‘সত্যযুগ– সত্যযুগ!’ কান-ফাটা আওয়াজ আসছে লাইন থেকে।
জয়শ্রী ভাবে– জানি না, সত্যযুগ কবে আসবে। হয়তো আসতে পারে, হয়তো না-ও আসতে পারে। সত্যের পরে ত্রেতা, দ্বাপর, কলি। আবার কলিযুগের পরে সত্যযুগ। সত্যযুগ কত বছরের হবে, কে জানে। কলিযুগের নির্দিষ্ট কালও কেউ বলতে পারে না। হ্যাঁ, স্মরণ হয় বটে, বারো লক্ষ ছিয়ানব্বই বছরে ত্রেতা আর আট লক্ষ চৌষট্টি বছরে দ্বাপর। শাস্ত্র-পুরাণ ঘেঁটে পুরোহিত যা বলেন, তা ঠিকই বলে থাকবেন। কলিযুগের নির্দিষ্ট কালের খবর নাকি শাস্ত্রেও নেই। কে জানে, কলিযুগের অন্ত হবে কিনা। হয়তো কলিযুগ ত্রেতার চেয়েও দীর্ঘ হবে। একটু বুদ্ধিসুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই তো জয়শ্ৰী শুনে আসছে, পাপের বোঝা বেশি হয়ে গিয়েছে, তাই নৌকা এখন ডুবুডুবু।
জয়শ্রীর মানসপটে ভাসে অগণিত শকুনের দৃশ্য। সবগুলো শকুনই যেন একসঙ্গে তার ওপর ঝাঁপটা দিতে উদ্যত। সে বলে– সত্যযুগ আসুক চাই না-আসুক– শকুনগুলো আমাদের মতো কাঙালিদের বুঝি-বা গিলেই ফেলবে। আমরা যে আর বাঁচতে পারব না।… সব সহ্য করছি।
তার এই স্বগতোক্তিতে মনে হচ্ছে যেন তারা সবাই চোখের সামনে শকুন দেখতে পাচ্ছে।
রাখাল তার হাত টেনে বলে– মা, ক্ষিধে পেয়েছে, মা, ক্ষিধেয় প্রাণ যায়।
অন্য কোথাও হলে জয়শ্রী নিশ্চয় পালিয়ে যেত। এখন তার শরীরে আর এক ফোঁটাও শক্তি নেই। জয়শ্রী রাখালের ঘাড়ে হাত বুলিয়ে দিয়ে ভাবে– আট বছর ধরে আমার কোলে ও মানুষ– এমন তো আর কোনোদিন নজরে পড়েনি। পেটটা একেবারে সেঁধিয়ে গেছে। শরীরের হাড় কটা যেন গোনা যায়। আহা, আজ যদি ওর বাবা বেঁচে থাকত, তাহলে লঙ্গরখানার সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এমন করে দাঁড়িয়ে থাকতে হত না। তার মজুরির কামাইয়ে দিন চলে যেত। আজকেও ডাল-ভাত কপালে জোটে কিনা কে জানে। এমন করে আমরা কি আর বেঁচে থাকব!
চোখের সামনে জয়শ্রী দেখতে পায়, ক্ষুধার্ত শকুনেরা উড়ে বেড়াচ্ছে- শকুনগুলো যেন রাখালের ওপর ঝাঁপটা দেওয়ার সুযোগ খুঁজছে।
রাখাল মায়ের হাত ধরে বলে– আমরা ডাল-ভাত কখন পাব, মা– গরম গরম ডাল-ভাত?
