কিন্তু পেটে এত ব্যথা উঠল কেন। আমি যে মরে যাচ্ছি।
জয়শ্রী পেটের ব্যথায় আর্তনাদ করে চেঁচিয়ে ওঠে। মেয়েটি কোত্থেকে খানিক শর্ষের তেল যোগাড় করে এনে জয়শ্রীর পেটে মালিশ করতে থাকে।
যথাসময়ের দু’মাস আগেই, এই এখানে শুয়ে শুয়েই জয়শ্রী একটি নবশিশুর জন্ম দেয়। জন্ম দেয় একটি মৃত সন্তানের।
মা জয়শ্রীকে সামলে নিয়ে বলে– বাচ্চাটাকে ঢেকে নাও, বাছা; ভাগ্যের লিখন কে খণ্ডাতে পারে।
জয়শ্রী কিন্তু সচেতন হয়ে মাটিতে মুখ গুঁজে পড়ে থাকে।
একটুখানি চেতনা ফিরে পেয়েই সে উঠতে চেষ্টা করে। সত্যযুগের সন্তানকে সে দুহাত দিয়ে খুঁজতে থাকে।
মৃত সন্তানের মুখ দেখে আবার সে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। জয়শ্রীর চোখ দুটি ঘুমের নেশায় আস্তে আস্তে জুড়িয়ে আসে। কোনোদিনই আর ঘুম ভাঙে না জয়শ্রীর।
অদূর ভবিষ্যতের উজ্জ্বল ইঙ্গিতকে যেন সম্যক উপলব্ধি করতে পেরেই মেয়েটি বলতে থাকে– জয়শ্রী বলেছিল-না, মা : সত্যযুগ আসবে। পাপের নৌকা ডুবে যাবে। জয়শ্রী তার প্রাণ দিয়ে গেল, আর যাবার আগে কি সে পাপের নৌকা ডুবানোর জন্য শেষ ধাক্কাটা দিয়ে গেল না?
অনুবাদ : নজিরউদ্দীন চৌধুরী
উদোর পিণ্ডি – শওকত থানবী
ব্যক্তিগতভাবে আমি জীবন-সঙ্গিনীকে সফর-সঙ্গিনী করার ঘোরবিরোধী। সুতরাং গতকাল বউ-ছেলেমেয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি আর আজকে আমি একলা যাচ্ছি।
অনেক ছেলেমেয়ের বাবা এবং অনেক বউয়ের স্বামীই হয়তো আমার এই অবস্থাকে আহাম্মকি মনে করবেন। কিন্তু আমার নিজের মত হচ্ছে, সফর করলে সফরই করব– suffer করতে রাজি নই। আর, ট্রেনের সফরে ছেলেমেয়ে সঙ্গে থাকলে তো কথাই নেই। আমি চাপব ট্রেনে আর তাঁরা চাপবেন আমার ঘাড়ে। কয়েকবারের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে জ্ঞান লাভ করেছি এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, বউ-ছেলেমেয়ে নিয়ে সফর করব না কস্মিনকালেও।
এখন কেমন আরাম। একটা বার্থ রিজার্ভ করে নিয়ে একলা যাই, নিরাপদে ঘুমোই, জানালার ফাঁক দিয়ে মুখ বের করে দৃশ্য দেখি, মাটির পেয়ালায় একআনা দামের চা খাই এবং প্রয়োজনবোধে ট্রেনের শব্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঠুমরি কিংবা দাদরা গাই কেউ কোনোরকমের আপত্তি তুলতে পারে না। গাড়ি থামলে প্ল্যাটফর্মে পায়চারি করি, চানাচুর-বাদামভাজা কিনে আস্তে আস্তে চিবোই, যতক্ষণ খুশি, ডাইনিং-কারে ঝিমোই এবং মেজাজ-মাফিক সহযাত্রী পেলে তাস পিটোই– কারও কিছুই বলার থাকে না। আর, সহযাত্রী মেজাজ-মাফিক না-ও যদি জোটে, সারারাত নাক ডেকে নিদ্রা দিই এবং সারাটা দিন ঘুম-ঘুম ভাব দেখিয়ে চোখ জুড়িয়ে আলতো হয়ে পড়ে থাকি– তাতেই-বা কার কী বলার থাকতে পারে!
