সেই সঙ্গে রাখালও পেটের যন্ত্রণায় ছটফট করে। তার মুখের রং ঘন-ঘন বদলাতে থাকে। ক্রমেই সে রং পাংশুটে হয়ে আসে।
ওরা দুজন মা-মেয়ে যতখানি পারে তাদের যত্ন নেয়, সান্ত্বনা দেয়, অভয়বাণী শোনায়। জয়শ্রী উঠে বসে রাখালের পেটে হাত বুলাতে থাকে।
উদ্ভ্রান্তের মতো চোখ মেলে তাকিয়ে জয়শ্রী মেয়েটিকে প্রশ্ন করে– জানিস বোন, সত্যযুগ আসতে আর কত দেরি?
–তা কেমন করে বলি বল। শহর থেকে ঝাণ্ডা হাতে যারা আমাদের গাঁয়ে মিটি করতে এসেছিল, তারাও তো জানে বলে মনে হচ্ছে না।
শুয়ে শুয়ে রাখাল পাশ ফেরে। পাতলা বাহ্যি হয় তার। রাখালকে পরিষ্কার করে নিয়ে জয়শ্রী তাকে অন্যত্র শোয়ায়। মাটি চাপা দিয়ে ময়লা ঢেকে ফেলে। জয়শ্রীর বুক আতঙ্কে তোলপাড় করতে থাকে। রাখালের পেটে মালিশ করতে থাকে সে।
জয়শ্রী প্রশ্ন করে– সত্যযুগ কি তবে আসবে না, বোন?
মেয়েটি বলে– তা কেমন করে বলি বল! তবে শহর থেকে মিটিং করতে এসে তারা বলেছিল, যারা হাল চালাবে, তারাই নাকি জমির মালিক হবে।
–তেমন দিন করে আসবে, বোন?
–ঝাণ্ডাধারীরা বলেছিল, এই যে ডাল-ভাত ওরা আমাদের খাওয়াচ্ছে, এ কিন্তু দয়ার দান নয়, এতে আমাদের অধিকার আছে। আমরা আমাদের পাওনা আদায় করে নিচ্ছি। একদিন আসবে, যখন আমরা আর চেয়ে খাব না, নিজেরাই আমাদের খাবার যোগাড় করে নিতে পারব।
জয়শ্রী তন্ময় হয়ে শোনে আর ভাবতে থাকে শুধু সত্যযুগের কথা। কিন্তু ভাবনার রেশ ছিঁড়ে যায় শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির শব্দ শুনে। যেন এক নতুন যাত্রাদল এসেছে। তীব্র মশাল হাতে নিয়ে তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। মানুষ এগিয়ে আসছে আর থালায় পয়সা ফেলে দিচ্ছে। কেমন করে মানুষ আজ এত উদারপ্রাণ! তবে কি এ দেশে আর দুর্ভিক্ষ নেই। রাধা… রাধা…! কৃষ্ণ… কৃষ্ণ…!
রাখালের অবস্থা ক্রমেই শোচনীয় হতে থাকে। জয়শ্রীর মনে উৎকণ্ঠার সীমা নেই। রাখালের মাথা কোলে রেখে জয়শ্রী ভাবে– আমার এই শেষ প্রদীপও কি তবে নিভে যাবে! কান্নার উচ্ছ্বাসে ভেঙে পড়ে জয়শ্রী।
মেয়েটি বলে– হতাশ হয়ো না, দিদি– রাখাল সেরে উঠবে।
কিন্তু জয়শ্রী মৃত্যুকে ভয় করে না। তার চোখের সামনে মৃত্যু এসে তাণ্ডব করলেও সে ভয় পাবে না। কিন্তু রাখাল যেন না-মরে। রাখালের বুকে হাত রেখে সে আকাশের দিকে তাকায়, যেন অদৃশ্য কোনো শক্তির কাছে প্রার্থনা জানাচ্ছে, নীরব করুণ ভাষায় জীবন ভিক্ষা চাচ্ছে রাখালের।
কিন্তু আবেদন যথাস্থানে পৌঁছাবার অনেক আগেই… জয়শ্রী রাখালের নাড়ি টিপে দেখে, নীরব হয়েছে সবকিছুই। সে ডুকরে কেঁদে উঠে বলে– সব শেষ হয়ে গেছে, বোন– সব শেষ।
.
