সুতরাং, পরের দিন তাঁর বাড়িতে শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়-কুটুমের আর আমার বাড়িতে মুরগির আড্ডা বসল।
মানুষ ভালোবাসার কাঙাল। এইজন্য মানুষ কেবল মানুষকে নয়– জীব-জন্তু, পশু-পক্ষীকেও ভালোবাসে। এই ভালোবাসার নিদর্শন স্বরূপ আমরা জীব-জন্তু, পশু-পক্ষী পুষি। ছোট্ট একটি টিয়াপাখি থেকে শুরু করে বিরাট একটা হাতি পর্যন্ত সবাইকেই বশ মানানো যায়, তাদের দিয়ে হুকুম তামিল করানো যায়। মাঝখানে রয়েছে ঘোড়া আর কুকুর– তাদের প্রভুভক্তির কথা সর্বজনবিদিত। ঘোড়া মনিবকে দেখলে হেষা রব তুলে পিঠ পেতে দেয় চড়ার জন্যে। কুকুর যখন পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে লেজ নাড়ে, তখন মালিকের মনে যে অনাবিল আনন্দের উদ্রেক হয়, সে আনন্দ ভাষায় ধরে রাখা শক্ত। সাপ যে সাপ, সে-ও সাপুড়ের নির্দেশে ফণা নামিয়ে নেয়। কিন্তু মুরগির বেলায় আজ পর্যন্ত এমন কখনো দেখা যায়নি যে, কোনো মুরগি মোরগ ছাড়া অন্য কাউকে চেনে। মোরগের বেলায়ও সেইকথা সত্য।
মোরগ-মুরগিকে যতই আপনি আদর করুন, হাতে ধরে ধরে খাওয়ান-না কেন, কিছুতেই পোষ মানাতে পারবেন না, তাদের দিয়ে লেজ নাড়াতে পারবেন না। অবশ্য আমার বলার উদ্দেশ্য আদৌ এ নয় যে, পেলেছি বলেই আমার মোরগ সেই ভেল্কির বানরের মতো তোপ দেগে আমাকে সালাম ঠুকে যাক কিংবা আমার মুরগি ডাক দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাছে এসে আমার হাতের উপর একটা ডিম পেড়ে দিয়ে পাছা দোলাতে দোলাতে চলে যাক। কিন্তু কথা নেই, বার্তা নেই, চক্চকে কোনো জিনিস দেখলেই কট্ট্-কটাশ্ রব তুলে গোটা বাড়ি মাথায় তোলার তো কোনো মানে হয় না। স্বীকার করছি, কেবল ছুরি দেখলে তাদের সে-রকম করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। কিন্তু যা চক্চক্ করে, তাই যে ছুরি নয়— সে-কথা তারা কবে শিখবে?
আমার ছেলে-মেয়েরা তবু পোষ মানাবার চেষ্টার ত্রুটি করল না। টুনটুনি, ঝুনঝুরি, ফুলঝুরি, চুনচুনি, ফুলপরী– এইসব আদরের মিষ্টি-মিষ্টি নাম রাখল মুরগিদের। আর, মোরগের নাম রাখা হল পুরনো যত বিখ্যাত নেতা আর আমাদের নিজেদের পূর্বপুরুষদের নামে। এতে কবরের তলা থেকে তাঁরা প্রতিবাদ করে উঠলেন কিনা, জানা গেল না; তবে আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু মির্জা আবদুল ওদুদ বেগ বললেন, ‘মোরগদের নিয়ে এ কিন্তু বাড়াবাড়ি।
মুরগি তবু একটা থেকে আর একটা চেনা যায়। কিন্তু মোরগের বেলায় একটা থেকে আর একটাকে স্বতন্ত্র করে দেখা আজ পর্যন্ত আমার দ্বারা হয়ে উঠল না। সব মোরগকেই আমার এক বলে মনে হয়। তাদের চলা-ফেরা, আদব-কায়দা, মুখের বুলি– সবই এক! আমার পঞ্চেন্দ্রিয়ের ক্ষমতার অভাব অবশ্য সেজন্য দায়ী হতে পারে।
