‘আমার ছেলের চিঠি-টিঠি আসেনি?’ বাবা নূর জিগ্যেস করে।
‘না, বাবা।’ মুন্সি উত্তর দেয়।
‘বড় খেয়ালি ছেলে। চিঠিপত্র একদম লেখে না।’ বাবা নূর বলে।
রুমালখানা এক কাঁধ থেকে নামিয়ে ঝেড়ে নেয় সে, তার পর অন্য কাঁধে ফেলে চুপচাপ ফিরে যায়। শেষে যখন তার মূর্তিটা দূরে গাঁয়ের আঁকাবাঁকা পথে একমুঠো সাদা তুলোর মতো হয়ে আসে, তখন মুন্সিজি বলে, ‘ভাই, কী করি, বলো তো! আজ দশ বছর ধরে বাবা নূর এমনি করে আসে, আর, প্রতিবারে এই একই কথা জিগ্যেস করে, আমিও প্রত্যেক দিন একই উত্তর দিই। সরকারের কাছ থেকে চিঠি এসেছিল, তোমার ছেলে বার্মায় বোমার আঘাতে মারা গেছে। সে চিঠিখানা আমিই তো পড়ে শুনিয়েছিলাম তাকে। বেচারার মনেই নেই সেকথা। চিঠিখানা আসার পর থেকে বেচারার মাথাটা যেন খারাপ হয়ে গেছে। দশ-বিশ দিন পরপরই ছেলের চিঠি নিতে এসে হাজির হয়। কিন্তু কসম খোদার, ভাই, এরপর বাবা নূর ফের যদি চিঠির কথা জিগ্যেস করতে আসে, তা হলে আমাকেও পাগল করে ছাড়বে।’
অনুবাদ : মোয়াজ্জম হোসেন
হাসিতে অশ্রু – হায়াতুল্লাহ আনসারি
‘কেসু তোমাকে যদি আমি পড়াতে চাই, পড়বে?
‘আমাকে পড়াবে বাবু! আমাকে–?’
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত ঝগড়ু চাক্কি থামিয়ে আশ্চর্য হয়ে আমার দিকে তাকাল।
‘কেন, এতে খারাপের কী আছে।’
‘কিন্তু আগে বলো কী পড়াবে তুমি?’
‘কেন– ইতিহাস, ভূগোল, রাজনীতি, দেশের বড় বড় লোকদের জীবনকাহিনি এবং তাঁদের মূল্যবান উপদেশাবলি!’
ঝগড়ু হেসে উঠল, উচ্চস্বরে হেসে উঠল।
বেদম হাসির চোটে অনেকক্ষণ পর্যন্ত তার মুখ বড় একটা পাত্রের মতো হাঁ করে থাকল। আর তার ভেতর দিয়ে উঁচু-নিচু নানান স্বরের হাসি ভেসে আসতে লাগল।
‘কী বললে, ইতিহাস, ভূগোল আর কী– বাবু আমরা তো এখানের সকলেই নিরক্ষর।’
তার এ-কথায় আমি কিছুটা আশ্চর্য হলাম। বললাম– ‘কিন্তু তোমরা প্রয়োজনের সময় তো দেখি দিব্যি একজনের কার্ড আরেকজনের কার্ড থেকে আলাদা করে নিতে পারো।’
‘ওসব কার্ডের উপর তো আমরা বিশেষ চিহ্ন দিয়ে রাখি। এখানে পড়ালেখা কে জানে? ‘ঠিক আছে কোনও চিন্তা নেই, আমি তোমাকে পড়া শেখাব আগে, তার পর লেখা।’
‘শেখাবে আমাকে পড়ালেখা! কিন্তু আমি তো বোকা!’
