আমি প্রায় দিশেহারার মতোই বলে ফেললাম। ‘কিন্তু চাচাজান, এখানে তো খুব সম্ভব বার্থ একটাও খালি নেই।’
তিনি বেশ নিশ্চিন্ত মনে জবাব দিলেন, ‘সেসব তোমাকে ভাবতে হবে না, আমি খোঁজ-খবর নিয়েই এসেছি– উপরে একটা বার্থ খালি রয়েছে। তোমার বিছানাটা উপরে করে দাও, আর ও নিচেরটাতেই থাকবে। বড়টাকে তুমি উপরে নিয়ে শুয়ো, আর বাকিগুলোকে ও নিজের সঙ্গেই রাখবে। মাত্র বিশ-বাইশ ঘণ্টারই তো জার্নি, বাবা।’
আমি তবু প্রতিবাদ করব ভাবছিলাম এবং বলতে যাচ্ছিলাম, আমি তো হায়দ্রাবাদেই নামব– এমন সময় হুইসেল বাজল। আর, কুদ্দুস চাচা ‘খোদা হাফেজ’ বলে গাড়ি থেকে নামলেন। তারপর সম্পূর্ণ ট্রেনটা নড়ে উঠল, চলতে লাগল এবং কুদ্দুস চাচা ট্রেনের সঙ্গে সঙ্গে চলতে চলতে তাঁর শেষ বাণী বর্ষণ করতে লাগলেন, ‘বাবা জীবন, একটু লক্ষ রেখো, যেন বাচ্চারা মুখ বাড়িয়ে না থাকে জানালা দিয়ে। হামিদ মিয়া আসবেন লাহোর স্টেশনে ওদের নিতে।…’ এবং এমনি আর কত কী তিনি বলছিলেন আর ছুটছিলেন গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে। শেষ অবধি একটা কুলির সঙ্গে ধাক্কা না লাগলে হয়তো লাহোর পর্যন্ত ছুটতেন এমনি করে।
তা যাই হোক, তখনো শুনছি, তিনি বলে যাচ্ছেন, ‘বাচ্চাদের জন্যে দুধের ব্যবস্থা কোরো জানালা বদ্ধ করে ঘুমিয়ো… জিনিসপত্র গুণে নামিও, ষোলটা আছে, টিকিট নিজের কাছে নিয়ে রেখে দাও, নইলে হারিয়ে ফেলবে… সামনের স্টেশনে কুঁজোতে পানি ভরে নিও– খেও– ঘুমিও– তালা– বিছানা… ‘ এবং তারপর তাঁর কথাগুলো ক্রমেই অস্পষ্ট থেকে অস্পষ্টতর হয়ে বাতাসের সঙ্গে মিশে গেল, আর শোনা গেল না।
অমনি আমার মনে হল, আমি মহা-বিপদে পড়ে গেছি এবং এ বিপদ থেকে উদ্ধারের উপায় হিসাবে চেন টানব কিনা, ভাবছি– এমন সময় একটি ছেলে আমার কোট টেনে টেনে বলতে লাগল, ‘সরো এখান থেকে, আমি এখানে দাঁড়িয়ে দেখব।’
ছেলেটির মা তখন তাকে এই বলে ভদ্রতা শেখাতে লাগলেন, ‘বেয়াদব ছেলে, মামা বলতে পারিসনে!’ তারপর, আমাকে সম্বোধন করলেন এই বলে, ‘ভাইজান, আপনি দরজাটা বন্ধ করে জানালার কাঁচটা নামিয়ে দিন, তাহলে ওরা বাইরে দেখতে পাবে।’
হুকুম তামিল করে, নিজের বিছানা গুটিয়ে উপরে তুললাম। তারপর, কোনোরকমে ঘুমিয়ে পড়তে পারলে বা ঘুমিয়ে পড়ার ভান করতে পারলে আপাতত অনেক ঝক্কি থেকে রেহাই পাব মনে করে একটা ঠ্যাং উপরে তুলেছি, এমন সময় ছেলেদের মা তাঁর নিজস্ব বাণীবর্ষণ শুরু করলেন। ঠ্যাংটা আবার যথাস্থানে ফিরিয়ে এনে তাঁর সেই বাণী শুনতে হল আমাকে, ‘ভাইজান, ছেলেটা তো এখনো ঘুমোল না, তা আপনিই আমাদের বিছানাটা একটু পেতে দিন না– বাক্সগুলো ওখান থেকে নামিয়ে রাখুন।– ঝাঁপিগুলোকে বেঞ্চের নিচে সরিয়ে দিন।– পোঁটলাটা আপনার বিছানার মাথার কাছে থাক—-এর মধ্যে ছেলেদের নতুন জুতো রয়েছে। আরে, আরে, ও-কী করছেন! টিফিন কেরিয়ারটা আমাকে দিন।– বাচ্চাটা কোলে ঘুমোচ্ছে, আমার হাত বন্ধ– আপনিই দয়া করে শব্ মিয়ার নাকটা একটু সাফ করে দিন না।… শ মিয়া, মামার কাছে নাক সাফ করিয়ে নাও!… ‘
