সে এক আশ্চর্য খুশিভরা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল।
‘দ্যাখো বাবু, ভেবেচিন্তে বলো, পড়তে বসলে আবার আটকে যাব না তো!’
‘না ঝগড়ু, যদি পরিষ্কার লেখা হয় তা হলে নিশ্চয়ই তুমি পড়তে পারবে।’
ঝগড়ু উৎফুল্ল, ভাবনাচিন্তার অতলে ডুবতে থাকল সে এবং ডুবতে ডুবতে একসময় একেবারে অদৃশ্য হয়ে গেল। চাক্কি চলতে থাকল গড় গড় করে স্বাভাবিক গতিতে আর আমিও জোর দেওয়ার তেমন কোনও প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলাম না। কিন্তু ঝগড়ুর চোখজোড়া অতীত চিন্তার গভীর অতলে তলিয়ে গেল– যা দেখে আমি ভয়ে এতটুকুন হয়ে গেলাম।
ঝগড়ুর চেহারার এই অদ্ভুত পরিবর্তন দুপুর থেকে ছ-প্রহর পর্যন্ত থাকল। পরে একসময় সে আমার কাছে এসে বলল– ‘বাবু কিছুক্ষণের জন্য আমাকে ছুটি দাও, এই এক্ষুনি চলে আসব।’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, যাও।’
একটা দেয়ালের আড়ালে চলে গেল ঝগড়ু। আমি পুরোদমে আটা পিষতে থাকলাম। ঠিক সে-সময় ঝগড়ুর কণ্ঠস্বর ভেসে এল। সে উচ্চস্বরে কথাবার্তা বলছে, কখনও হাসছে, কখনও-বা জোরে জোরে কাঁদছে। আর তার গলার স্বরও এমন অদ্ভুত যে, আমার ভয় পেয়ে গেল এবং জোরে তার কাছে দৌড়ে এলাম আমি।
ঝগড় তখন হাতে একখানা কাগজের পাতা নিয়ে পড়ছিল। তার ঠোঁটে ঈষৎ হাসি, চোখে অশ্রু –আর তার হাতজোড়া কাঁপছিল।
‘সে মারা গেল, তা সে আমার হয়েই মারা গেল। মরার সময় সে আমারই ছিল এবং এখনও আমার থাকল, হ্যাঁ।’
এবার সে কাঁদতে থাকল এবং ফুটফুট করে কাঁদতে থাকল। আমি অনুভব করলাম এসময় তার কাছে যাওয়া ঠিক হবে না। তাই দূরেই দাঁড়িয়ে থাকলাম আমি। ঝগড়ুর কান্নার রেশ কিছুটা কমলে আমি ডাকলাম– ‘ঝগড়ু, ঝগড়।’
কিন্তু ঝগড়ু তেমনি নিজের চিন্তার রাজ্যে ডুবে থাকল। আমি বারবার তাকে ডাকতে থাকলে সে বলল– ‘বাবু তুমি চাক্কি চালাও গে, নাহয় আমাদের উভয়েরই পিঠে কোড়া পড়বে। তোমার বদৌলতে আমার সে-কথা জানা হয়ে গেছে যে-কথা জানার জন্য আমি পাঁচ বছর ধরে অস্থির চিত্তে উন্মুখ ছিলাম। কিন্তু আমাকে কে বলত –।‘
তার এসব কথাবার্তায় আমরা নিশ্চিন্ত হলাম যে, সে পাগল হয়ে যায়নি। পরে এসে আটা পিষতে থাকল সে।
২
পরের দিন ঝগড়ু এলে দেখলাম তার চেহারায় বিষণ্নতাও ছিল, নীরবতাও ছিল এবং একটা ক্ষীণ হাসির ছোঁয়াও ছিল। তবে এখন তার চোখে সেই মৃত-মৃত ভাব নেই– যা প্রায়শ তার মাঝে দেখা যেত।
আমি ঝগড়ুকে জিগ্যেস করলাম– ‘কী ব্যাপার।’
সে কিন্তু কোনও জবাব দিল না। সেদিন বিকেলে যখন সে চলে যাচ্ছিল তখন বড় নম্রভাবে আমার পা ছুঁয়ে সালাম করে গেল। পরের দিন সকালেও তাই করল, সন্ধ্যায়ও। তিন-চার দিন পর ঝগড়ু আমাকে তেমনি পা ছুঁয়ে বলতে লাগল–
‘বাবু তুমি আমার ওপর এমন অনুগ্রহ করেছ যে, সাত জনমেও তার শোধ দিতে পারব না। যদি আমি জেলের বাইরে হতাম তা হলে একটা কাজ নিশ্চয়ই করতাম। তা হল তোমার সব শত্রুদের খুঁজে খুঁজে বের করতাম।’
‘আমার কোনও শত্রু নেই, কিন্তু তোমার হয়েছে কী বলো দিকিনি, তুমি খুশি, না বিষণ্ণ।’
‘আমার নিজেরও বুঝে আসছে না, তোমাকে কী বলব।’
‘আচ্ছা বলো দিকি সেদিন আমার হাতে চাক্কি ছেড়ে দিয়ে গিয়ে কী পড়ছিলে?’ ‘একখানা চিঠি।’
‘কার চিঠি?’
