‘তা এখন চিঠি পড়েছ তো?’
‘হ্যাঁ বাবু, পড়েছি। এবং পড়ে জানলাম- আমার পত্নী আমার ছিল এবং মরার সময়ও আমার হয়ে মরেছে।’
‘এর ওপর তোমার সন্দেহ হল কেন?’
‘বাবু– দীর্ঘ সাজা কাকে বলে তা তো জানো না। যখন আমার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়– তখন আমি যুবক, আর সে তো ধরতে গেলে একেবারে বাচ্চাই। আমি রায় শুনেই পাঁচজনকে সাক্ষী রেখে বলে দিয়েছি যে, আমার পত্নী যাকে ইচ্ছা বিয়ে করে নিতে পারবে, আমার দিক থেকে সে মুক্ত। পরে সে জেলে আমার সাথে দেখা করতে এলে তাকে একথা আমি নিশ্চয়ই বলতাম– ‘তুই এই যৌবন নিয়ে কী করে বাঁচবি রে মূর্খ? যা কাউকে বিয়ে করে নেগে।’ কিন্তু ভগবান জানেন একথা বলার সময় আমার হৃদয় ফেটে চৌচির হয়ে যেত। আমি নিজের মনকে প্রায়শ বলতাম, তোর হৃদয় ফেটে যায় তো যাবে– কিন্তু এটা তো চিন্তা কর্ এ মেয়েটা যাবজ্জীবন কয়েদির পত্নী হয়ে কী করে থাকবে। তুমি তো জানো যৌবনেরও একটা বয়েস আছে, একটা সময় আছে। সে-বয়সের রঙিন দিনগুলোতেই যদি সে তার প্রেমাস্পদকে না-পেল তা হলে তো বৃথা তার এ জীবন। তবুও সে এল না দেখে মন-মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। শেষমেশ আমিও রেগে গেলাম। মনে মনে বললাম –ঠিক আছে, তুই না-আসিস্ –অন্য কারও ঘরে চলে যা। তা সে এলও না। প্রতিদিন সে আসবে ভেবে ভেবে আমি অস্থির হয়ে উঠতাম, গভীর জলের মাছের মতো চঞ্চল হয়ে উঠতাম। পরে একজনকে দিয়ে খবর পাঠিয়েও তাকে ডাকলাম, তবুও সে এল না। আমার খুব কান্না পেল, আর আমি খুব করে কাঁদলামও। পরে নিজকে নিজে বললাম– ‘মূর্খ, তুই নিজেই তো তাকে আসতে বাধা দিচ্ছিস, অন্যের ঘরে চলে যেতে পরামর্শ দিচ্ছিস। তবুও সে অনেকদিন তোর ঘরে থেকেছে, এখন যদি সে তোর ঘরে না-থাকে…তোর কথামতো অন্যের ঘরে চলে যায়- তাতে তোর কী!– তুই কেন আবার কাঁদছিস?
