চণ্ডিদাস ঠিকই বলেছেন।– বুড়ি তখন গুনগুন করে সুর ধরে গাইতে শুরু করে– সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু, অনলে পুড়িয়া গেল…।
হঠাৎ নিজের বাড়ির কথা মনে পড়ে যায় জয়শ্রীর। বাড়ি নয়, একটা কুঁড়েঘর। অনন্ত অভাবের মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকেও জয়শ্রী শুনতে পায় শঙ্খধ্বনি। শাঁখ বাজিয়ে কারা যেন দেবতাদের ঘুম ভাঙাচ্ছে। দেবতার বাস স্বর্গে, তবু তাঁর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয় মন্দিরে। রাত্রিবেলা মন্দিরে তাঁরা ঘুমিয়ে থাকেন। সকালে তাঁদের জাগিয়ে তোলা হয়। স্নানের পর নানারকমের ভোজ্য পরিবেশন করা হয় তাঁদের সামনে। জমিদারবাবুর প্রাসাদের কোনো বিশেষ জায়গায় তাঁদের জন্য খাবার রাঁধা হয়। সম্ভবত তাই দেবতারা জমিদারবাবুর ওপর এত খুশি। অন্যদিকে মহাজনেরাও দেবতাদের খুশি রাখে আর আমাদের জমিগুলো আত্মসাৎ করে ক্ষুদে জমিদার হওয়ার চেষ্টা করে।
.
পিছন থেকে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়েছে। জয়শ্রী রাখালকে তাড়াতাড়ি আগলে রাখে। আহা, লোকগুলোর কি লজ্জা-শরমও নেই গো।
কানের পাশ দিয়ে আওয়াজ ভেসে আসে– বলি, দেবে তো এক মুঠো ডাল-ভাত, তা-ও এত দেরি কেন, বাবা, কেন এত শাস্তি দেওয়া!
এ লোকটাও ধাক্কা খেয়েছে বুঝি। কাঁঠালগাছের আড়ালে না-থাকলে তার অর্ধোলঙ্গ শরীরের ওপর সূর্যের কিরণ এসে পড়ত। ছায়ায় দাঁড়িয়ে থেকেও লোকটা ঘামে চুপসে গেছে।
মায়ের হাত শক্ত করে ধরে রেখে রাখাল জয়শ্রীর মুখের দিকে পিটপিট করে তাকিয়ে থাকে।
–রাখাল, তুইও বুঝি ঘামে ভিজে গেছিস? রাজপুত্তুর, সোনার চাঁদ ছেলে আমার, তোর খুব ক্ষিদে পেয়েছে নারে? আজ আমার ভাগটাও তোকে দেব, কেমন?…
জয়শ্রী খুব জোরে জোরে মাথা চুলকাতে শুরু করে। মাথার মধ্যে উকুনগুলো রক্ত চুষছে।
পিছন থেকে বুড়োটা আবার মুখ খোলে– এখন গাঁয়ের অবস্থা কেমন?… আড়াই মাস হল গ্রাম ছেড়েছি। গাঁয়ের চাল নিয়ে এসে শহর ভরেছে। এখন গ্রাম না-ছেড়ে এসে তারা কিই-বা করবে। বুড়ো হয়েছি, অনেক দেখলাম।…
আগের মেয়েটি প্রশ্ন করে– তাহলে তোমরা আর কেউ গাঁয়ে ফিরবে না?
জয়শ্রী রাগ করে বলে– পোড়ামুখোরা এত চাল কোথায় নিয়ে গেল?
— ভগবান, তুমি কি দেখতে পাও না? তোমার কি চোখ নেই?