সাধারণভাবে শিক্ষিত লোকদের মধ্যে এবং বিশেষভাবে উর্দু কবিদের মধ্যে একটা সর্বব্যাপী ধারণা রয়েছে যে, প্রত্যূষে মোরগ আর মোল্লার আজানের উৎপত্তিগত ও ব্যুৎপত্তিগত কারণ একই। আঠারো মাস এই কারণ নিয়ে আমি গবেষণা চালিয়েছি। তাতে দেখা গেছে, আমার ঘুম যখন সবচাইতে গভীর, ঠিক তেমনি সময়ে আমাদের মোরগ আজান দেয়। আমার অভ্যাস এবং আমাদের মোরগের স্বভাব–এ দুটোর কোনোটারই পরিবর্তন হয়নি আজ পর্যন্ত। যাই হোক, রবিবারে অনেক বেলা অবধি ঘুমিয়ে থাকার যে সপ্তাহান্তিক আনন্দ, মুরগি পালার পর থেকে সে আনন্দ আমার জন্য সম্পূর্ণ হারাম হয়ে গেছে। বিশেষত আমাদের মোরগের সকালবেলাকার আজান এতই সময়নিষ্ঠ আর গগন-বিদারী যে, পাড়া-প্রতিবেশীদেরও কেউ সহসা কোনোদিনও আর অ্যালার্ম ঘড়ি কেনার প্রয়োজন বোধ করবেন না।
সত্যি, কোনো কোনো মোরগের আজান এতই হেঁড়ে-ধরনের যে, তা শুনে কবর থেকে কাফন ছিঁড়ে মরা মানুষের আবার বেঁচে ওঠার কথা। আমার কথা অতিশয়োক্তি বলে মনে করবেন না। দেহের আয়তনের তুলনায় এই ধ্বনির আনুপাতিক হার কত হতে পারে আপনিও তা একবার অঙ্ক কষে দেখতে পারেন। আমার মতে, ঘোড়ার হেষা রবের তুলনায় মোরগের আজানধ্বনি একশো গুণ বেশি শক্তিশালী। আল্লাতালা যদি আনুপাতিক হারে ঘোড়ার গলায় এই শক্তি দিতেন, তাহলে প্রাচীনকালের যুদ্ধে প্রয়োজন দেখা দিত না তোপধ্বনি করে শত্রু-পক্ষকে ঘায়েল করার। ঘোড়াকে দিয়েই সে কাজ অনায়াসে সমাধা করা যেত।
একদিন মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। আমি তখন কাজ থেকে ফিরছিলাম। বাড়ির পৈঠায় পা দিতে দিতে ভিজে চুবচুবে হয়ে গেলাম। ঘরে ঢুকে দেখি, আমার সাদা ধপধপে বিছানার উপর তিনটে মোরগ-মুরগি ঠোঁট দিয়ে দেহের পরিচর্যা করছে। সাদা চাদরের সর্বত্র ময়লা মাখা পায়ের ছাপ। রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে গিন্নিকে বললাম, ‘তুমি থাকতে এই কাণ্ডটা হল, আর তুমি কিছু বললে না?’
গিন্নি নাক ঝাপ্টা দিয়ে বলে উঠলেন, ‘আমাকে কি মুরগির পাহারাদার ঠাওরেছ?’
‘ও, তাহলে দোষটা আমারই, তাই না?’
গিন্নি এবারে একটু শান্ত হলেন। বললেন, ‘আমি রান্নাঘরে ছিলাম, দেখিনি। বাড়িতে মুরগি থাকলে ওরকম এক-আধটু হয়ই। এত চিৎকার করার কী আছে? তুমি আজকাল মুরগি দেখলেই অ্যালার্জিক হয়ে ওঠ।’
এইকথা শুনে আমার আর মুখ থেকে রা সরল না। মুরগির প্রতিও যে মানুষের মনে অ্যালার্জি বাসা বাঁধতে পারে, সেই অদ্ভুত আবিষ্কার নিয়ে মনের মধ্যে আন্দোলন চলছে, এমন সময় আরো একটা নতুন জিনিস আবিষ্কৃত হল। আমার সাদা ধপধপে বিছানায় শুধু যে মুরগির পায়ের ছাপ পড়েছিল, তাই নয়– তাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে আরো একটা জিনিস তারা ছেড়ে দিয়েছে। ব্যাপার হচ্ছে, মুরগিকে আপনি ডালের কণা না-খাইয়ে যদি সোনা-দানা, মণি-মুক্তোর কণাও খাওয়ান, তবু সে সুযোগ পেলেই পোকা-মাকড়, আরশুলা, মাকড়সা, কেঁচো, পিঁপড়ে, ময়লা, নোংরা, আবর্জনা খাবেই। এইভাবে মুরগি যাই খাক-না কেন, তা হজম হওয়ার পর যে জিনিস সে নির্গত করবে, সর্বক্ষেত্রে তা বড়ই অসহ্য। সেইরকম অসহনীয় বস্তু সেদিন আমার বিছানায় যত্রতত্র, যথেচ্ছভাবে খালাস করা হয়েছে।