মেয়েটি শহর থেকে খুঁজেপেতে ঝাণ্ডাধারীদের তিনজনকে নিয়ে আসে। সৎকারের ব্যবস্থার জন্য সে হাতের চুড়ি খুলে দিতে চায়। কিন্তু ওরা তা গ্রহণ করে না। অল্পক্ষণের মধ্যে চিতার কাঠের যোগাড় হয়ে যায়। জয়শ্রী তার বিচিত্র চাদর দিয়ে রাখালকে ঢেকে নেয়। চিতায় তুলে দেওয়া হয় মৃতদেহটাকে।
জয়শ্রী নিজের হাতে তাতে আগুন ধরায়।
গভীর অন্ধকার রাত্রি। জয়শ্রীর ভবিষ্যৎ যেমন অন্ধকার।
চিন্তার আগুন স্ফুলিঙ্গ ছড়ায়। জয়শ্রীর মনের চিতার ফুলিঙ্গ এ যেন।
আলোর চার পাশের অন্ধকার আরো জমাট বেঁধে ওঠে। জয়শ্রীর বর্তমান আর ভবিষ্যৎ যেমন নিরাশায় জমাট বাঁধা।
ঝাণ্ডাধারীরা চলে যায়। জয়শ্রী শ্মশানেই শুয়ে পড়ে। ওরা দুজনাই তাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করে।
সারারাত্রি জেগে কাটে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে জয়শ্রী শ্মশানের ছাই তুলে নিয়ে মাথায় মাখে। সে দেখতে পায়, মাথার উপর দিয়ে যেন অসংখ্য শকুন উড়ে বেড়াচ্ছে। তারাও যেন জয়শ্রীর মতো অনন্তকাল ধরে ক্ষুধার্ত। জীবন্ত মানুষের ওপর ঝাঁপটা দেওয়ার চেষ্টায় তারা হন্যে হয়ে উঠেছে। এবং একদিন-না-একদিন ঝাঁপটা তারা দেবেই।
জয়শ্রী সেখানেই আবার লুটিয়ে পড়ে। ওদের অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও সে লঙ্গরখানার দিকে যেতে রাজি হয় না। যেন এখানেই পড়ে থেকে সে রাখালের অনুসারী হবে।
মেয়েটি বলে– তুমি যে পোয়াতি, তোমার একটু সাবধানে থাকা উচিত, বাছা।
মা বলে– বাছা, তোমার কিন্তু ছেলেই হবে।
জয়শ্রী ধড়মড় করে উঠে বসে। সে ভাবে– অনাগত শিশু সত্যযুগের মানুষ; নিজের ভাগ্য সে নিজেই গড়ে নেবে।
জয়শ্রী বলে– সত্যযুগ তাহলে আসবে। আমরা আবার জমি ফিরে পাব। নিজের জমিতে আমারই ছেলে হাল চালাবে। ভিখিরিদের মতো দুয়ারে দুয়ারে আর ঘুরে বেড়াতে হবে না। লঙ্গরখানায় আর লাইন লাগাতে হবে না। পাপের নৌকা এবারে তাহলে ডুববে।
জয়শ্রী মাটিতে আসন পেতে বসে। সাত মাস পূর্ণ হয়েছে, আর মাত্র দুই মাস। তারপর আর কতদিন… আর কতদিন।
কিন্তু… কিন্তু…
কিন্তু কদিন ধরে পেটের মধ্যে বাচ্চাটার কোনো নড়নচড়ন নেই কেন?
তবে কি… তবে কি….
মা বলে– চাঁদের মতো ছেলে হবে, দেখো। তোমার আর ভাবনা কিসের!
.
জয়শ্রীর কানে কানে কে যেন মন্ত্র পড়ে যায়– জয়শ্রী, জয়শ্রী, তোমরা-যে সব জাত- কিষাণ, তোমাদের আর ভাবনা কিসের। যুগ পালটে যাচ্ছে। তোমাদের জমিদার আর কতদিন জমিদারি করবে। তোমাদের জমি তোমরাই আবার ফিরে পাবে। তোমার নতুন রাখাল এসে সে জমির তদারকি করবে। তোমাদের আর ভাবনা কিসের
