এই পাণ্ডিত্যপূর্ণ লেক্চার শুনতে হয়তো আমার বিশেষ খারাপ লাগছিল না। কিন্তু আমার নিজের মোরগের স্বভাবের ব্যাপার নিয়ে আমি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। কাজেই তাঁকে বাধা দিতে হল এবং আমার আগমনের কারণটা তাঁকে মনে পড়িয়ে দিতে হল।
বললেন, ‘দেখুন, আপনার মোরগ ঝগড়াটে মাত্র একটা কারণেই হয়ে থাকতে পারে। এই মোরগকে এঁটো মাংস খাওয়ানো হয়েছে।
সূত্র পেয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ালাম বাড়ির দিকে। গিন্নির কাছে তা ব্যক্ত করলাম। শুনে তিনি একেবারে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন। বললেন, ‘বুড়ো বয়েসে তোমার ভিমরতি ধরেছে। একটা ভালো ডাক্তারের কাছে না-গিয়ে গিয়েছিলে কোন হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে। বলি, আমরা কি এতই অপবিত্র হয়ে গেছি যে, আমাদের এঁটো খেলে মুরগির অসুখ করবে!
মুরগি পালবার আগে খুব কম লোকেই আমাকে চিনত। কারণ, বাইরে কাজে যাই, আর কাজ ফুরোলে বাসায় ফিরে লেখা-পড়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। সুতরাং স্বল্প-সংখ্যক যে কয়জন আমাকে চিনতেন, তাঁরা কোণাই-চণ্ডি হিসেবেই চিনতেন। কিন্তু মুরগি পুষবার পর থেকে আমার পরিচয় সর্বব্যাপী হয়ে গেল। এখন কোনো নতুন লোক আমার খোঁজে এলে পাড়ার বাচ্চারাও সহজে আমাকে চিনিয়ে দিতে পারে। বলে, ‘ও, মুরগি-সাহেবকে চান? ওই যে ওইখানে লাল বাড়িটার পাশে মুরগি সাহেব থাকেন।
শুধু তাই নয়– আমাদের পাড়ার কেউ যখন কোনো নিজের লোককে ঠিকানা বোঝাবার চেষ্টা করেন, তখন তা ব্যক্ত করেন এই ভাষায়, ‘ওখানে গিয়ে যে-কাউকে জিগ্যেস করবেন, মুরগি সাহেবের বাড়ি কোনটা। তারপর পশ্চিমের দুটো বাড়ি ছেড়ে ডাইনে ঘুরলেই আমাকে পাবেন। মুরগি সাহেব নামটা মনে রাখবেন কিন্তু।’
যাই হোক, ঝগড়া-প্রসঙ্গে আবার ফিরে আসা যাক। একটা জিনিস লক্ষ করলাম, পাড়ার তাবৎ লোক আমার কাছেই আসে আমার মোরগ-মুরগির বিরুদ্ধে নালিশ নিয়ে। অথচ, এ পাড়ায় কম হোক, বেশি হোক– মুরগি তো সবাই পোষে। মামুন সাহেব সেদিন বাড়ি-চড়াও হয়ে আমাকে খুব খানিক ভালো-মন্দ শুনিয়ে গেলেন। আমার মুরগিতে নাকি তাঁর পালং শাকের ক্ষেত একেবারে ছাগলের মতো করে মুড়িয়ে দিয়ে এসেছে।
হারুন সাহেবের সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক। কিন্তু তাঁর কুকুর দবির সাহেবের একটা মুরগিকে চিবিয়ে রেখে এসেছে, সেজন্যও দবির সাহেব আমারই উপর চড়াও হলেন। হারুন সাহেব বাড়ি নেই, কিন্তু তাঁর বন্ধু আমি রয়েছি, কাজেই তাঁর কুকুরটাকে আমি কেন সামলে রাখিনি।