পিঁপড়ের মতো লাইনগুলো একটু একটু করে সামনে এগোয়। এখনো লঙ্গরখানায় পৌঁছাতে অনেক দেরি। পোয়া ঘণ্টা… আধ ঘণ্টা… এক ঘণ্টা… জয়শ্রী জানে না, কতক্ষণে লঙ্গরখানার দুয়ারে গিয়ে সে পৌঁছাবে। তখনো সে মাথা চুলকাচ্ছে।
মানুষের চিৎকার ক্রমেই বাড়তে থাকে। লঙ্গরখানায় গিয়ে একসঙ্গে সবাই হানা দেবার মতলবে বুঝি ষড়যন্ত্র করছে। পিছন দিকের চিৎকার ছড়াতে ছড়াতে সামনে গিয়ে পড়ে। দু-একজন ধ্বনি তোলে– হায় ডাল, হায় ভাত!… আর সারাটা লাইন দুলতে থাকে, ফুলতে থাকে।
এখানে জয়শ্রীর এইভাবে এমনি করে দাঁড়িয়ে থাকা যেন অপ্রিয় দীর্ঘ একটা দুঃস্বপ্নের মতো। জীবন নয়, ভারি বোঝা। কে জানে, আর কতদিন টেনে বেড়াতে হবে এই ভারি বোঝাটা। জয়শ্রী বুড়োর দিকে চোখ মেলে তাকায়; বুড়ো যেন তাকে বলতে চাচ্ছে আমরা সব মড়া, সবাই আমরা শ্মশান থেকে উঠে এসে এখানে লাইন লাগিয়েছি; চল পাগলি, আবার আমরা শ্মশানে গিয়ে শুয়ে পড়ি।
…ক্ষুধার বন্যা, আকাল, দুর্ভিক্ষ, মহামারী…
রাখাল যেন বানরের মতো লাফ দিয়ে লঙ্গরখানায় ঢুকে পড়তে চায়। সে ভাবে– মায়ের অংশের সবটুকুই আজ সে খেয়ে ফেলবে। আজ তার অনেক ক্ষুধা।
ঘামের তীব্রগন্ধী উগ্রতা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে।… জয়শ্রী ভাবছে তার গ্রামের কথা– গ্রামে কি আর কোনোদিন ফিরে যাওয়া চলবে তাদের? স্বামী নেই, কিন্তু রাখাল তো আছে। রাখালের চেষ্টাতে আবার তারা সব ফিরে পাবে। জমিদারের কাছ থেকে ফিরিয়ে আনবে তাদের জমিজমা। রাস্তার ভিখারিদের সাথে রাখাল আর ঘুরে বেড়াবে না। গ্রামেই ফিরে যেতে হবে, গ্রামে ফিরে যাওয়াই ভালো।
পিছনের মেয়েটি বলে– আমাদের সারাজীবনের ঘাম আজকে টপটপ করে ঝরে পড়ছে।
বুড়ি বলে– ধনী, গরিব সবার গা থেকেই ঘাম ঝরছে, বাছা।
বুড়ো বলে– কিন্তু কেমন করে ঝরছে? পেটের মধ্যে একফোঁটা অন্ন নেই, জল নেই– তবু ঘাম ঝরছে কেমন করে?
তারপর জয়শ্রীর গায়ে হাত দিয়ে বলে– পাগলি, তুমি কেমন চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছ? তোমার কি কিছুই বলতে সাধ যায় না?
জয়শ্রী একবার বুড়োর দিকে, একবার মেয়েটির দিকে তাকায়। কিন্তু কোনো কথাই বলতে পারে না সে।
সামনের ছোকরাটি ধ্যানস্থ চোখে মেয়েটির দিকে এমনভাবে তাকায় যেন সে নিজে কৃষ্ণ, আর মেয়েটি তার রাধা। জয়শ্রী কিন্তু তাদের দুজনকেই মনে মনে ধ্যান করে রাধা-কৃষ্ণ ভেবে। সে নিজেও তো একদিন কৃষ্ণ পেয়েছিল, যদিও শূন্যপ্রাণ রাধিকা আজকে স্বামীর শেষ কটি দিনের স্মৃতির রোমন্থন ছাড়া আর কিছুই আগলে রাখতে পারছে না। স্বামীর মৃত্যুতে কতই-না কেঁদেছে সে। তারপরেই কান্না থেমেছে, যখন দেখেছে, তার বুকের মতোই বাড়িটাও শূন্য– মৃতদেহ সৎকারের ব্যবস্থাটুকুও করা যাচ্ছে না। ভিক্ষা করেনি, ধার করেনি– থালা-বাসন বিক্রি করে তবে মড়া পোড়াবার ব্যবস্থা করেছে। চিতার ছাই এখন বাতাসে বাতাসে উড়ে না-জানি কোন তেপান্তরের মাঠে গিয়ে পড়ছে।…
জয়শ্রীর মন আবার গ্রামের পথে ফিরে যায়।… রাধা-কৃষ্ণের পালা হচ্ছে গ্রামে। গ্রামে যাত্রার দল এসেছে। চণ্ডিদাসের পদাবলির কীর্তন হচ্ছে প্রায়ই। শুকনো মনে কত দোলা লাগে, প্রাণে কত ফুর্তি জাগে। মনে পড়ছে, জয়শ্রীর হাতে টাকা-পয়সা থাকায় এসব আনন্দে অংশ নিতে কত সহজ প্রাণের সাড়া জাগত। মহাজনদের দোকানে সস্তা দরে ধান বিক্রি করে সে নগদ টাকা নিয়ে আসত ঘরে। মশাল জ্বালিয়ে যাত্রা হবে, তাই সে সাততাড়াতাড়ি পয়সা ফেলে দিত। একবার চাঁদা উঠেছিল তিনশো টাকা। পঞ্চাশ টাকা দিয়েছিলেন জমিদারবাবু একাই। কিন্তু… কিন্তু… সে টাকা কাদের! আমাদেরই ঘাম-ঝরানো পয়সা দিয়ে জমিদারের শখের লীলা। ভগবান, তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ– ন্যায়-অন্যায়ের এই লীলার তুমিই একমাত্র দর্শক।… তবু মনে কোনো দুঃখ নেই। একটি টাকা চাঁদা দিয়ে জয়শ্রী তো তবু দেখেছে রাধা-কৃষ্ণের যাত্রা-গান। দেখে দেখে মন জুড়িয়েছে।…
