাথকে আশ্রয় দেন। শেখ সাহেবের খ্যাতির সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে তিনি অনাথ-পতিতের সত্যিকার বন্ধু ছিলেন।’ আমার মাথায় গোটা গোটা বাক্য যথাযথ শব্দ-পরম্পরায় এগিয়ে আসছে। কলমের খোঁজে আমি এদিক-ওদিক তাকাই। মেহেরুন মিটিমিটি চোখে আমার দিকে চেয়ে থাকে, কী যেন ভাবে। কী সে বলতে চায়? তার নীরব চোখ দুটিতে কেমন এক আবেদনের ভাষা। তাতে এক বিশেষ ইচ্ছার ঝলক। মন চাইল, তার গুটিকয় কথা শুনেই নিই। দু-দশ মিনিট যাবে তাতে। না-হয় তারপরই শেখ সাহেবের জীবনের আরো দু’চারটি ঘটনার কথা লিখে আমার ভাষণ শেষ করব। বললাম, ‘তাহলে ঝগড়াটে ছিল না তোমার পাহাতুন-মা?’
‘হ্যাঁ ছিল, নিশ্চয় ছিল– আমি বলছি, ছিল। আল্লা ভালো করুক। হ্যাঁ, আমার পুরুষের কথাই ধর-না। বিয়ের পর আমি যখন তার সংসারে এলাম, সে বলল, ‘দেখ মেহেরুন-বউ, ওই পাহাতুন থেকে কিন্তু একদম দূরে দূরে থেক। তোমাকে নিয়ে যদি কোনোদিন পড়ে, তো তোমার মাথার একটি চুলও আর বাকি রাখবে না, হ্যাঁ।’
‘আমি বললাম, ‘আমিও কিছু কম নই কারো থেকে, হুঁ। আমার সঙ্গে যদি লড়তে আসে, আমিও খোঁতা মুখ ভোঁতা করে দেব।
‘ওই কথা তো আমি বললাম বড়-মুখ করে, কিন্তু সত্যি বলতে কী, পাহাতুনের কাছে যেতে আমার খুব ডর লাগত। আমাকে বাপু ক-বার ডেকেও ছিল, কিন্তু আমি যে দূরে দূরে, সেই দূরে দূরেই রইলাম। তারপর এই ধরেন গো সেদিনের কথা– আমার পুরুষের মরা তখন একমাসও হয়নি, পাহাতুনের তার সোয়ামি মওলা বখ্শের সঙ্গে এমন কাজিয়া হল– সে আর তোমাকে কী বলব গো বাবুজি! পাহাতুন তো আসমানটাকে একেবারে মাথায় করল। সেদিন আমি একদম পাকাপাকি ঠিক করে ফেললাম, ওরা মুখোমুখি আর হওয়া নয়। জানো বাবুজী, কী নিয়ে সেই কাজিয়া? শোনো তাইলে। পাহাতুন কোথায় শুনেছে, মওলা বখ্শের কোন খেমটাউলির সঙ্গে পিরিত হয়েছে। তার ঘরে যাওয়া-আসা আছে। তাই শুনে তো পাহাতুনের সারা শরীলে-গতরে আগুন ধরে গেল। খেমটাউলিকে সে তো ভালো-মন্দ যা শোনাল, তোবা তোবা, সে আর মুখে আনার লয় গো। কিন্তু অর্ধেক রাত পর্যন্ত সে আর মহল্লার কাউকে ঘুমোতে দেয়নি।– হেই মা, দেখ দেখ, আমি তোমার সময় নষ্ট করে দিলাম কত। দেখ আমার আক্কেল, আমি পাহাতুনের কিস্সা কেমন শুরু করলাম বসে বসে।’ বলতে বলতে মেহেরুন একেবারে অস্থির হয়ে উঠল। আমি তাকে ভরসা দিয়ে বললাম, ‘না না, তুমি বল পাহাতুনের কাজিয়ার কথা।’
‘দু’দিন পর আবার কাজিয়া। মওলা বখ্শ বলল, সে খেমটাউলির ঘরে যাবেই যাবে। ব্যস্, পাহাতুন তো একেবারে যেন কতকাল না-খেয়ে থাকা একটা বাঘিনী হয়ে গেল। সেদিন তার চাচাও এসে রাগের মাথায় মওলা বখশের একটা হাত দিল ভেঙে। তারপর, বুঝি দু’তিন দিন পরের কথা, আমি আমার এক খদ্দেরকে দুধ দিচ্ছি, দেখি পাহাতুন ছোট একটা গেলাস হাতে কখন এসে কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে।’
‘পাহাতুন বলল, ‘বউ, আমাকে একটু দুধ দাও’।
‘আমি ওকে দুধ দিলাম। ভেবেছিলাম, দুধ নিয়ে চলে যাবে; কিন্তু একেবারে ধরনা দিয়ে বসে গেল, তারপর কথা শোনাতে লেগে গেল। পেখম তো বলতে লাগল, মওলা বশের খুব অসুখ, খুব কষ্ট। বেচারা সারারাত তড়পেছে। আর পাহাতুনও দু’রাত দুই চোখের পাতা এক করেনি। তারপর সে নিজের সংসারের হাল শোনাতে লাগল। বাবুজি, ওইদিন আমি বুঝতে পারলাম, পাহাতুনের মন আসলে ভালো। বাবুজি, তুমি তাকে কেমন করে মন্দ বলবে গো। তার সোয়ামি একটা খেমটাউলির সঙ্গে পিরিত চালাচ্ছে। কিন্তু তবু শরীলে জখম নিয়ে সে যখন বাড়ি ফেরে, সে সারারাত জেগে জেগে তার খেজমত করেছে। আর নুলো শাশুড়িটার তো সে সেইদিন থেকে খেজমত করছে, যেদিন তার বিয়ে হয়েছে। তাই দেখে কিন্তু আমার যা সন্দ ছিল, তা চলে গেল। আমি তার বাড়ি যাওয়া-আসা করতে লাগলাম। অসুখে পড়ে মওলা বখ্শ বলেছিল, সে আর খেমটাউলির ঘরে যাবে না। কিন্তু যেই সেরে উঠল, অমনি পাহাতুনের সোনার ক’গাছা চুড়ি চুরি করে পালাল। আর সেই চুড়ি দিল গিয়ে খেমটাউলিকে।
‘পাহাতুনের আপন লোকরা বলেছিল মওলা বখ্শকে ছেড়ে দিতে। কিন্তু তাতে সে রাজি হয়নি। বাপের বাড়ি চলে গেল। তারপর একমাস পর আবার এল। আল্লা জানে, এমন একটা বদ্ সোয়ামির ওপর তার কিসের অত টান। যদি আমি হতাম, তাইলে, জানো বাবুজি, কী করতাম? ওই লোকের ছায়া মাড়াতাম না– এই একদম সত্যি কথা কয়ে দিলাম, হ্যাঁ। আচ্ছা, তারপর একদিনের কথা। আমি আমার ঘরে বসে রুটি খাচ্ছি। কোথা থেকে একটা মেয়েলোক এসে দাঁড়াল। কয়লার মতো পায়ের রং। জবাফুলের মতো লাল চোখ। আবার গলায় মতির মালা। আমি বললাম, হায় আল্লা, এ আবার কে কোত্থেকে এল! সেই মেয়েলোক মাজা দোলাতে দোলাতে এল। তারপর আমার কাছে মোড়া টেনে নিয়ে বসে পড়ল।
