ইচ্ছে হল, দরজা খুলে চলন্ত গাড়ি থেকে একটা লাফ মেরে দিই। অবাঞ্ছিত মৃত্যু দিয়ে এই অবাঞ্ছিত জীবনের অবসান ঘটাই। কিন্তু আপনারাই আবার আত্মহত্যাকে কাপুরুষতা বলে অভিহিত করবেন। সুতরাং, সারারাত আমি ধাত্রী-সুলভ পরিচর্যায় রত থাকলাম। ছেলেদের খাওয়ালাম। ধোয়ালাম। মোছালাম, আদর করলাম। সুয়োরানি-দুয়োরানির কেচ্ছা শোনালাম। বেসুরো গলায় ঘুম-পাড়ানি গান গাইলাম সুর করে করে। আর, নিজে নিদ্রাহীন, তন্দ্রাহীন রাত্রি যাপন করলাম। তন্দ্রা মাঝে মাঝে যে না-এসেছে, এমন নয়; কিন্তু তখনই সে তন্দ্রা কেটে গেছে মহিলাটির এমনিধারা সব সম্বোধনে, ‘ছম্মু মিয়ার গায়ে র্যাপারটা একটু টেনে দিন।- কমু মিয়ার মাথাটা সরে গেছে– বালিশের উপর চাপিয়ে দিন… কুঁজো থেকে একটু পানি ঢেলে দিন তো… বাচ্চাটাকে একটু ধরুন দয়া করে, আমি বাথরুম থেকে আসছি।…
Suffer করা কপালে লেখা ছিল, তাই এই সফর। আল্লা-আল্লা করে দুই-ই শেষ হল। এবং লাহোর পৌঁছে প্রথম যে কাজ আমি করলাম, তা হল, নিজের এবং বউ-ছেলেমেয়ে, বাচ্চাকাচ্চা– একসঙ্গে সবার জন্য ফিরতি পথের সিট বুক করে রাখলাম। পিণ্ডি চাপানোই যদি উদ্দেশ্য হয়, তাহলে বুদোর পিণ্ডিই বুদোর ঘাড়ে চাপুক– উদোর পিণ্ডি কেন?
অনুবাদ : নেয়ামাল বাসির
মুরগির চাষ – মুশতাক আহমদ ইউসুফি
বললাম, ‘যাই বলুন-না কেন, বাড়িতে মুরগি পালার পক্ষপাতী আমি নই। আমার মতে, মুরগির স্থান কেবল পেটে আর প্লেটে
তিনি বললেন, ‘পেট আর প্লেটের শোভা বর্ধনের জন্যেই তো মুরগি পালা দরকার, ভায়া। তাই তো বলতে এসেছি, কয়েকটা মোরগ-মুরগি পাঠিয়ে দিই তোমার বাড়িতে।’ এই বলে তিনি মুরগি পোষার ফজিলত বয়ান করতে লাগলেন।
আমি অনেক বোঝালাম যে, ক্রমে ক্রমে মুরগির সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে আর উৎপাত বাড়বে। আমি হলাম গিয়ে নিরিবিলি প্রকৃতির লোক। এসব ঝঞ্ঝাট সইবে না আমার ধাতে।
তিনি তখন আরম্ভ করলেন, ‘মুরগি সবসময়ই দরকার। ঘরে দু-চারটে মুরগি থাকলে পয়সা বাঁচে। অসময়ে মেহমান এলে বাজারে দৌড়াতে হয় না। তাছাড়া মুরগির ফজিলত শুধু মুরগির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ডিমের কথাই ধর। আমি বলব, ডিম হচ্ছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। যতক্ষণ তাজা রয়েছে, নিজে খাও, বাচ্চাদের খাওয়াও। তারপরও যদি শেষ না হয়, পচতে দাও। পচলেও ডিমের দাম কম নয়। হোটেলে কিংবা মিটিং ভাঙার জন্যে সাপ্লাই দাও। তাছাড়া, তোমার গিন্নির রান্নায় যেমন হাত– মাশেআল্লা, তিনি তোমাকে ডিম খাওয়াতে গিয়ে কত কিসিমের মারফতি আর কেরামতি যে দেখাবেন, তা তুমি গুনেই শেষ করতে পারবে না। অলেট, পোচ, হাফ-ফ্রাই, খাগ্নি, বানি, কানি, হালুয়া, মোগলাই পরাটা, ডিম-টোস্ট…’
বাধা না দিলে হয়তো এই তালিকা সারাদিনেও ফুরোেত না। বললাম, ‘আপনার কথা না-হয় মেনেই নিলাম যে, ডিমের মতো খাদ্য সারা দুনিয়াতে নেই। কিন্তু মুরগি আমরা যদি একবার খেতে ধরি, তাহলে দরমাকে-দরমা সাবাড় হতে লাগবে তো মাত্র কয়েকদিন। ডিম আসবে কোত্থেকে!’
