আমার মনের কোণায় তখন এই চিন্তা সুড়সুড়ি কাটতে লাগল যে, মুরগির থাকবার জন্য চমৎকার করে দরমা বানিয়ে দিয়েছি, পলই কিনে এনেছি– তা সত্ত্বেও মানুষের শয়নাগারে বা শয্যায় কেন মুরগি আসবে? এই নিয়ে পুরো দেড় বছর গবেষণা চালিয়ে আবিষ্কার করা গেল যে, মুরগি কখনো দরমায় বা পলই-এ থাকে না। এই দুই জায়গায় ছাড়া সর্বত্র আমি মুরগি দেখেছি কিংবা দেখেছি মুরগির ছেড়ে যাওয়া অভ্রান্ত নিদর্শন। এমনকি, ডিম পাড়ার সময়েও তারা দরমায় যায় না। হয় বাথরুমে, না হয় আলনায় চেপে ডিম পেড়ে দেয়। গ্রীষ্মকালে তুলে রাখা লেপ কাঁথার স্তূপ থেকে কুড়ুক-পড়া মুরগি বের হতে আর দরমার ভেতর থেকে দাড়ি-কাটার পেয়ালা বের হতে আমি প্রত্যেক দিন দেখেছি। তাছাড়া, একদিন টেলিফোন বেজে উঠল, আমি রিসিভার তুললাম, কিন্তু ‘হ্যালো’ বলতে পারার আগেই পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে একটা মোরগ বিকট গলায় আজান দিয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে তারের অন্য প্রান্ত থেকে শব্দ ভেসে এল, ‘সরি, রং নাম্বার।’ এই কথা বলেই, যিনি অনুগ্রহ করে আমাকে স্মরণ করতে চেয়েছিলেন, তিনি রিসিভার রেখে দিলেন। তাঁর সঙ্গে আমার আর কথা বলা হল না।
একদিন কাজের থেকে ফিরে দেখি, ইলাহি কাণ্ড। গোটা পাড়ার ছেলেপুলে একত্র হয়েছে। আর, তাদের মাথার উপর অসংখ্য চিল-কাক উড়ে বেড়াচ্ছে। কী ব্যাপার! না, আমাদের ল্যাংড়া মোরগটা ইন্তেকাল করেছে। আমার নতুন ক্যারম বোর্ডের উপর লাশ শুইয়ে রাখা হয়েছে। শব-শোভাযাত্রার পুরোভাগে রয়েছে বড় বড় ছেলে, আর পেছনে ছোটরা। চারজন-চারজন করে কাঁধ বলাবলি করে লাশ নিয়ে যাচ্ছে দাফন করতে। একেবারে পেছনে রয়েছে যারা, তাদের মধ্যে দু-একজন ভালো করে হাঁটতেও শেখেনি। তারা কান্না জুড়ে দিয়েছে এই বলে যে, বড়রা তাদের লাশ বইবার সুযোগ দিচ্ছে না।
এর কয়েকদিন পরে চোখ দুটোকে অবাক করে দিল অন্য এক ঘটনা। আমার ছেলেরা পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যে শিন্নি বিলোচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, শাহ্-রুখ নামের মোরগটা আজ প্রথম আজান দিয়েছে। এইরকম বাজে কাজে পয়সা নষ্ট করার জন্য আমি যখন খেদ প্রকাশ করছিলাম, তখন এই বলে আমার খেদ দূর করা হল যে, শিন্নি বিলোনোর জন্যে কোনো কাঁচা পয়সা খরচ করা হয়নি– দশ বছর ধরে বেকার পড়ে-থাকা আমার সার্টিফিকেট আর, আমার প্রথম উপন্যাসের মরচে ধরে-যাওয়া পাণ্ডুলিপি মোটা দামে সের-দরে বিক্রি করে সেই পয়সা দিয়ে এই উৎসব উদযাপন করা হচ্ছে।
আমার গোটা বাড়িটা এখন একটা প্রথম শ্রেণির পোলট্রি ফার্ম। তবে পার্থক্য এটুকুই যে, পোলট্রি ফার্মে কেবল হাঁস-মুরগির চাষ হয়, আর আমার ফার্মে সেই সঙ্গে মানুষের চাষও অব্যাহত রয়েছে।
