মায়ার মনে হল, মোহন যেন তার মনের কথাই বলেছে। মোহনের কথা তার কাছে দূর থেকে আগত সুরের মতো মূর্ছনা সৃষ্টি করল। কিছুক্ষণ পর মোহন অত্যন্ত ধীরে একশো টাকার একখানা নোট তার দিকে বাড়িয়ে দিল আর নিঃশব্দে উঠে চলে গেল। মোহনের চলে যাবার পর সে ভেবে পেল না মোহন এলই-বা কেন আর চায়ই-বা কী। অনেকক্ষণ ভেবে সে সিদ্ধান্তে এল, মদ খেয়ে উন্মত্ত হয়ে এসেছিল সে। কিন্তু এজাতীয় কোনও লক্ষণ তো তার ভেতর ছিল না। বরং তার হুঁশ তো ঠিকই ছিল। যেসব কথা সে বলেছে তা-ও সজ্ঞানেই বলেছে। সে-রাতে সে কিছুই করতে পারল না। তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে বিছানায় আশ্রয় নিল। সে ভাবল, আগামী রাত মোহন নিশ্চয়ই আসবে। তার অন্তর মোহনের জন্য সহানুভূতিতে ভরে গেল। এই যুবক মদ খায় কেন?
দ্বিতীয় রাতে মোহন আবারও এল। সে-রাতে সে একটু বেশি পান করেছিল। তার পা কাঁপছিল। এসেই সে বলল –‘মায়া, আমি চাই তুমি আমার হয়ে যাও।’
মায়া তার দিকে তাকিয়ে রইল। মোহন তার প্রত্যেকটি শব্দের ওপর জোর দিয়ে বলল, ‘আমি চাই তুমি আমার হয়ে যাও, আমি চাই তুমি আমায় বিয়ে করো।’
তার মনের ভিতর তোলপাড় শুরু হয়ে গেল। সত্যি সত্যি কি সে বলছে, নাকি মদের নেশায় অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় বলছে!
মোহন তার মনোভাব বুঝে ফেলল এবং বলল –‘মায়া, আমি উন্মত্ত নই। প্রত্যেকটি কথা বুঝে-শুনে বলছি, আমার প্রশ্নের জবাব চাই আমি।’
মায়া বলল, ‘একটি শর্তে।’
মোহন উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল– ‘তোমার প্রত্যেকটি শর্ত স্বীকৃত। তোমাকে আপন করে নেবার জন্য যে-কোনও শর্ত আমি মানতে পারব
মায়া বলল –‘মদ খাওয়া ছেড়ে দাও।’
মোহন বলল –‘তাই রাজি।
মায়া তার দিকে চেয়ে থাকল।
মোহন বলল– ‘তুমি আমার হলে-পর পৃথিবীতে কোনওকিছুর প্রয়োজনই আমার হবে না।
মোহন তখুনি তাকে তার সঙ্গে আসতে বলল। কিন্তু মায়া আপত্তি জানাল। কারণ অনেকে তার কাছে অনেক টাকাপয়সা পাবে। মোহন ঋণ শোধ করার জন্য তাকে দু হাজার টাকা দিল। এর পরদিন থেকেই তার জীবনাকাশে নতুন সৃষ্টির অভ্যুদয় ঘটল। আর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় নতুন বিবর্তন। কখনও কখনও তার মনে হতে লাগল, তার জীবনের সাধ বুঝি-বা পূরণ হবে না, বুঝি-বা তার জীবনের সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেল। মোহনের বাবা তাকে বধূ হিসেবে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন। মোহনও তাকে ছাড়া ঘরে থাকবে না বলে ঘোষণা করে দিল। তার নিজের আয় বলতে কিছুই নেই। সমস্ত সম্পত্তি বাবার। আর বাবা এরূপ বধূকে ঘরে তুলে সমাজে হেয় হতে মোটেই রাজি নন। মোহন সাধারণ একটা চাকরি নিয়ে যে-কোনও প্রকার দুঃখ স্বীকার করতে প্রস্তুত হয়ে গেল। এরই ভেতর থিয়েটারের অনেকে তাকে প্রলোভন দেখাল। বিভিন্ন লোভে তাকে আত্মসাৎ করতে চাইল, কিন্তু সে নিজের সিদ্ধান্তে পাহাড়ের মতো অবিচল রয়ে গেল। কখনও তার পা পর্যন্ত কাঁপল না। যে বিশ্রী পরিবেশ থেকে সে নিষ্কৃতি পেয়েছে তাতে সে কোনও অবস্থাতেই ফিরে যেতে চাইল না। এবং কোনও মূল্যেই সে মোহনকে পরিত্যাগ করতে রাজি হল না, যে কি না তার জন্য আকাশের নক্ষত্রলোক থেকে ছিটকে পড়ে ধুলোতে গড়াগড়ি দিচ্ছে।
মাত্র দুদিন আগে তার জীবনে আবারও পরিবর্তন এসেছে। মোহনের পিতা অপারগ হয়ে তাকে গ্রহণ করেছেন। সে প্রাসাদোপম অট্টালিকার ধনী মালিকের পুত্রবধূ হয়ে এসেছে! যার মনে যা-ই থাক, সবাই তার সাথে ভালো ব্যবহার করছে। শাশুড়ি এবং ননদেরা এমন কথা আজও বলেনি যা শ্রুতিকটু লাগতে পারে বা যাতে তার মন ছোট হয়ে যেতে পারে। সে-ও প্রমাণ করতে চেষ্টা করছে যে, মোহন গোবর থেকে পদ্মই আহরণ করে এনেছে, এজন্যই মোহনের মা আশ্রমে যাবার সময় তাকে সাথে নিয়েছেন। কিন্তু স্বামীজির কথায় সত্যি তার মন দমে গেল।
সমস্ত কথা চিত্রের মতো তার মগজে জড়ো হল। সে কাঁদতে লাগল। ভাবতে লাগল– মানুষের পাপ কি কোনও দিনও স্খলিত হয় না! এই যদি হয় তবে কি সে জীবনধারা পরিবর্তিত করেও গণিকা থেকে গেল! তবে কি তাকে জীবনভর গণিকাই থেকে যেতে হবে!
হঠাৎ কক্ষে কার পদশব্দ শোনা গেল। সে দেখতে চাইল, কিন্তু পারল না। বুঝতে পারল, কক্ষে মোহন ছাড়া আর কেউ আসেনি। সে তাড়াতাড়ি অশ্রু সংবরণ করতে উদ্যোগী হল আর সঙ্গে সঙ্গে তার কানে এল– ‘স্বামীজি মহারাজের দর্শনের আশ্রমে যাওনি?’
মায়া উঠে দাঁড়াল। তার মুখমণ্ডল অশ্রুসিক্ত।
মোহন ভয় পেয়ে গেল। জিগ্যেস করল– ‘কী ব্যাপার, তুমি কাঁদছ?’
নিজের মস্তক মোহনের পায়ের উপর রেখে মায়া বলল –‘আমি কোথাও যাব না। সবচাইতে বড় সন্ন্যাসী এবং মহাত্মা তুমি– আমার স্বামী, তুমিই আমায় নরক থেকে বের করে স্বর্গে উত্তোলন করেছ। অতএব আমার আর কোনও মহাত্মার প্রয়োজন নেই।’
অনুবাদ : আখতার-উন-নবী
ধান কাটার আগে – দেবেন্দ্র সত্যার্থী
সারিবদ্ধ কামানের মতো বাঙালিদের একটি দল পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। ওরা সংখ্যায় হবে খুব সম্ভব সাতজন পুরুষ, দশজন স্ত্রীলোক আর ছোট ছোট ছেলেমেয়ে। পুরুষদের মধ্যে যুবক-বুড়ো- দুই-ই রয়েছে। সবার অবস্থাই এক– সকলেই ক্ষুধার্ত। কোলের শিশুরা শুকনো মাই চুষছে। অপেক্ষাকৃত বড়রা লাইন ভেঙে লঙ্গরখানার দুয়োরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জেদ ধরেছে। লঙ্গরখানার পরিচালকেরা পুরুষ আর মেয়েদের আলাদা লাইন লাগাবার কতই-না চেষ্টা করেছেন, ওরা কিন্তু তবু ভারি কামানের মতো– যার যার জায়গা ছেড়ে আদপেই নড়তে চায় না।