‘কে বলল তুমি বোকা, তুমি তো সব কথাবার্তায় বেশ চালাক।’
‘কিন্তু বাবু যখনি বই সামনে আসে অমনি আমি বোকা বনে যাই।’
‘তা হলে চলো তোমাকে এমন এক পদ্ধতিতে পড়াব যাতে বইয়ের প্রয়োজন হয় না।’ বারে বারে বাড়ির কথা মনে পড়ত ঝগড়ুর। তাকে আনমনা করে দিত সে-চিন্তায়। সারাক্ষণ সে চিন্তার সায়রে ডুবে থাকত! কিন্তু এরপরও সে আমার কাছে পড়ালেখা করে যেতে লাগল। পিষানো আটার উপর অক্ষর তৈরি করে তার উপর তাকে মক্শ করাতাম। তাকে পড়াবার এটাই ছিল শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি।
খুনের অপরাধে ঝগড়ুর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। সে ছিল বড় ঝগড়াটে কয়েদি। আর বোধহয় এ-কারণেই জেলার সাহেব তাকেই দিয়েছে আমার সাথি হিসেবে। কিন্তু আমার সাথে সে কখনও ঝগড়া করেনি, বরং চাক্কি চালাবার সময় সে নিজে গায়ের সব জোর দিয়ে চালায়, আমাকে শুধু বলে– ‘বাবু, তুমি শুধু হাত দিয়ে ধরে রাখো।’
কোর্টের পক্ষ থেকে আমাকে ‘বি’ ক্লাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের জেলার সাহেব রাজবন্দিদের ব্যাপারে বড় তীক্ষ্ণদৃষ্টি রাখেন। তিনি বলতেন– ‘এ’ ক্লাস হোক, চাই ‘বি’ ক্লাস হোক, তাদের কাজ করতেই হবে। নাহয় আবার তারা বিদ্রোহী হয়ে উঠবে আর খোদ জেলারের বিরুদ্ধেই ষড়যন্ত্র করবে।
আমি তার সাথে এ-ব্যাপারে কথা-কাটাকাটি করেছিলাম।
তিনি রেগে গিয়ে বললেন– ‘তোমার সমস্ত শক্তি বের করে ছাড়ব। এমন কয়েদির সাথে তোমাকে চাক্কি চালাতে দেব– যে তোমার মেজাজই ঠিক করে দেবে।’
প্রথম প্রথম চাক্কি চালাতে সত্যি আমার কষ্ট হয়েছিল। চাক্কির ভার আমার ওপর ছেড়ে দিয়ে ঝগড়ু বসে থাকত। কিন্তু যখনি সে জানতে পারল– ‘রাজবন্দি কাদের বলে’- তখনি সে আমার ওপর সহৃদয় হয়ে উঠল এবং চাক্কির সমস্ত ভার নিজে নিতে লাগল।
‘কেমন ভাই, পড়া মুখস্থ হয়েছে তো?’
‘কালকেরটা হয়নি। তার আগের দুদিনের পড়া মুখস্থ হয়েছে।’
‘যা হোক– অন্তত কিছু তো হয়েছে।’
ঝগড়ুর স্থির বিশ্বাস– পড়াটাই আসলে ভালো জিনিস, কিন্তু লেখা শিখে কী করবে। তার আছেই-বা কে যে, একখানা চিঠি লিখবে?’
‘বাড়ির কথা তুমি খুব স্মরণ করো– তাই না?’
‘হাঁ বাবু, খুব।’
‘যাকে স্মরণ করো– তার কাছে লিখবে?
‘না বাবু, তা হয় না।
‘কেন?’
‘কী আর বলব।’
আটার মাঝে অক্ষর এবং অক্ষর থেকে শব্দ গঠন হতে থাকল। আর শব্দ পড়ার সাথে সাথে তার চেহারায় এক অদ্ভুত সজীবতা ফুটে উঠতে লাগল– সাথে একটুখানি আশার ক্ষীণ আভা। পড়ার দিকে তার আকর্ষণ ক্রমশ বেড়েই যেতে লাগল, শব্দের পর বাক্য লিখে যেতে লাগল আটার উপর।
আস্তে আস্তে ঝগড় এসব বাক্যগুলো পড়তে থাকল।
একদিন আমি বললাম– ‘ঝগড়ু ভাই! এবার তুমি চিঠিও পড়তে পারবে।’
ঝগড় হঠাৎ হাত থামিয়ে ফেলল।
‘আমি চিঠি পড়তে পারব?’
‘হ্যাঁ।’
তার কালো বর্ণের শরীরে ঈষৎ রক্তিমাভা খেলে গেল, শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত বইতে শুরু করল এবং হাত কাঁপতে থাকল– ‘আমি চিঠি পড়তে পারব!’
‘হ্যাঁ ঝগড়ু! তুমি চিঠি পড়তে পারবে।’
