‘আশ্চর্য!’ দূর থেকেই বাবা নূর কিষানদের উদ্দেশে বলে, ‘এ মেয়েটি যে একেবারেই জাদুকর দেখছি! এতবড় একটা কাস্তে চালাচ্ছে, গোছা গোছা গমের চারা ঘন হয়ে গজিয়ে রয়েছে ক্ষেতে, অথচ কাস্তে দিয়ে ঘাস কাটছে, ভুলেও একটি চারা ছুঁয়ে ফেলছে না। কার মেয়ে এ?’
বাবা নূর মেয়েটিকে জিগ্যেস করে, ‘তুমি কার মেয়ে, মা?’
মেয়েটি মৃদু হেসে বাবা নূরের দিকে তাকায়। ওদিক থেকে এক কিষানের গলা শোনা যায়, ‘আমার, বাবা।’
‘তোমার মেয়ে?’ বাবা নূর কিষানদের দিকে এগোতে এগোতে বলে, ‘বড় সেয়ানা মেয়ে তো! খুব ভালো কিষান হয়ে উঠেছে দেখছি! এমন পাকা কাজ আমি শুধু তোমার মেয়েরই দেখলাম। আর দেখেছিলাম আমার ছেলের। আল্লা তার হায়াত
দারাজ করুন!’
ডাকঘরে যাচ্ছ বাবা?’ মেয়েটির বাবা জিগ্যেস করে।
‘হ্যাঁ।’ বাবা নূর বলে, ‘আল্লা তোমার মঙ্গল করুন। ভাবলাম, একবার জিগ্যেস করে আসি। কী জানি কোনও চিঠিপত্র যদি এসে থাকে।’
তিনজন কিষানের মুখই হঠাৎ থমথমে হয়ে ওঠে। একপাশে সরে দাঁড়িয়ে তারা রাস্তা ছেড়ে দেয়। বাবা নূর এগিয়ে যায়।
‘কেন ও-কথা জিগ্যেস করলে তুমি?’ মেয়েটির বাপকে একজন কিষান বলে।
‘জিগ্যেস করা উচিত হয়নি।’ দ্বিতীয় জন বলে।
মেয়েটির বাপ লজ্জিত হয়ে রাস্তার উপর আঙুল দিয়ে আঁচড় কাটতে থাকে। বাবা নূর ক্ষেতের মাথায় পৌঁছে গিয়েছিল, এমন সময় মেয়েটি ডাক দিয়ে ওঠে, ‘লসি খাবে, বাবা নূর?
বাবা নূর ফিরে তাকায়। গ্রাম থেকে বেরোবার পর এই প্রথম তার ঠোঁটে মৃদু হাসির আভা ফুটে ওঠে, ‘খাব, বেটি।’ তার পর একটু থেমে আবার বলে, ‘তেষ্টা নেই বটে, তবে মুসাফিরকে পানি খাইয়ে একটু সওয়াব নিবি, তাতে তোকে বাধা দেব না। দে বেটি, দে!
