আমিও মধ্যে থেকে বাধা দিয়ে বললাম, ‘আপনি থামুন, আমিই ওর কাছ থেকে জেনে নিচ্ছি।’ তারপর, সেই গোঁয়ার অশ্ব-শাবকটিকে আবার জিগ্যেস করতে লাগলাম, ‘বিস্কুট খাবে? পয়সা নেবে? পেট চেপে ধরে কাঁদছ, পেটে নিশ্চয় ব্যথা হচ্ছে, তাই না? পেটে মালিশ করে দেব? ঘুমুবে? কোলে চাপবে? পেচ্ছাব করবে?’
শুকুর আল্লার কাছে। এই শেষ প্রশ্নটিতে উল্লুকটা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। এবং তার মা-ও তাঁর এই গুণধর সন্তানটিকে একটা ধমক দিয়ে বললেন, ‘কমবক্ত, তা এতক্ষণ বলছিলিনে কেন?… ভাইজান, আপনি ওকে একটু বাথরুমে বসিয়ে দিয়ে আসুন।’
সুতরাং, তাই করতে হল। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরেই সে আবার তার মায়ের সামনে এসে মূর্তিমান প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। বোঝা গেল, পায়জামার ফিতেতে গিঁট লেগে গেছে এবং ফাঁস খুলতে গিয়ে সেই-ই এই কাণ্ড ঘটিয়ে এখন আর খুলতে পারছে না। সুতরাং মহিলা নিজেই তাঁর সূক্ষ্ম নখর দিয়ে চেষ্টা চালালেন এবং না-পেরে শেষে দণ্ড প্রয়োগ করলেন। কিন্তু অনেক টানা-হেঁচড়ায় গিঁট এতই শক্ত হয়ে গেছে যে, খোলার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এহেন জটিল পরিস্থিতিতে কী করা উচিত, ভাবছি– এমন সময় ইডিয়টটা নিজেই সমস্যার সমাধান করে দিল। সম্পূর্ণ ব্যাপারটাতে যথেষ্ট সময় লেগে গেছে; সুতরাং দেখা গেল, গিঁট খোলার আপাতত আর প্রয়োজন নেই। অতি দ্রুত তার পায়জামাটা উপর থেকে নিচে পর্যন্ত ভিজতে আরম্ভ করল এবং সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও কর্তব্যকর্ম বেড়ে গেল। যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি জিনিসপত্র সরাতে লাগলাম। কেননা, যে হারে বন্যা নামতে শুরু করেছে, তাতে সবকিছু ভেসে যেতে পারে। মহিলাটির জিনিসপত্রও সরাচ্ছি– তাঁর নিজের এখন ফুরসত নেই। তিনি তখন তাঁর আদরের ছেলেটিকে এমনি ভাষায় সম্বোধন করছেন, ‘খোদার গজব নামুক তোর ওপর। এতে বড় উটটা কিনা কাপড়ের মধ্যেই মুতে ফেলল!’
