হিন্দুস্থান ভাগ হয়ে যাওয়ার পর ভয়ানক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে। হাজার হাজার মুসলমান মারা গেল। কিন্তু আমার আমদানি কিছুমাত্র কমেনি।
হ্যাঁ, দিল্লির গুরুজির লাহোরের শাখা-মন্দিরটা ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু গুরুজি দমবার পাত্র নন। তৎক্ষণাৎ দিল্লির একটা মসজিদ তাঁর হস্তগত হল। তিনি সেখানে ভৈরবী-জ্যোতির মূর্তি প্রতিষ্ঠা করলেন। বোম্বাই, দিল্লি, যোধপুর, আহমদাবাদ ও অন্যান্য শহরে আগত শরণার্থীরা ভিক্ষা চায়। কিন্তু বাইজিরা যা পায়, তার পঞ্চাশ ভাগের এক ভাগও বেচারা শরণার্থীদের কপালে জোটে না। বোধহয় হাজার হাজার মেয়ে আমায় অনুরোধ করেছে ভগবানের সঙ্গে তাদের মিলন ঘটিয়ে দেওয়ার জন্য। যাদের কপাল ভালো, তারা ভগবানকে পেয়েছিল বইকি।
আমার আধ্যাত্মিক সিদ্ধিও বেড়ে গেছে। আমি এখন আমার কারবার বাড়ানোর কথা ভাবছি। এই বছর একটা ফিল্ম-কোম্পানি খোলার ইচ্ছা আছে, আর কলবা দেবী রোডের ওপর গণেশজির এক মন্দির। কলবা দেবী রোডে লাখপতি গুজরাটি ও মাড়োয়ারিদের কারবার চলে। এরা গণেশ ঠাকুরের প্রেমিক। মনে হয়, এই মন্দির জোরসে চলবে। দাদাকে চিঠি লিখেছি। তাঁর রায় এলে কাজ শুরু করব। এখন আমি দাদার অনুমতি ছাড়া কোনও কাজ করি না। তিনিই আমাকে দেখিয়েছেন সত্য জ্ঞানের পথ। যদি নিজের পথে চলতাম, এইরকম বেকার থাকতাম এবং সোশ্যালিজমের অকেজো বাজে বই পড়ে পড়ে নরকে যেতাম।
হরে কৃষ্ণ! হরে কৃষ্ণ! হরে কৃষ্ণ!
অনুবাদ : শওকত ওসমান
বাবা নূর – আহমদ নদিম কাস্মি
একটি ছেলে বলে, ‘কোথায় যাচ্ছ, বাবা নূর?’
‘এই একটু ডাকঘরে যাচ্ছি।’ অত্যন্ত রাশভারি সুরে উত্তর দিয়ে এগিয়ে যায় বাবা নূর।
ছেলেরা সব খিলখিল করে হেসে ওঠে 1
ওদিক থেকে মৌলবি কুদরতউল্লা আসছিলেন। বললেন, ‘হাসিস নে ছোঁড়ারা! এসব কথায় হাসতে নেই। আল্লা কার বরাতে কী রেখেছে, কে জানে!’
ছেলেরা তখনকার মতো চুপ হয়ে যায়। কিন্তু মৌলবি কুদরতউল্লা চলে গেলে ওরা আবার খিলখিল করে হেসে ওঠে। এ ওর গায়ে ঠেলা মেরে বলতে থাকে, ‘ডাকঘরে যাচ্ছে বাবা নূর।’
মসজিদের মেহ্রাবের কাছে থেমে জুতো খুলে বাবা নূর খালিপায়ে এগিয়ে যায়। হাত দুখানা মোবের উপর রেখে মাথা ঝুঁকিয়ে ঠোঁট আর চোখ দিয়ে চুমো খায় কয়েকবার। তার পর পিছু হটতে হটতে ফিরে এসে জুতো পরে আবার চলতে থাকে।
বাবা নূর যখন মোবে চুমো খাচ্ছিল, ছেলেরা তখন নীরবে এ-গলি ও-গলি দিয়ে চুপচাপ সরে পড়ে। ভাবখানা এই যে পরস্পরকে দেখে লজ্জা পেয়ে গেছে ওরা।
বাবা নূরের সর্বাঙ্গে ধবধবে সাদা খদ্দরের পোশাক। মাথায় খদ্দরের টুপি। পেছনদিকে সাদা চুলের সঙ্গে মিশে গিয়ে টুপির সবটাই ঘাড় পর্যন্ত নামানো বলে মনে হচ্ছে। সদ্য-আঁচড়ানো সাদা দাড়িগুলো একটা বিশেষ ভঙ্গিতে ছড়িয়ে রয়েছে বুকের উপর। ফর্সা রঙে একটা ফ্যাকাশে ছাপ পড়েছে। ছোট ছোট চোখের মণি দুটো ঘন কালো। দেখলে মনে হয় বুঝিবা চীনেমাটির পুতুলের চোখের মতো নকল চোখ। ফর্সা শরীর, চুল-দাড়ি আর পোশাকের এতসব সাদা রঙের ভেতর ভ্রমরের মতো কালো চোখদুটি সত্যিই অদ্ভুত মনে হয়; কিন্তু এই অদ্ভুত অসামঞ্জস্যই বাবা নূরের চেহারায় ফুটিয়ে তোলে শিশুর সরলতা। বাবা নূরের কাঁধে সবসময়ই পড়ে থাকে সাদা খদ্দরের একটা বড় রুমাল। ছেলেদের ভিড় থেকে মসজিদের মেহরাব পর্যন্ত যেতে রুমালখানা তিন-চার বার কাঁধ বদল করেছে।
একটা দোকানের দরজায় বসা ছোকরা দোকানি জিগ্যেস করে, ‘ডাকঘরে যাচ্ছ, বাবা নূর?’