অথচ, এমন না-হয়ে যদি বাচ্চাকাচ্চা আর তাদের জননী সঙ্গে থাকেন, তাহলে আর আমিত্ব পাইনে খুঁজে। তখন আমি হই একটা ভারবাহী পশু। আমার আমিত্ব, ব্যক্তিত্ব, আমার নিজস্ব বলতে কিছুই থাকে না অবশিষ্ট।
এইসব কারণে গতকাল বউ-ছেলেমেয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি, আর আজকে আমি নিজে, একলা আমার নিজস্ব ব্যক্তিত্ব আর অবশিষ্ট নিয়ে রওনা হয়েছি।
স্টেশনে পৌঁছে রিজার্ভ করা বার্থের উপর বিছানা পাড়লাম। দীর্ঘ পথে সময় কাটানোর মতো করে পত্রিকা কিনলাম। এক সেট তাসও সঙ্গে নিলাম। গাড়ি ছাড়ার বিলম্বটুকু প্ল্যাটফর্মে পায়চারি করে কাটাব ভেবে সবেমাত্র একটা পা উঠিয়েছি, এমন সময় …
এমন সময় দেখলাম, আমাদের কুদ্দুস চাচা হাতে একটা ঘটি ঝুলিয়ে ভারি ব্যস্ত-সমস্ত হয়ে আমার দিকেই ছুটে আসছেন। একটা থামের আড়ালে লুকিয়ে পড়ব ভাবছি, কিন্তু তার আগেই তিনি ‘বাবা জীবন যে…’ বলে মূর্তিময় বিঘ্নস্বরূপ হয়ে সামনে এসে দাঁড়ালেন। নেহাত বাধ্য হয়ে, আদব-কায়দা বজায় রেখে একটা সালাম ঠুকতেই হল। উত্তরে তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে কেটে কেটে বললেন, ‘কোথায় উঠেছ? এই সামনের কামরায়? আচ্ছা।
বললেন এবং সঙ্গে সঙ্গে যেদিক দিয়ে এসেছিলেন, সেই দিকে চলে গেলেন।
বুঝলাম, এখন তিনি লটবহর নিয়ে আসবেন এবং সারাটা পথ আমার ওপর ভর করে থাকবেন। তাঁর যত সব বেয়াড়া কথা শোনাবেন, রোগ-পীড়ার বৃত্তান্ত পাড়বেন এবং বিছানা পেড়ে নেবেন আমাকে দিয়ে। সারাটা পথ ঘুম ভাঙিয়ে জিগ্যেস করবেন, কোন স্টেশন ‘বাবা’ এটা। আমার এত সুন্দর করে সাজানো সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে তো যাবেই, উপরন্তু সিগারেট খেতে হলেও ঢুকতে হবে পায়খানায়। সর্বোপরি, তিনি যা খাবেন, তার বিল পরিশোধ করার জন্যও আমাকেই অনুমতি চাইতে হবে ভদ্রতা করে এবং অনুমতি দিতে তিনি এতটুকু বিলম্ব করবেন না। এত সব করতে হবে। কেননা তিনি হলেন গিয়ে আমার পরলোকগত শ্রদ্ধেয় জনকের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে অন্যতম। সুতরাং তিনিও আমার শ্রদ্ধাভাজন।
এইসব চিন্তা করে, নিতান্ত হতাশ হয়ে পড়ে ভাবলাম বিছানাপত্র গুটিয়ে নিয়ে এই সুযোগে পালিয়ে যাই, অন্য কামরার গিয়ে লুকিয়ে পড়ি। কিন্তু সময় আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করল। দেখা গেল, অল্পক্ষণের মধ্যেই সেই কামরায় হোল্ডল যাচ্ছে জানালা গলিয়ে, বাক্স-পেটরা ট্রাঙ্ক ঢোকানো হচ্ছে ধাক্কা মেরে মেরে, বিরাট বিরাট কয়েকটা ঝাঁপিও প্রবেশ করল সেগুলোকে অনুসরণ করে এবং সবশেষে এক-দুই-তিন করে কোত্থেকে কাচ্চাবাচ্চারা এসে নিমেষে আসন জুড়ে বসল। তারপর, এক মহিলা তাঁর শেষ সংস্করণটিকে কোলে নিয়ে কামরায় আবির্ভূত হলেন। অবশেষে কুদ্দুস চাচা এক হাতে টিফিন-কেরিয়ার আর এক হাতে ঘটিটা নিয়ে এসে বললেন, ‘বাবা জীবন, ইনি হলেন গিয়ে তোমার বহিন– শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছেন। এতক্ষণ তো আমি ভেবেই সারা হচ্ছিলাম। এতগুলো ছেলে-মেয়ে আর একলা মানুষ– মেয়ে আমার কেমন করে যাবে! তা বাবা ভালোই হল। তুমি তো আমাদের আপনার মানুষ।’
