ঘরে পৌঁছে সে মশারি না-ফেলেই বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়ল। চোখের জল তার দুচোখ ছাপিয়ে কূলহারা প্লাবন বইয়ে দিল। স্বামী চৈতন্যানন্দ বড় সন্ন্যাসী। সমস্ত শহরে তাঁর নামডাক। অনেক পাপিষ্ঠ তাঁর দর্শন পেয়ে নিজেকে শুধরে নিয়েছে, অনেক নষ্ট লোক তাদের সৎজীবন ফিরে পেয়েছে। তাঁর কথায় জাদু আছে। তার কথা কারও ওপর প্রভাব বিস্তার করবে না, এ একেবারেই অসম্ভব। মানুষ ব্যাধিগ্রস্ত মন নিয়ে এখানে এসে নিষ্পাপ মন নিয়ে ফিরে যায়।
কিন্তু মায়ার মনে হল — স্বামীজি তার উজ্জ্বল প্রদীপ্ত আত্মাকে কলঙ্কিত করে দিয়েছেন এবং তাকে সেই নরকে নিক্ষেপ করেছেন, যেখানে ছ মাস পূর্বে পর্যন্ত সে দগ্ধ হচ্ছিল। তার মন ছটফট করে উঠল। তার মনে পুরনোদিনের ক্ষয়ে যাওয়া স্মৃতি নতুন করে ধাক্কা মারল যা সে ভুলে গেছে; তার স্বামী, শাশুড়ি, ননদেরা ভুলিয়ে দিয়েছে। কিন্তু স্বামীজি পারলেন না ভুলিয়ে রাখতে। অথচ তার পূর্বাপর জীবনের সাথে স্বামীজির কোনও সম্পর্কই ছিল না। সে আগে কী ছিল, এখন কী, এ সম্পর্কে স্বামীজির কী! আগামীকাল তার জীবন কেমন হবে এই তো শুধু স্বামীজির চিন্তা করা উচিত। সে তো প্রমাণ করেই দিয়েছে মানুষ যদি সৎভাবে জীবনযাপন করবার সুযোগ পায় তা হলে অতীতের কার্যকলাপ শুধরে নিতে পারে। কিন্তু স্বামীজি এখনও বিস্মৃত হতে পারেননি যে, সে ছ মাস আগে গণিকা ছিল, সে কি না প্রত্যেক রাতে কোনও-না-কোনও পুরুষের কাছে বিক্রি হত। কিন্তু সে চেষ্টা করে তার জীবন শুধরে নিয়েছে এবং অন্যান্য নারীর মতো সে-ও ভদ্রভাবে জীবনযাপন করছে।
হঠাৎ তার চিন্তাধারার গতি পরিবর্তিত হল। সে ভাবল –তপস্যা কে করেছে? স্বামীজি, মহারাজ, না সে? তপস্যার গুণে মুক্তিই-বা কে পেয়েছে? সে না স্বামীজি? তার অনুভূতি মুখর হয়ে উঠল। সে-ই তো মুক্তি পেয়েছে। মহারাজ তো এখনও বিভিন্ন প্রকার বন্ধনের অক্টোপাসে জড়িয়ে আছেন– সেসব বন্ধন থেকে অন্যের মুক্তির জন্য তিনি আশ্রম এবং এ-জাতীয় জাল বিছিয়ে রেখেছেন। অথচ এই বন্ধন থেকে তিনি জীবনে মুক্ত হতে পারবেন না। সেই আশ্রম, দর্শন, উপদেশ এবং প্রার্থনার ধূম্রজালে তিনি সর্বদা জড়িয়ে থাকবেন, কিন্তু তাঁর আত্মা সেই শক্তি কোনওদিনও পাবে না যে-শক্তি দুর্বল এবং অবসাদগ্রস্ত মনের অবলম্বন হতে পারে।