এই পোল্ট্রি ফার্মের তদারকি করতে গিয়ে সঞ্চিত আমার অভিজ্ঞতার ফসল অফুরন্ত। একদিনে এক বৈঠকে বসে তা বলে শেষ করা যাবে না। তবে, যাঁরা দুনিয়াদারির সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার মায়া ত্যাগ করে পারলৌকিক ও পারমার্থিক চিন্তায় নিমগ্ন হওয়ার কথা ভাবছেন, তাঁদের জন্য আমার আপাতত কেবল এই পরামর্শটুকু দেওয়ার রয়েছে যে, তাঁরা মুরগি পালুন। তাহলে তাঁদের জীবনে এমন সব আধিভৌতিক কাণ্ড ঘটবে আর এমন সব বিচিত্র বিদ্ঘুটে সমস্যা, কোলাহল, কলহ ব্যাঙের ছাতার মতো আপনাআপনি গজিয়ে উঠবে যে, তাঁরা সিদ্ধান্ত পাল্টাতে বাধ্য হবেন এবং লালায়িত হয়ে উঠবেন পূর্বের সাদা-সিধে, হাসি-কান্নার, সুখ-দুঃখের জীবনে ফিরে যাওয়ার জন্য।
নতুন এক জ্বালাময়ী সমস্যার সৃষ্টি হল মোরগে-মোরগে লড়াইয়ের ব্যাপার নিয়ে। প্রথম প্রথম মোরগের সংখ্যা যখন কম ছিল, তখন ছেলেরা মোরগ-লড়াই দেখার জন্য নানাভাবে কসরত করেছে। দুই মোরগের গলায় ঘণ্টি বেঁধে দিয়ে ধরে ধরে সামনাসামনি ঠোকাঠুকি করিয়েছে, কিন্তু অনিচ্ছুক মোরগদের দিয়ে লড়াই বাধানো যায়নি। আর এখন, এই লড়াই অহরহ হচ্ছে। একেবারে রক্তারক্তি কাণ্ড। কিন্তু এই রক্তারক্তি কাণ্ড যদি কেবল নিজের বাড়ির মোরগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত, তাহলে ও কথা ছিল। তা এখন ছড়িয়ে পড়েছে পাড়ার অন্যান্য মোরগের মধ্যেও। আমার মোরগরা সারাদিন যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত থেকে সন্ধ্যায় আমার সঙ্গে যুদ্ধ বাধানোর ব্যবস্থা সম্পন্ন করে অন্য মোরগঅলাদের।
মোরগের লড়াই কেবল মোরগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকল না। দু-একটা মোরগ মানুষের উপরও আক্রমণ চালাতে লাগল। এই অভিযোগ প্রথম প্রথম আমার বিশ্বাস হয়নি। কিন্তু অবিরাম পথচারীদের নালিশ শুনতে শুনতে কান যখন আমার ঝালাপালা, তখন নিজেই একদিন এক মোরগের আমি শিকার হলাম। মির্জা আবদুল ওদুদ বেগ এই ঘটনা কিছুতেই বিশ্বাস করতে চান না। বললেন, ‘কই, আমার উপরে তো কোনো মোরগ কোনোদিন ঝাপ্টা মারেনি!’ শুনে আমি মানুষ-সমান এক আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দাঁড়িয়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম। দেশে কিছুতেই মনে হল না, আমাকে দেখে কোনো শান্তিপ্রিয় জীবের চোখ রক্তবর্ণ হওয়া উচিত।
যাই হোক, আমার মোরগদের বিরুদ্ধে মানুষের অভিযোগ যখন একেবারে সীমা ছাড়িয়ে গেল, জীবন হয়ে পড়ল অতিষ্ঠ, তখন এক মুরগি-বিশারদের কাছে গিয়ে পরামর্শ চাইলাম। তিনি আমাকে শুধু পরামর্শ নয়– অনেক জ্ঞানও দিলেন। বললেন, ‘মোরগ-মুরগির জাতটা প্রাকৃতিকভাবে শান্তিপ্রিয়। চিল বা বাজপাখির জাত আর মোরগ-মুরগির জাত এক প্রজাতিভুক্ত নয়। প্রথমটা সুবিধাবাদী, স্বার্থপর, হিংসাপরায়ণ; কিন্তু দ্বিতীয়টা শান্তিপ্রিয়, নির্বিবাদী, সেবাপরায়ণ। ‘