–আমাদের পালা আসতে দাও, তবে তো।
জয়শ্রী রাখালের মুখে চুমু দিতে গিয়ে ভাবে– জানিনে, আমাদের পালা কখন আসবে, পালা আসার আগেই ডাল-ভাত শেষ হয়ে যাবে কিনা। বুঝি-বা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না, এক্ষুনি মাথা ঘুরে পড়ে যাব। তারপর অগণিত শকুনের দল ছিঁড়েখুঁড়ে খেয়ে ফেলবে।… ক্ষিধের জ্বালায় পেটে যেন চিতা জ্বলছে। হায় রাম! এ ক্ষিধে কি আর মিটবে না! আমরা বোকা, আর শকুনগুলোও বোকা– কে কতক্ষণ ধৈর্য ধরে থাকবে! জানি না আর কত দেরি। কিন্তু ডাল-ভাত যে পাওয়া চাই-ই। লঙ্গরখানার মালিকরা কত দয়াবান– মৃত্যুর কবল থেকে ওরা আমাদের বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।…
…জয়শ্রী ও জয়শ্রী…! গ্রাম থেকে বিদায় নেবার সময় তার স্বামী বলেছিল– আমারই আগে মৃত্যু হবে, জয়শ্রী। যতিদন আমি বেঁচে থাকব, যমদূত তোমায় দেখতেও পাবে না।
–এমন কথা মুখেও এনো না, পতিদেব। আমি আগে মরব। তুমি বেঁচে থাক, আমার রাখালও যেন বেঁচে থাকে।…
–রাখালের কথা ভেব না। ওর আমি এতটুকুও কষ্ট হতে দেব না।
জয়শ্রী ভাবে– কলিযুগের মানুষের মুখে এ যেন সত্যযুগের বাণী। হ্যাঁ, স্বামীর ভবিষ্যদ্বাণীই সত্য হয়েছে, সেই আগে মরেছে।… কাঙালি-জীবন কারই-বা পছন্দ হয়! এই কি জীবন! এ জীবন কি কারও কাম্য হতে পারে!… জীবন তো নয়, বোঝা।… জয়শ্রী, তুমি এত শুকিয়ে যাচ্ছ কেন? জয়শ্রী, তুমি গর্ভবতী! জয়শ্রী, সাত মাস পেরিয়ে গেছে, আর মাত্র দুমাস বাকি। বেটা ছেলে জন্ম নেবে। তখন আর কোনো দুঃখ-কষ্টই থাকবে না। কিন্তু যদি মেয়ে জন্মায়? না, না, না, মেয়ে চাই না। মেয়ের জীবনে অনেক কষ্ট। ছেলে চাই, ছেলে। যে ছেলে ক্ষেতে-জমিতে হাল চালাবে, বছর বছর ধান ফলাবে।… হায়রে আকাল!
জয়শ্রী রাখালের হাত ছাড়িয়ে নেয় ঝট্কা মেরে– যেন যত দোষ তারই। পরমুহূর্তেই আবার তার পিঠে হাত বুলোতে শুরু করে। বলে– রাখাল, সোনার চাঁদ ছেলে আমার। এক বুড়ো কাশতে কাশতে বলে– আমরা বড়লোকের দান খাচ্ছি। দান খেতে আমরা বাধ্য।
আরেকজন বলে– এমন আকাল তো সাত জন্মে দেখিনি, বাবা– শুনেছি বলেও তো মনে হয় না।
এক বুড়ি বলে– আগে বিষ্টি না-হলে আকাল হত, ধানের ফলন নষ্ট হয়ে যেত। কিন্তু এবার এত ফসল ফলল, তবু এত আকাল! হায় ভগবান, এ আকাল কি শেষ হবে না!
একটা মেয়ে বুড়িকে আশ্বাস দিয়ে বলে– আমরা আবার গ্রামে ফিরে যাব, বুড়িমা। অন্য একজন বলে– যারা যাবার, তারা তো চলেই গেল; এখন দেখছি লঙ্গরখানার মালিকরা আমাদের মরতে দেবে না।
বুড়ি এ-কথার প্রতিবাদ করে ওঠে– তুমি যদি বাঁচতে চাও তো বেঁচে থাক, বাছা। ভগবানকে অনেক বলেছি, আমি আর বাঁচতে চাইনে।
জয়শ্রী তন্ময় হয়ে ওদের আলাপ-আলোচনা শোনে। ডান পায়ের ভর বাঁ পায়ের উপর দিয়ে রাখালের চিবুক স্পর্শ করে বলে– তোর বাবা আমাকে ছেড়ে গেছে, রাখাল। এখন তুই-ই আমার ভরসা। তুই আমার সোনার চাঁদ ছেলে, তুই আমার রাজপুত্তুর।…
এক কোণা থেকে একটা মেয়ে হঠাৎ বলে ওঠে– কিন্তু স্বর্গে তো আকাল নেই।
অন্যজন যোগ করে– ক্ষিধেয়, মহামারীতে ভুগে ভুগে আমাদের কত কষ্ট- দেবতাদের সে খবর জানা আছে কি?