‘হ্যাঁ বাবা, বেঁচে থাকো!’ বাবা নূর উত্তর দিয়ে রুমালটা ঝট্কা মেরে অন্য কাঁধে রাখে।
কাছেই একটা ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল। চট্ করে হাততালি দিয়ে বলে ওঠে, ‘আহা, বাবা নূর ডাকঘরে যাচ্ছে!’
দোকানি ধমকে ওঠে, ‘এই ছোঁড়া, ভাগ্ এখান থেকে!
বাবা নূর কিছুদূর এগিয়ে গিয়েছিল, পেছন ফিরে বলে, ‘ধমকাচ্ছ কেন ছেলেটাকে ছেলেপিলেদের কি ধমকাতে আছে? ঠিকই তো বলেছে ও। ডাকঘরেই তো আমি যাচ্ছি।’
দূর দূর থেকে ছেলেরা দৌড়ে আসছিল। এপাশ-ওপাশ থেকে খিলখিল করে হেসে ওঠে তারা। বাবা নূরের পেছনে একটা মিছিল খাড়া হবার উপক্রম হয় যেন। কিন্তু আশপাশের কয়েকজন জোয়ান ছেলে তেড়ে আসে। বাবা নূর বাধা দেওয়া সত্ত্বেও ছেলেদের তাড়িয়ে দেয় তারা।
গ্রাম পার হয়ে বাবা নূর এবার মাঠে এসে পড়ে। মেঠো পথ এঁকেবেঁকে আলের উপর দিয়ে যেতে-যেতে হঠাৎ একসময় সবুজে ভরা ক্ষেতের মধ্যে মাথা গুঁজেছে। বাবা নূরের গতি কমে আসে সেখানে। গমের কচি চারাগুলোর পাশ কাটিয়ে অতি সাবধানে হাত-পা বাঁচিয়ে চলতে থাকে সে। কোনও পথচারীর অসাবধানতায় একটা চারা পথের উপর পড়ে আছে দেখতে পেলে সেটাকে অন্য চারার সঙ্গে হেলিয়ে বা জড়িয়ে দাঁড় করিয়ে দেয়, আর চারাটার যে-জায়গা একটু বেঁকে পড়েছে, সেখানটা এমনভাবে ছোঁয় যেন জখমে হাত বুলোচ্ছে। তার পর আলে উঠে এই দেরিটুকু পুষিয়ে নেওয়ার জন্য চলার গতি বাড়িয়ে দেয়। বাতাসে তার দাড়ি ছড়িয়ে পড়ে, আবার গুটিয়ে যায়, কাঁধের উপর থেকে রুমালখানা উড়ে উড়ে ওঠে, কিন্তু বাবা নূরের চলার বেগ কমে আসে তখন, যখন রাস্তা আবার গমের ক্ষেতে নেমে আসে।
আঁকাবাঁকা পথ ধরে এগিয়ে চলে বাবা নূর। সামনে কিছু দূরে কয়েকজন কিষান আলের উপর বসে তামাক টানছে। একটি কিষান মেয়ে কাস্তে দিয়ে এমন কৌশলে ক্ষেত নিড়োচ্ছে যে, সাধ্য কি কোনও একটা গমের চারায় এতটুকুও আঁচড় লাগে। বাবা নূর একটু থেমে মেয়েটিকে দেখতে থাকে। ঘাসের মুঠ কেটে হাত পেছনে নিয়ে যাচ্ছে মেয়েটা, আর পিঠের উপর ঝোলানো একটা পোঁটলার ভেতর ঘাস রেখে দিয়ে আবার কাস্তে চালাচ্ছে।