‘তবুও আমি তার আশা ছাড়িনি। ভাবলাম –যদি কখনও আমার কথা তার মনে পড়ে এবং তার নতুন পুরুষের সাথে চলে আসে?– এমনি আশায় আশায় বেশ কয়েক বছর গড়িয়ে যায়।
শেষে একদিন এই চিঠি পেলাম। চিঠিখানা নিয়ে আমি মুন্সির কাছে ছুটলাম পড়িয়ে নিতে, কিন্তু কিছুদূর গিয়েই ভাবলাম –চিঠিতে কী লিখবে? লিখবে সে অন্যের ঘরে চলে গেছে। এটা পড়ে মুন্সিও দেবে হেসে। ঝগড়ু কি এ হাসি সহ্য করতে পারবে! একথা মনে হতেই রক্ত আমার গরম হতে শুরু করল, পরে ভাবলাম– না-হয় মুন্সি হাসলই না– কিন্তু কথা তো আর গোপন থাকবে না, একদিন-না-একদিন জনসম্মুখে প্রকাশ হয়ে পড়বে– এবং কয়েদিরা যেখানেই আমাকে দেখবে হাসবে– আর তা আমিও সহ্য করতে পারব না।
‘তা শেষপর্যন্ত চিঠিখানা তেমনি রেখেই দিলাম– চিঠিখানাও তেমনি পড়ে থাকল। এরই মধ্যে একদিন খবর পেলাম তার মৃত্যু হয়েছে।
‘তার মৃত্যুখবরে আমি মুষড়ে পড়েছিলাম– কিন্তু কাঁদতে পারিনি। কান্না আমার আসেনি। কারণ এটুকুই জানতে পারিনি যে, মরার সময় সে কার ছিল।
‘পরে তুমি যখন বললে যে পড়া শিখো– তখনও আমার একথা মনে ছিল না– আমি এতদূর পড়তে পারব বলে, অন্তত চিঠি।
‘আমাদের গাঁয়ে অনেক লোক আছে– যারা পাঠশালায় পড়ালেখা করেছে, তারাও না পারে একটা চিঠি পড়তে, না পারে লিখতে। এ দুটো কাজ তারা অন্যের দ্বারা সারিয়ে নেয়। এবং কখনও তাদের ঘরে এক-একটা চিঠি মাসের-পর-মাসও পড়ে থাকতে দেখা
যায়, তারা শুধু অপেক্ষা করে একজন শিক্ষিত লোকের জন্য।
‘যখন তুমি বললে, ‘তুমি চিঠি পড়তে পারবে’–
তখন আমার বিশ্বাস হয়নি- তাই তোমার কাছ থেকে সরে গিয়ে চুপি চুপি এ চিঠিখানা খুললাম এবং পড়তে শুরু করলাম, আর চিঠিখানা পড়েই তার মৃত্যুর জন্য কেঁদে দিলাম। এবং একথা জেনেই বড় খুশি হলাম যে, সে মরার সময় আমারই ছিল।’
‘তা হলে সে তোমার সাথে দেখা করতে আসেনি কেন?’
‘বাবু তার দুটো পা-ই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল –আসবে কী করে! — জানি না সে কীভাবে বেঁচে ছিল। উপোস থেকে মরে যায়নি তো?’
ঝগড়ু পকেট থেকে চিঠিখানা বের করে দেখতে থাকল। তার চোখে ছিল ব্যথা-মিশ্রিত অশ্রু এবং ঠোঁটে বিজেতার হাসি।
অনুবাদ : আখতার-উন-নবী
সন্ন্যাসী ও গণিকা – সোহেল আজিমাবাদী
মায়া যখন তার শাশুড়ি এবং ননদের সাথে ‘শান্তি আশ্রমে’ পৌঁছল তখন সেখানে আরও কিছু মেয়েছেলে জড়ো হয়েছে। স্বামী চৈতন্যানন্দ মহারাজ প্রার্থনার জন্য এসে উঁচুমতো চত্বরের উপর উপবেশন করেছেন। এখন শুধু তাঁর উপদেশবাণী বর্ষণ বাকি। প্রথমে তার শাশুড়ি কমলা দেবী মহারাজের পদস্পর্শ করে প্রণাম করলেন। মহারাজ সবার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলেন। সবার শেষে মায়া তার পদস্পর্শ করে প্রণাম জানাবার জন্য এগোল, কিন্তু সে পা স্পর্শ করতে উদ্যত হয়ে হাত বাড়াতেই মহারাজ পা গুটিয়ে নিলেন আর তার মস্তক স্পর্শ করা ব্যতিরেকেই ইঙ্গিতে তাকে আশীর্বাদ করলেন এবং কমলা দেবীকে বললেন, ‘দেবী, তোমার বউ তো সত্যি সুন্দরী।’ পরে মায়াকে বললেন, ‘এখন থেকে তুমি…।’