‘বলো কী ভায়া!’ অবাক হয়ে চক্ষু বিস্ফারিত করলেন তিনি। ‘মুরগির বংশ কি কখনো ধ্বংস হতে পারে! এই যে সারা দেশে এত রানীক্ষেতের মহামারী। হাজার হাজার লাখ লাখ মুরগি মরে গেল। কিন্তু বাজারে মুরগির কোনোদিন কম্তি দেখেছ? আর, তুমি বলছ কিনা, খেয়েই সাবাড় করবে! দেখ ভায়া, মুরগির বেলায় যোগের অঙ্ক অন্যরকম। দুই-এ দুই-এ চার হয় না– হয় চল্লিশ। বিশ্বাস-না হয়, নিজেই হিসাব করে দেখে লও। ধর, দশটা মুরগি দিয়ে শুরু করলে। ধর, দশটার মধ্যে নয়টাই বাঁজা– একটাতে ডিম দেয়। ভালো জাতের একটা মুরগি বছরে ডিম দেয় দুশো থেকে আড়াইশো। কিন্তু তুমি যেহেতু কনজারভেটিভ লোক, সেহেতু ধরে নিলাম, তোমার মুরগিও কনজারভেটিভ হারে ডিম দিচ্ছে বছরে দেড়শো।’
মাঝপথে বাধা দিয়ে বললাম, ‘আমার কনজারভেটিভ হওয়ার সঙ্গে মুরগির ডিম কম বা বেশি দেওয়ার সম্পর্কটা ঠিক বুঝলাম না।
‘ভায়া, তুমি দেখছি সব কথাতেই ভড়কে যাচ্ছে। বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, কম করে ধরলেও মুরগির বংশ কখনো ধ্বংস হয় না। তা বছরে যদি দেড়শো ডিম হয়, তাহলে পরের বছর সেই ডিম থেকে যে মুরগি বেরুবে, তারা পাড়বে বাইশ হাজার পাঁচশো ডিম তৃতীয় বছরে, এইরকম হিসাব করলে দেখতে পাবে, তেত্রিশ লক্ষ পঁয়ষট্টি হাজার মুরগিশাবক তোমার বাড়িটাকে গুলজার করে রেখেছে। এ তো একদম সোজা হিসাব।’
‘তা যেন বুঝলাম। কিন্তু এত মুরগি-শাবককে যদি ঠিকমতো খেতে দিতে হয়, তাহলে আমার নিজের শাবকরাই যে না-খেতে পেয়ে মরবে।’
বললেন, ‘কথায় বলে, রুজির মালিক আল্লাতালা। কিন্তু সেটা হচ্ছে মানুষের বেলায়। মুরগি আর মোল্লার বেলায় রুজির চিন্তা খোদ আল্লাতালাকেও করতে হয় না। এঁরা দুজন যার যার খাদ্য নিজেরাই খুঁজে নেন। তুমি একবার পেলেই দেখ না, ভায়া। দেখবে ঘাস্-বিচালি, পোকা-মাকড়, তরকারির খোসা, রুটির কণা, এঁটো-কাঁটা, কাঁকর, পাথর– এইসব খেয়েই ওরা বেঁচে থাকবে।’
জানতে চাইলাম, ‘মুরগি পালা যদি এতই সহজ আর লাভজনক হয়, তাহলে আপনি নিজের মুরগি আমাকে দিতে চাচ্ছেন কেন?
‘তা এতক্ষণ এতকথা বলিয়ে না নিয়ে প্রথমেই এই প্রশ্নটা করলে না কেন ভায়া? তুমি তো জানোই, আমার বাড়িটা কত ছোট। সেই বাড়ির অর্ধেকে থাকি আমরা, আর অর্ধেক জুড়ে থাকে আমার মুরগিরা। এখন মুশকিল দেখা দিয়েছে একটা। কালকে আমার শ্বশুরবাড়ির কিছু আত্মীয়-কুটুম আসছেন ছুটি কাটাতে।