‘আমার স্ত্রীর।’
‘স্ত্রীর! তুমি তো সবসময়ে বলতে তোমার কেউ নেই।’
‘এখন সে কোথায় বাবু– সে তো এখন ভগবানের কাছে।’
‘ভগবানের কাছে? তবে তার চিঠি কীভাবে পেলে তুমি?’
‘এ চিঠি তো পাঁচ বছর আগে এসেছিল।’
‘তা তুমি কারও কাছ থেকে নিশ্চয়ই পড়িয়ে নিয়েছিলে?’
‘না, তা কারও কাছে যাইনি।’
‘কারও কাছে যাওনি?’
‘হ্যাঁ, চিঠিখানি এভাবেই পাঁচ বছর যত্ন করে রেখে দিয়েছিলাম।’
আমি কেঁপে উঠে মনে-মনে বললাম –”পাঁচ বছর, পাঁচ বছর! গত পাঁচ বছরে এ পৃথিবীর কত পরিবর্তন হয়েছে, কত কিছু ঘটেছে।-–”
আমি চাকরি পেয়েছি, বিয়ে করেছি, আমার বড়ছেলে ইশকুলে পড়ছে, চাকরি ছেড়ে দিয়েছি এবং ‘৪৬ সনের আন্দোলনে যোগ দিয়ে জেলে এসেছি।
এই পাঁচ বছর হিন্দুস্তানে কী তুমুল বিপ্লব সংঘটিত হয়ে গেছে। দেশে কংগ্রেস সরকার গঠিত হয়েছে। অর্থাৎ সেই নেতৃবৃন্দ– যাদের লোক গুণ্ডা বলে মনে করে– তারা শাসক হল। শিক্ষার নিয়মকানুন পরিবর্তিত হল, কৃষকদের উচ্ছেদ করা বন্ধ হল। এতে তাদের জীবনের কাঠামোই বদলে গেল, এবং আরও অনেককিছুই হয়ে গেছে এ পাঁচ বছরে– যখন থেকে এ চিঠিখানা ঝগড়ুর কাছে এমনি পড়ে ছিল।
‘উহ্! পাঁচ বছর।
ঝগড়ু বলতে থাকল, ‘যদি এটা যেই-সেই চিঠি হত তা হলে অবশ্য অন্য কারও কাছ থেকে পড়িয়ে নিতাম। কিন্তু এটা তো অন্যধরনের চিঠি। আমার সবসময় ভয় ছিল– চিঠিতে এমন কোনও কথা নেই তো যদ্দ্বারা সে হেসে দেয়। তা হলে তো নির্ঘাত আমি তার গলা চেপে ধরব। এবং আমার এ-ও ভয় ছিল– চিঠির কথা নিয়ে তারা যদি হাসাহাসি করে তা হলে আমি তাদের মেরে শেষ করে দেব। ভাই আমার রাগকে আমি বড় ভয় করি,–রাগই তো আমাকে এই চার দেয়ালের অভ্যন্তরে নিয়ে এসেছে।
‘আমি তাই চিঠিখানা অন্য কারও কাছ থেকে পড়িয়ে নিইনি। তা সেই চিঠিখানা আমার বুকের উপর রাবারস্ট্যাম্পের মতো লেগেছিল। সবসময় বুকে একধরনের ব্যথা অনুভব করতাম– না-জানি চিঠিখানার ভেতরে কী লেখা আছে। আমি ভেবে রেখেছিলাম জেল থেকে ছাড়া পেয়েই স্টেশনে গিয়ে একজন লোককে দিয়ে তা পড়িয়ে নেব।