এত নির্যাতন সহ্য করার পর শেষে আল্লা-আল্লা করে আমারও একদিন দিন এল। ‘খলিল মঞ্জিলে’র খলিল সাহেব খাসি-প্রমাণ একটা লাইট-সাসেক্স মোরগ কিনে এসেছেন। কদিন ধরে তিনি এই মোরগ সবাইকে দেখিয়ে বেড়ালেন আর বলে বেড়ালেন যে, এর ঔরসে যে ডিম হবে, তা তিনি লাহোর পাঠাবেন একজিবিশনে। খলিল সাহেবের দাপট কিছুটা থিতিয়ে এলে আসল দাপট শুরু হল খোদ মোরগটার। গর্দান উঁচিয়ে সে পাড়াময় জৌলুস বিলিয়ে বেড়ায়। তার আজানের হাঁক শুনলে মুরগির বাচ্চারা ভয়ে সেঁধিয়ে যায় মায়ের ডানার তলায়। তারপর, এই মোরগের অত্যাচারে পাড়ার অন্য সব মোরগের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠল।
খলিল সাহেবের মোরগ একদিন আমার একটা হুয়াইট লেগ্হর্নের চোখ উপড়ে ফেলল। যখন জানতে পারলাম, তখন অসময়। সারারাত মনে মনে রিহার্সাল চালালাম ঝগড়া করার। এমনকি, দুজনের মুখ থেকে যেসব সংলাপ নির্গত হবে, তা-ও প্রায় আমার মুখস্থ হয়ে গেল। তারপর, দাঁত কটমট করে সকাল হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।
খলিল সাহেবের বৈঠকখানায় গিয়ে যখন উঠলাম, তখন তিনি হাতের চেটোর উপর একটা ডিম দাঁড় করিয়ে রেখে সমবেত দর্শকমণ্ডলীর কাছে সেই ডিমের মহিমা ব্যাখ্যা করছিলেন। ডিমের প্রশংসায় তিনি এত বেশি পঞ্চমুখ যে, শুনলে মনে হবে, সে ডিম তাঁর কোনো মুরগির নয়– যেন সেটা তিনি নিজেই পেড়েছেন।
এই দৃশ্য দেখে আমার প্রস্তুতি যেন খানিকটা দুর্বল হয়ে গেল। তবু আমি নির্ভাবনায় রিহার্সাল-করা প্রথম সংলাপটা ছেড়ে দিলাম, ‘আমি মুরগি সাহেব, আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।’
উত্তর এল, ‘কোনো অসুবিধে নেই।’
‘কালকে আপনার মোরগ আমার মোরগের চোখ খেয়ে ফেলেছে।’
‘ধন্যবাদ। এক চোখ, না দু’চোখ?’
‘এক চোখ।’
‘ডান চোখ, না বাঁ চোখ?’
আমার মুখস্থ-করা সংলাপ কেমন যেন গোলমাল হয়ে গেল। অনেক চেষ্টা করেও ডান চোখ, না বাঁ চোখ, তা মনে করতে পারলাম না। শেষে বললাম, ‘ডান হোক, বাঁ হোক– তাকে কী এসে যায়!’
‘বলেন কী, মুরগি-সাহেব! আপনার কাছে ডান আর বাঁয়ে কোনো পার্থক্য নেই!’
‘কিন্তু আপনার মোরগে যা করেছে, সেটা অন্যায়।’
‘নিশ্চয় অন্যায়। কিন্তু আপনার পর্দানশীন মোরগের বাইরে বেরুনোটা আরো বেশি অন্যায়।’!
‘আপনার মোরগটা বোধহয় রাজহংস?’
‘দেখুন, আপনি আমাকে যা-খুশি বলুন; কিন্তু আমার মোরগকে কিছু বলবেন না। আমার মোরগ রাজহংসই যদি না-হবে তাহলে অমন রাজার মতো শান-শওকত নিয়ে ঘুরে বেড়াবে কেন, বলুন দেখি! আর, আপনার মোরগই-বা কেন আসবে আমার মোরগের কাছে!’
‘মানুষ তো আর নয় যে, ঘরের মধ্যে বন্ধ করে রাখবে নিজেকে।’
‘আপনি যদি আপনার সুলোচনকে বেঁধে রাখতে না-পারেন, তাহলে আমিই-বা কেমন করে তার ঠোঁটে ঠুলি লাগিয়ে রাখি, বলুন!’