স্বামীজি চুপ করে গেলেন। মায়া মাথা তুলে এক পলকে স্বামীজিকে দেখল। তার উদ্ভাসিত চেহারা চুপসে গেছে। ঠোঁট থর থর করছে। স্বামীজি আরও কিছু বলতে চাইলেন কিন্তু পারলেন না। মায়া মনে ভীষণ আঘাত পেল। সে মনে গভীর ভক্তি আর বিশ্বাস নিয়ে এখানে এসেছিল। সে শুনেছিল ‘শান্তি আশ্রমে’ এসে মহারাজের দর্শনের পর উপদেশাবলি শুনলে নাকি মনে গভীর শান্তি নেমে আসে। কিন্তু এখানে এসে মহারাজের ব্যবহার দেখে তার মনে হল শান্তি তার যা-ও-বা ছিল তাও শূন্যে বিলীন হয়ে গেছে। মহারাজ কিছু না-বলেও যেন অনেককিছু বলে দিয়েছেন। ‘এখন থেকে তুমি…’ এরপর মায়া নিজেই বাক্য সমাপ্ত করল। বরং কিছু বাক্য তৈরি করে নিল যা মহারাজ বলতে পারতেন, ‘এখন থেকে তুমি ঘরের সম্মান রাখবে। ভদ্রমহিলার মতো জীবনযাপন করবে।’ আরও না-জানি কত কী বলতে চেয়েছিলেন। মহারাজ কী বলতে চেয়েছিলেন বুঝতে মায়ার একটুও বিলম্ব হল না। সে এজাতীয় কথা হাজার বার ঘরে এবং নাটকের সংলাপে বলেছে, যার দুটি মাত্র অক্ষর এইমাত্র তিনি উচ্চারণ করলেন, যাতে শ্রোতা শোনামাত্রই বাক্য সমাপ্ত করে নেয়। স্বামী চৈতন্যানন্দ মহারাজও এটাই বলেছিলেন। মায়া নিজেই বাক্য সমাপ্ত করল। সেই না-বলা এক-একটি শব্দ তীরের মতো তার মনের গভীরে বিদ্ধ হল। সে আসার আগে ভেবেছিল, স্বামীজির দর্শন পাবে, তাঁর পদস্পর্শ করে প্রণাম করবে, তাঁর আশীর্বাদ নেবে, তাঁর উপদেশ শুনবে এবং তাঁর সাথে প্রার্থনায় অংশগ্রহণ করবে। এভাবে সে তার মনের ফিরে পাওয়া শান্তিকে ষোলোকলায় পূর্ণ করবে। কিন্তু স্বামীজির কথায় তার মনে যে শান্তি ছিল তা-ও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল– যা সে কয়েক মাসের ভেতর পেয়েছিল। সবার সামনে যেন তাকে চপেটাঘাত করে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হল সে কে, এবং সে যদি নিজেকে ভুলে গিয়ে থাকে তবে বোকামি করেছে। তার জন্য সবচাইতে বুদ্ধিমানের কাজ হল নিজেকে স্মরণ রাখা। তবুও সে নিজেকে দমন করল। ভাবল-এসেছে যখন, তখন উপদেশ শুনে প্রার্থনা করেই যাওয়া উচিত। কিন্তু তার মনে হল ‘শান্তি আশ্রমে’ উপস্থিত কয়টি চোখের দৃষ্টি তার ওপর নিবদ্ধ, তার উদ্দেশ্যে সবকটি ঠোঁট স্পন্দিত এবং যদি সে অবিলম্বে শান্তি আশ্রম ত্যাগ না করে তবে তার শ্বাসপ্রশ্বাস রুদ্ধ হয়ে যাবে এবং সেখানেই সে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করবে। মায়া ঝুঁকে পড়ে শাশুড়ির কানে কিছু বলল এবং আশ্রম থেকে বেরিয়ে পড়ল।