এই মধুর সম্ভাষণ তখনো শেষ হয়নি, হঠাৎ দেখি, মাত্র এক হাত লম্বা তাঁর সর্বশেষ সংস্করণটিকেও একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিয়ে ধড়মড় করে উঠে বসেছেন তিনি। ক্ষুদে উল্লুকটাও তার অগ্রজের ক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি করেছে এবং তাতে মহিলার কাপড়-চোপড় ভিজে নাশ হয়েছে।
বাচ্চাটাকে শুইয়ে দিয়ে তার ল্যাঙট খুলতে লাগলেন মহিলা। একদিকে তার বাজখাঁই চিৎকারের বিরাম নেই, অন্যদিকে মায়ের গজর-গজরও চলছে। এমনি সময়ে ট্রেনটা এসে হায়দ্রাবাদ স্টেশনে ভিড়ল।
মহিলা চিৎকাররত বাচ্চাটাকে আমার কোলে চাপিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ভাইজান, একে আপনি একটু প্ল্যাটফর্মে তাজা হাওয়া খাইয়ে নিয়ে আসুন তো, তাহলে থামবে। ততক্ষণে আমি এই ধাড়ি পাঁঠাটার পাজামা বদলে দিই, আর বিছানাটাও ঠিক করি।
এবার আপনারা একটু লক্ষ করুন আমার অবস্থা। আমি বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে প্ল্যাটফর্মে পায়চারি করছি আর তাজা হাওয়া খাওয়াচ্ছি। আমার মতো বদ-মেজাজি অপরিচিতজনকে পেয়ে তার কান্নার মাত্রা চতুর্গুণ হয়েছে, আর আমি তাকে থামাবার জন্য কীরকম সব অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলছি, ‘আরে-রে-রে-রে। ওহো-হো-হো-হো। না-না-না! সোনা আমার মানিক আমার, লক্ষ্মী ছেলে, কাঁদে না, চাঁদ মামা, চাঁদ মামা, টিপ দিয়ে যা। ধুত্তোর ছাই, দেব এক পটকানি! না-না-না। কাঁদে না, কাঁদতে নেই। সোনা-মানিক ছেলে। পাজি কোথাকার। হারামজাদার হাড্ডি। না নচ্ছার, এবারে থামবি, না দেব রেল-লাইনে ফেলে।’
বহুক্ষণ যাবৎ এতরকমভাবে আদর-সোহাগ করার পরও সে থামল না এবং গাড়ি হুইসেল দিয়ে দিল। তখন কামরায় ফিরে এসে, যার জিনিস তাঁকে ফেরত দিয়ে নিশ্চিন্ত হলাম এবং ক্ষুদে উল্লুকটা মায়ের বুকে মুখ গুঁজে চুপ করল।
গাড়ি চলতে আরম্ভ করেছে, হঠাৎ মহিলাটি সাপে কামড়ানো মানুষের মতো আঁতকে চিৎকার করে উঠলেন। ভাবলাম, কি-বা না জানি হল। কিন্তু না, তেমন কিছু নয়। বললেন যে, হায়দ্রাবাদ স্টেশনে দুধ নেওয়ার কথা ছিল, তা নেওয়া হয়নি। বাচ্চাটা তাহলে না-খেয়েই শুকিয়ে মরবে। এইটুকু কথাও মানুষের মনে থাকল না। এখন কী হবে। সর্বনাশ হয়ে গেল। ইত্যাদি।
অনেক কষ্টে ক্রোধ সংবরণ করতে হল এবং তিনি আর তাঁর পুরো ব্যাটেলিয়নের সেবা করতে গিয়েই যে দুধ নেওয়ার কথা মনে ছিল না, সে-প্রসঙ্গের উল্লেখ না-করে বলতে হল যে, দুধের ব্যবস্থা সামনের স্টেশনে চা-অলাদের কাছ থেকে হোক বা যেমন করেই হোক, করা হবে। তাঁর আদরের সন্তানকে দুধের অভাবে মরতে দেওয়া হবে না, তার আগে এ বান্দাই হারিকিরি করে মরবে। মাঝারি সাইজের ছেলেটা জানালায় ঠেস দিয়ে, গালে হাত রেখে ঝিমোচ্ছিল। বললাম, ‘ওকে একটু শুইয়ে দেন, নইলে মুখ ঠুকে পড়বে।’
বললেন, ‘ওকে বরং আপনার বিছানাতেই শুইয়ে দিন, ও আপনার সঙ্গেই থাকবে।’ বললাম, ‘জি, না, তার চাইতে আমার গোটা বিছানাই দিয়ে দিলাম। আপনার বড় দুটোকেই উপরে শুইয়ে দিন, আর আমি নিচে একটা কিছু পেতে এই দরজার কাছেই শুয়ে পড়ব।
উত্তরে তিনি ভারি খুশি-খুশি ভাব দেখিয়ে বললেন, ‘তা যাই হোক, ভালোই হল। ওদের উপরে শোয়াতে আমারও যেন মন কেমন সরছিল না। ওরা উপরে শুলে পড়ে যাওয়ার ভয় ছিল। এখন আপনি ওদের সবাইকে নিয়ে তাহলে নিচেই শোন।’