রুমালখানা এক কাঁধ থেকে আর এক কাঁধে রাখে বাবা নূর। ‘হ্যাঁ, দ্যাখ, একটু শিগগির করে নিয়ে আয়। ডাকপিওন হাওয়ার ঘোড়ায় চড়ে থাকে, চলে না যায় আবার।’
ঘাসের পোঁটলাটা পিঠ থেকে নামিয়ে সেইখানেই ক্ষেতের মধ্যে রেখে দেয় মেয়েটি। তার পর দৌড়ে আলের উপর কুলগাছটার কাছে চলে যায়। গুঁড়ির আড়াল থেকে একটা পাত্র তুলে নিয়ে খুব করে ঝাঁকায়। শেষে অ্যালুমিনিয়মের একটা বাটি ভরে নিয়ে ছুটতে ছুটতে বাবা নূরের কাছে ফিরে আসে।
বাবা নূর একনিঃশ্বাসে বাটিটা খালি করে দিয়ে রুমালে ঠোঁট মুছে বলে, ‘তোর নসিব এই লসির মতোই সাফ হোক, বেটি।’ তার পর আবার ডাকঘরের দিকে এগোতে থাকে সে।
মাদ্রাসার বারান্দায় অনেকগুলো লোকের সাথে বসে ডাক-মুন্সি নিজের প্রাত্যহিক কাজের ‘ফরম’ পূরণ করতে করতে গাঁয়ের লোকদের নতুন নতুন খবর শোনাচ্ছিল : ‘পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় শহর ছিল লাহোর। এখন লোকে বলে, করাচি নাকি পয়লা নম্বরে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আমি বলি, লাহোর গুটিয়ে-শুটিয়ে একটা ছোট্ট গ্রাম হয়ে যাক না কেন, তবু সে লাহোরই থাকবে।’
‘সে তো ঠিক কথাই।’ গাঁয়ের লোকদের ভেতর থেকে একজন বলে, ‘আল্লা করাচির বদনাম না-করান– আমার শালা করাচিতে চাপরাশির কাজ করত। যখন ও মারা যায়, তখন আমায় করাচি যেতে হল। আমি বলি কি, মুন্সিজি, করাচিটা একবার দেখেই এসো। হোক-না সে গাধা দিয়ে গাড়ি চালানো। কিন্তু গাড়ি কত! আমাদের গাঁয়ে এত পাখিও নেই। এক এক মোটরে এমন এমন সব মানুষ বসে থাকে যে, কী আর বলব। করাচিতে কেউ কারও ধারও ধারে না। আল্লার কুদরতের কথা মনে পড়ে যায়। নামাজ পড়তে ইচ্ছে করে। এক শেঠ বলছিল, ব্যস্, আর একটা মহাযুদ্ধ বেধে গেলেই করাচি একেবারে বিলেত বনে যাবে।’
‘শেঠের গুষ্টি…।’ মুন্সি একটা অশ্লীল গাল দিয়ে ওঠে।
‘আহা, কথাটা শোনোই-না আগে!’ লোকটি বলে, ‘তুমি খামোখা বেচারাকে গাল দিচ্ছ। সত্যিকথাই তো বলেছে বেচারা। আমায় সে বলল, কতবার যুদ্ধ বাধতে বাধতে থেমে গেছে। যুদ্ধ বাধলে মানুষ মারা পড়বে, এই বলে কেউ-না-কেউ মাঝপথে যাত্রাভঙ্গ করে দেয়। কিন্তু কথা হচ্ছে, যুদ্ধ না-লাগলেও তো লোক মরছে। যুদ্ধতে মরবে গোলাগুলির ঘায়ে, আর এমনি মরছে খেতে না-পেয়ে। যুদ্ধ বাধলে তবু যা-হোক চাকরি পাবে মানুষ! ‘
‘ঝাঁটা মারো অমন চাকরির মুখে!’ মুন্সিজি ফরমের উপর ঠক্ করে সিল মেরে বলে। তুমি দেখছি এখানেই যুদ্ধ লাগিয়ে দিলে, মুন্সিজি।’ গাঁয়ের আর সবাই হেসে ওঠে এ-কথায়।
কিন্তু মুন্সি হাসে না। সে এমনভাবে একদৃষ্টে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন তার দৃষ্টি দূরে একটি বিন্দুর উপর স্থির হয়ে গেড়ে বসেছে। মুহূর্তে তার মুখ সাদা হয়ে যায়, ঠোঁটদুটি একেবারে শুকিয়ে ওঠে। স্তিমিত গলায় সে আস্তে করে বলে, ‘বাবা নূর আসছে।’
একসঙ্গে সকলের চোখই বাবা নূরের দিকে ফেরে। সবার মুখই কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে যায়।
সাদা পোশাক পরনে বাবা নূর, সোজা মাদ্রাসার বারান্দার দিকে চলে আসছে কেমন যেন ঝিম-ধরা অস্বস্তি বোধ করে সবাই। দু-একজন বিব্রত হয়ে যাবার জন্য উঠে দাঁড়ায়।
বাবা নূর তখনও বারান্দার কাছে পৌঁছয়নি। কিন্তু মুন্সিজি আর চুপ করে থাকতে পারে না। চট করে তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়ে, ‘এসো, বাবা নূর, এসো!’
বারান্দার কাছে পৌঁছে বাবা নূর বলে, ‘ডাক এসে গেছে, মুন্সিজি?’
‘এসে গেছে, বাবা নূর।’ মুন্সি উত্তর দেয়।
