দুর্বিষহ দুর্ভিক্ষ। জ্যোতির্ময় রাধা-কৃষ্ণের কথা ভেবে আর দুর্ভিক্ষকে আটকে রাখা যাবে না। আটকে রাখা যাবে না পেটের অনন্ত ক্ষুধাকে।…
ভাবতে ভাবতে জয়শ্রী লঙ্গরখানার দুয়ারের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। নিশ্বাসটুকুও পড়তে চায় না, গলার মধ্যে এসে আটকে যায়।
গ্রামের কথা ভাবতে ভাবতে জয়শ্রী আবার তন্ময় হয়ে ওঠে। মনে পড়ছে, চালের দাম যখন হু-হুঁ করে বাড়তে লাগল, গ্রামের লোকেরা তখন ভবিষ্যৎ না ভেবেই অন্ধের মতো তা বিক্রি করতে শুরু করল। মহাজনেরা আল্লাদে আটকানা, কারণ তাদের পোয়াবারো। তারা আরো বেশি করে ধান-চাল বিক্রি করার জন্যে চাষিদের উৎসাহ দিতে থাকে, তাদের বোঝায়– ধান-চালের দর বেশি থাকতে বিক্রি করে ফেল, আবার সস্তার সময় কিনে নেবে।
কিন্তু সস্তার সময়ও আর এল না, তাই কেউ আর ধান-চাল কিনতেও পারল না। যেন চিরস্থায়ী দুর্ভিক্ষের ঘূর্ণিজলে পড়ে তারা হাবুডুবু খেতে লাগল। আর মহাজনেরা এখন বলে– এককণা চাল সোনার চেয়েও দামি। আহা, এ কি কলিযুগ এল, মা গো!
পিছন থেকে বুড়ো আবার জয়শ্রীর গায়ে হাত দিয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করে। জয়শ্রী তার দিকে তাকায়। বুড়োর চোখে ফুটে উঠেছে অপূর্ব ভাষা। সে যেন বলতে চাইছে– দুনিয়া একটা পান্থশালা। পথে পথে, দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষা করে আমরা এখানে ফিরেছি। বেশিক্ষণ এখানে থাকা চলবে না। আবার আমরা বেরিয়ে পড়ব। লঙ্গরখানার ডাল-ভাতই আমাদের সম্বল।
গ্রাম ছাড়ার কিছুদিন আগে জয়শ্রী এক বুড়োকে দেখেছিল বাজারের মধ্যে রাধা-কৃষ্ণের যুগলমিলনের মূর্তি বিক্রি করতে। সে বুড়ো যেন এই বুড়োরই প্রতিধ্বনি। না, প্রতিধ্বনি নয়, বরং খুব সম্ভব এই-ই সেই বুড়ো। পূর্বপুরুষের পুজোর মূর্তি পেটের দায়ে এখন বিক্রি হচ্ছে। জয়শ্রী ভাবে মূর্তি বিক্রি করার কথা বুড়োকে জিগ্যেস করবে কিনা। কিন্তু কী মনে করে বিরত থাকে সে।
জয়শ্রীর চোখের সামনে তারাপদের ছবিটা হঠাৎ ভেসে ওঠে। শহর থেকে যেসব দালালরা এসে মেয়েদের ফুসলিয়ে নিয়ে যেত, তারাপদ তাদের উদ্দেশে রচনা করেছিল ব্যঙ্গ-কবিতা। কবিতায় তাদের সে সম্বোধন করত ‘হারামি, শুয়োরের বাচ্চা, পাজি’ বলে। অথচ কী আশ্চর্য! তারাপদই অবশেষে দালালদের পাল্লায় পড়ে গ্রামের সব-সেরা সুন্দরী মেয়েদের ধরে ধরে বিক্রি করে ফেলত। কে জানে, সেই ‘হারামি, শুয়োরের বাচ্চা, পাজি’ লোকটা এখন কোথায়? তখন পর্যন্ত একটি নয়, দুটি নয়– সাত-সাতটি মেয়ে সে বিক্রি করেছে। কেন, কিসের জন্য?– পেটের জন্য। একমুঠো ভাতের জন্য। কিন্তু শুধু এক-মুঠো ভাত নয়– পেয়েছে সে রসগোল্লা, সন্দেশ আরো কত রকমারি মণ্ডা-মিঠাই। আমাদের মতো কষ্ট করে তাকে আর লঙ্গরখানার লাইনে দাঁড়াতে হয় না। সম্ভবত এখন সে পাকা দালান তুলেছে।…