তার মনে বিস্তৃত দিনের স্মৃতি পুনর্জীবন লাভ করল। বিগত দিনের এক-একটি ঘটনা মনে পড়তে লাগল। যদ্দূর তার মনে পড়ছে তাকে কলকাতা এনে বিক্রি করা হয়েছিল। সে শহরের কুখ্যাত একটি মহল্লার একখানা ক্ষুদ্র কক্ষে আটকা পড়ে ছিল। বুড়িমা তাকে লালনপালন করত। মা-বাবার ঘরের জীবনের সাথে এই জীবনের পার্থক্য ছিল প্রচুর। কিন্তু সে কোনও ব্যাপারে কষ্ট পায়নি। বুড়িমা তাকে কখনও কখনও গালিগালাজ করত, কখনও-বা তার ব্যাপারে অন্যান্য মেয়েলোকদের সাথে আলাপ-আলোচনা করত। সে ভাবত, বুড়িমা তাকে বুড়োবয়সের অবলম্বন হিসেবে গড়ে নিচ্ছে। এভাবে সে যতই বড় হচ্ছিল মা’র আনন্দও বেড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সে নিজে এ-জীবন পছন্দ করত না। মনের ভেতর তার আগুন ছিল কিন্তু কিছু করতে পারত না। কখনও রাত্রে বালিশে মুখ গুঁজে সে খুব কাঁদত। এভাবে একদিন তার সৌন্দর্য আর যৌবনের খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। বুড়িমা তাকে একদিন একলা রেখে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেল আর তার জীবনের ধারাও বদলে গেল। তাদের মহল্লার অন্য মেয়েদের মতো নিজের পছন্দ হোক বা না-হোক, তাকেও প্রত্যেকদিন আগন্তুক পুরুষের প্রতীক্ষায় বসে থাকতে হত।
একদিন তার কক্ষে মধ্যবয়েসি একজন পুরুষ এল। সে ছিল রূপমহল থিয়েটারের মালিক। তার নাকি অনেক মেয়ের প্রয়োজন। তার সাথে আরও লোকজন ছিল যারা তাকে ‘শেঠ’ সম্বোধন করত। সে মায়াকে থিয়েটারে কাজ করার জন্য বলল। মায়াও রাজি হয়ে কাজ শুরু করে দিল। পরে মায়া বুঝতে পেরেছিল সে নামেই শেঠ, তার থলি শূন্য। সব-কয়টি প্রাণীকে জীবনধারণের মতো কিছু পয়সা দিতে পারত সে। বেশি দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু এতে মায়ার একটা লাভ হয়েছিল, তা হল শহরময় তার অভাবনীয় খ্যাতি। মানুষ তাকে দেখার জন্য আসতে থাকল। এতে তার জীবন আগের চাইতে সুখে এবং স্বস্তিতে চলতে লাগল। কিন্তু তার আত্মার ক্রন্দন দিনদিন বেড়ে চলল। এক-একদিন তার মন একখানা ছোটখাটো ঘর এবং স্বচ্ছন্দ জীবনের জন্য আইঢাই করে উঠত। তার গাঁয়ের সাধারণ মানুষের মতো জীবন! কিন্তু সে-জীবন ছিল অনেক দূরে। প্রত্যেকদিন তার কক্ষে প্রেমিকের ভিড় হত। কিন্তু প্রেম ছিল তার থেকে অনেক দূরে।
হঠাৎ একদিন রাত্রে মেঘাচ্ছন্ন আকাশে চন্দ্রের মতো তার কক্ষে মোহন এসে উপস্থিত হল। বড় একখানা গাড়িতে চড়ে সুন্দর সাজ-পোশাক করে এসেই সে বলল, ‘আরে তুমি এখানে, গোবরে পদ্মফুল।’
মায়া তার দিকে চেয়ে থাকল। এ পর্যন্ত অনেকেই তো তার কক্ষে এসেছে কিন্তু কেউ তো তাকে ‘গোবরে পদ্মফুল’ বলে আখ্যা দেয়নি। মোহন অন্যদের মতো তার সাথে বিকিকিনির কথাও বলেনি, বরং যতক্ষণ সে ছিল তার অভিনীত প্রত্যেকটি নাটকের প্রশংসাই শুধু করেছে। চারদিকে চুপি চুপি চেয়ে একসময় বলল, ‘কী করবে মায়া দেবী, আমাদের দেশে কি শিল্পীর সম্মান আছে?’