নিজের ক্ষেত্রে হলে, আমার ছেলের নাক সাফ করতে যাওয়ার আগে তাকেই পকে সাফ করে দেওয়ার সম্ভাবনা ছিল; অথবা নিজের বউ যদি বলত এ কাজ করতে তাহলে তাকে তালাক দেওয়ার কথাও চিন্তা করতাম কিনা, বলা যায় না। অথচ, পরের ছেলের নাক সাফ করা নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বে তা-ও করতে হল, হ্যাঁ তা-ও করলাম।
যাক এখন একটু হাঁফ ছাড়ার সময় পাওয়া গেল। কিন্তু না, তা হবার নয়। আর এক ছেলে তার মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে বিবিন্ শুরু করল। মুখে কিছু বলে না, শুধু ভঙ্গিতে একটা বিশ্রী অভিব্যক্তি, আর কান্না-কান্না ভাব। মা কয়েকবার প্রশ্ন করলেন, ‘কী ব্যাপার, কী হয়েছে?’ কিন্তু কোনো জবাব না পেয়ে শেষে তার গালে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে বললেন, ‘কমবক্ত, কী হয়েছে, বলবি তবে তো’!
কিন্তু কিছুই বলল না সে। চড় খেয়ে কান্না জুড়ে দিল, ‘ভ্যাঁ-অ্যা-অ্যা…
সুতরাং, আমাকেই ভদ্রতা দেখিয়ে এ জটিল পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করতে হল। না কাঁদলেও যে ছেলের চোখে-মুখে কান্না কান্না ভাব সবসময় লেগে থাকে, কান্নারত সেই ছেলেকে আদর করলাম। তার মায়ের চাইতে বেশি শক্তি প্রয়োগ করে যে ছেলের গালে ঠাস-ঠাস করে অনবরত চড় মারার ইচ্ছা আমারও হচ্ছিল, সেই ছেলেকে উল্টোদিকের অন্য এক ভদ্রলোকের বার্থে নিয়ে গিয়ে সস্নেহে মাথায়-গালে হাত বুলিয়ে বললাম, ‘কী হয়েছে আব্বু, আমায় বল। ক্ষিদে পেয়েছে? পেটে ব্যথা উঠেছে? নানার কথা মনে পড়ছে? পানি খাবে?
খাওয়ার ব্যাপারে পানির চাইতে বড় কিছুর প্রস্তাব করতে সাহস হল না। কেননা, টফি-চকোলেট, আইক্রিম-লেমনেডের প্রস্তাব করলে তখন সে হাতি-ঘোড়াও খেতে চাইতে পারে– আশ্চর্য নয়।
কিন্তু সবকথার উত্তরেই মাথা নেড়ে যখন সে অসম্মতি জানাল এবং কান্নার ভাব আরো তীব্র হল, তখন বাধ্য হয়েই টফি-চকোলেটেরই প্রস্তাব পাড়তে হল আমাকে।
কিন্তু এবারও যখন সে তার নির্বোধ মাথাটাকে উত্তরে-দক্ষিণে ঘুরিয়ে অনিচ্ছা প্রকাশ করল, তখন তার মা পায়ের স্লিপার উঠিয়ে বললেন, ‘কী চাস, বলবি, না দেব বসিয়ে বল্।’ অপরিচিত ভদ্রলোক সভয়ে পাশ কাটালেন। কেননা, মেয়েদের লক্ষ্যভেদ যে কখনো অব্যর্থ হয় না, একথা হয়তো তাঁর জানা ছিল।