জয়শ্রী আর রাখাল এখন লঙ্গলখানার দুয়ারের কাছেই পৌঁছে গেছে প্রায়। আহা, রাখালের মুখে আনন্দ আর ধরে না। এখন মায়ের হাত টেনে লঙ্গরখানার দিকে দৌড়াবার আর কোনো প্রয়োজন নেই। এখন গরম গরম ডাল-ভাত সে নিজেই নিয়ে খেতে পারবে। মা যদি তার কাছ থেকে হাজার ক্ষিধের দোহাই দিয়ে এতটুকুও চায়, তবু দেবে না– সবটুকু সে একাই খেয়ে সাবাড় করবে।
জয়শ্রী ভাবে– সাত দিন ধরে পুঁইপাতা খেয়ে বেঁচে থাকা; আর পারি না, পতিদেব। কিন্তু দু’দিন পরে তা-ও কি আর জুটবে! ওই এক টুকরো জমিই তো রেখেছিলাম রাখালের জন্য। মহাজন এসে মাত্র দুই সের চালের বিনিময়ে সেটা চাইল। ভাবলাম, কলিযুগের তো এই শেষ, আমারও শেষ। এরপর সত্যযুগ আসবে, রাখাল আবার জমি ফিরে পাবে।…
ঘোর অন্ধকার যে-রাত্রিতে ওরা পাড়ি দিয়েছিল, মহাজনের গাড়ি-ভর্তি চোরাই ধান-চালগুলোও সেই রাত্রিতেই শহরে এসেছে! সে কিছুই বোঝেনি, তবুও ভেবেছে– ভগবান, এত চাল কোথায় যাবে, কে খাবে।
ইতোমধ্যে ওরা লঙ্গরখানায় এসে পৌঁছে গেছে। জয়শ্রী দেখতে পায়, রাখাল তার নিজের অংশ এরই মধ্যে খেয়ে সাবাড় করে ফেলেছে।
লোভাতুর দৃষ্টিতে মায়ের অংশের দিকে তাকিয়ে রাখাল বলে– মা, একেবারে ঠাণ্ডা।
জয়শ্রী তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে– গরম কোথায় পাবে, বল, বাবা। আজকে এটাই খাও, কালকে আবার দেখা যাবে।
জয়শ্রী আর রাখাল এখন নদীর দিকে এগুতে থাকে। পিছন থেকে সেই মেয়েটি তাড়াতাড়ি এসে ওদের সঙ্গে যোগ দিয়ে বলে– একটু আস্তে চল না, দিদি। আমার মাকেও আসতে দাও, ভাই। তা আমরা তো আর এক গাঁয়ের লোক নই; ভগবানের ইচ্ছা, তাই একসঙ্গে মিশেছি।
জয়শ্রী তার হাত ধরে বলে– হ্যাঁ বোন, আমরা যে সবাই দুঃখী।
মেয়েটির মা এসে রাখালের গালে চুমো খায়। বলে– তা বাছা, আমার থেকে ও কিছুটা ভাগ নাও না; বুড়ো হয়েছি, এত কি আর খেতে পারি!
কথা শুনে রাখাল লোলুপ দৃষ্টি মেলে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
জয়শ্রী শিউরে উঠে বলে–না, না, তাই কি হয়! সবাইকেই তো বেঁচে থাকতে হবে।
কিন্তু আপত্তি সত্ত্বেও রাখাল কিছুটা ভাগ পায় আবার। নদীর ধারে পৌঁছে পেট ভরে জল খেয়ে নিয়ে সবাই জিরোতে থাকে। এদিকে অল্পক্ষণের মধ্যেই রাখালের পেট ফাঁপতে শুরু করেছে।
জয়শ্রী ভয়ঙ্কর দুর্ভাবনায় পড়ে। তার মাথাটা বোঁ বোঁ করে ঘুরতে থাকে। ক্লান্ত, অবসন্ন শরীর নিয়ে লুটিয়ে পড়ে সে মাটিতে।
